নিকাহ রেজিস্ট্রারের সামনেই মারধর করে ও গলায় ছুরি ঠেকিয়ে তালাকনামায় স্বাক্ষর নেওয়া হয় মায়া খাতুনের। মাত্র আটমাস আগে ১৪ বছর বয়সী মায়ার বিয়ে হয়েছিল সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার কোদলা গ্রামের শফিকুলের ছেলে শিখনের সঙ্গে। বিধবা মা ৩০ হাজার টাকা যৌতুক বাকি রেখেছিলেন, আর এটাই ছিল মায়ার অপরাধ।
এদিকে ছয় বছর সংসার করার পর সংসার ভাঙলো সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাহুকা এলাকার তাসলিমার। কাজী অফিসে এসে উভয়পক্ষের সম্মতিতে তালাকনামা স্বাক্ষরিত হয়। তাদের একটি কন্যা সন্তানও রয়েছে। শাশুড়ির নির্যাতনেই বাধ্য হয়ে তালাকের পথ বেছে নেন তিনি।
স্বামী প্রতিদিনই নেশা করে এসে অত্যাচার করে, এ জন্যই লিগ্যাল এইড অফিসে অভিযোগ দিতে এসেছেন এক গৃহবধূ। এমন স্বামীর সংসার চান না তিনি। এভাবেই সিরাজগঞ্জে প্রতিদিনই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদের অহরহ ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। নানা কারণে সিরাজগঞ্জে আশঙ্কাজনকহারে বিবাহ বিচ্ছেদ বাড়ছে।
জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নতুন বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে ১৩ হাজার ৩১৭টি। যা প্রতিদিন গড়ে ৩৬। বিপরীতে তালাক নিবন্ধিত হয়েছে ৪ হাজার ৮০৩টি, যা প্রতিদিন গড়ে ১৩। চলতি বছরেও এই পরিসংখ্যান আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে সেটা নিশ্চিত হওয়া যাবে।
তবে শহরের একটি কাজী অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ১৫২টি বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে। যেখানে তালাক নিবন্ধিত হয়েছে ১৫৭টি। অর্থাৎ এই সময়ে বিয়ের চেয়েও বেশি তালাকের সংখ্যাই বেশি।
সদর উপজেলার কাজী সমিতির দেওয়া তথ্যে জানা যায়, চলতি বছরে জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ১৬৭০ টি বিবাহ রেজিস্ট্রির বিপরীতে তালাক রেজিস্ট্রি হয়েছে ৮৫০টি।
এ বছর তালাক রেজিস্ট্রি সংখ্যা গতবারের চেয়ে তুলনামূলক বেশি বলে জানিয়েছেন সিরাজগঞ্জ জেলা নিকাহ রেজিস্ট্রার সমিতির সভাপতি কাজী নজরুল ইসলাম।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে বিবাহ বিচ্ছেদের বেশ কিছু কারণ। যার মধ্যে অন্যতম মাদকাসক্ত, জুয়া ও পরকীয়া। এছাড়াও পারিবারিক সহিংসতা, বাল্যবিয়ে, যৌতুক, মোবাইল আসক্তি, মানসিক নির্যাতন, স্বামীর আদেশ না মানা, শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে বনিবনা না হওয়া, সামান্য বিষয়েই রেগে যাওয়া এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পরিবারের অন্য সদস্যদের অযাচিত হস্তক্ষেপে সংসার ভেঙে যাচ্ছে।
এদিকে সদর উপজেলার শিবনাথপুর গ্রামের দুই সন্তানের মা শিল্পী। স্বামী তাকে মারধর করে বের করে দিয়েছে এবং কিছুদিন পরই তালাকনামা পাঠিয়েছে।
কাঁদতে কাঁদতে ওই গৃহবধূ বলেন, বিয়ের পর থেকেই স্বামী, শাশুড়ি, দেবর ও ননদ তার ওপর অত্যাচার করে। অনেকবার মারপিট করেছে, তবুও ধৈর্য ধরে ছিলাম।
