ড. কে এম মহিউদ্দিন:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয়েছে আজ। জাতীয় সংসদের এই অধিবেশন পাঁচ, সাত কিংবা দশ দিন স্থায়ী হতে পারে; প্রয়োজনে এর মেয়াদ আরও বাড়ানো হতে পারে। আইন প্রণয়নমূলক কাজের পাশাপাশি এই অধিবেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো গঠন করা। নতুন সংসদের কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করবে এসব কমিটি কতটা স্বাধীন, সক্রিয় ও কার্যকরভাবে কাজ করতে সক্ষম তার ওপর।
কার্যপ্রণালি-বিধির ২৪০ বিধি অনুযায়ী, সংসদের প্রথম অধিবেশনেই বিশেষ অধিকার-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠন করতে হয