অন্যদিকে ৫ বছর ধরে আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন সলঙ্গার ফিরোজ হোসেন। তিন বছর সংসার করার পর হঠাৎ করেই স্ত্রী তাকে তালাক দেন এবং আদালতে মামলাও দেন। সেই মামলায় জেলও খেটেছেন তিনি। মামলা তাকেসহ তার বাবা ও বোনকে আসামি করা হয়। মামলা হওয়ার পর টেনশন ও আতঙ্কে তার বাবাও মারা গেছেন বলে জানান তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আইনজীবী সহকারী বলেন, ‘তার স্ত্রী স্মার্ট ফোন ব্যবহার করে, বিভিন্ন সময় দামি দামি জিনিসপত্র অনলাইনে অর্ডার করে। সেগুলো কিনে দিতে না পারলেই ঝগড়া বাঁধিয়ে বাবার বাড়ি চলে যায়। ডিভোর্স দিতে চায়। আমি নিজে স্যাক্রিফাইজ করে সংসার টিকিয়ে রেখেছি।’
নিকাহ রেজিস্ট্রার মো. শরিফ বলেন, ‘জানুয়ারি থেকে তার অফিসে ১৫২টি বিয়ে ও ১৫৭টি তালাক নিবন্ধিত হয়েছে। তিনি বলেন, স্বামীরা নেশা ও ক্যাসিনো জুয়াসহ অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িত হওয়ায় স্ত্রীকে ভর পোষণ করতে পারে না এ কারণেই বেশি সংসার ভাঙে। আর মেয়েরা মোবাইলে ফোনের মাধ্যমে অন্য ছেলেদের সঙ্গে পরকীয়া করে-এজন্যও বিচ্ছেদ হয়। এছাড়াও একান্নবর্তী সংসারে অনেক মেয়েরা থাকতে চায় না, ফলে সংসার ভেঙে যায়।’
সিরাজগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রার শরীফ তোরাফ হোসেন বলেন, ‘২০২৫ সালে জেলায় ৪ হাজার ৮০৩টি তালাক নিবন্ধিত হয়েছে। চলতি বছরের পরিসংখ্যানটা ডিসেম্বরের শেষ দিনে পাওয়া যাবে। ’
তিনি বলেন, ‘আমরা বিবাহ বিচ্ছেদের বিষয়ে পক্ষদ্বয়কে সবসময় অনুৎসাহিত করি। এদিকে সিরাজগঞ্জ লিগ্যাল এইড অফিস দীর্ঘদিন ধরেই পারিবারিক মামলা-মোকদ্দমাগুলো মীমাংসা বৈঠকের মাধ্যমে সমাধান করার কাজ করছে। যার ফলে অনেক সংসারই বিচ্ছেদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।’
লিগ্যাল এইড অফিস জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে যৌতুক ও নারীসংক্রান্ত ৪৬১টি অভিযোগ তাদের কাছে এসেছিল। এর মধ্যে ৪৪৮টি অভিযোগের নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ লিগ্যাল এইড অফিসার (সিনিয়র সিভিল জজ) কাফি আল আজাদ বলেন, ‘সংসার ভাঙাগড়ার জন্য দুই পক্ষেরই কিছু দায় থাকে। ছেলেদের মধ্যে ড্রাগ অ্যাডিকশন, জুয়া বা পরকীয়ায় আসক্তির কারণে স্ত্রী বাধ্য হয় ডিভোর্স দেয়। স্ত্রীকে মারপিটের মতো ঘটনা একাধিকবার ঘটলে সেই সংসারও টেকে না।
স্বামী ইনকাম করছে না, স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে পারছে না-এ কারণে বিচ্ছেদ হয়। শিক্ষিত পরিবারগুলোতে হয়তো স্ত্রীকে গায়ে হাত দেয় না, তবে মানসিকভাবে টর্চারের ফলে একসময় সংসার ভেঙে যায়। ছেলের পরিবার স্বামী-স্ত্রীর মাঝে অযাচিত হস্তক্ষেপ করায় দ্বন্দ্বের এক পর্যায়ে সংসার ভেঙে যায়।’
তিনি বলেন, ‘মেয়েদের দিক থেকে অন্যতম কারণ হলো, মোবাইল আসক্তি। এখানে অনেক স্বামীই এসে বলে, স্ত্রী রাত ১টা-২টা পর্যন্ত মোবাইল চালায়, সকাল ৯টা-১০টায় ঘুম থেকে ওঠে। এতে সংসারের দৈনন্দিন কাজ স্বাভাবিকভাবে করতে পারে না। মেয়েরা টিকটক, রিলসের মাধ্যমে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। স্বামীর আদেশ মানছে না, তখন
ডিভোর্সের দিকে যাচ্ছে। অল্পতেই রেগে গিয়ে ঝগড়া, এক পর্যায়ে বড় দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় এবং সেটা তালাকের দিকে চলে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ অভিযোগ আপোশ-মিমাংসায় পৌঁছাতে পারছি। সংসার টাকার মাধ্যমে হোক সেটা ডিভোর্সের মাধ্যমেই হোক। আমরা দুইপক্ষকে কাউন্সেলিং করি, যার যার দায়িত্ব বোঝানোর চেষ্টা করি। দু’পক্ষই যখন বুঝতে পারে তখনই সংসার টেকানো সম্ভব হয়। ২০২৫ সালে আমরা ভেঙে যাওয়া ৪৫৭টা সংসার জোড়া লাগাতে সক্ষম হয়েছি।’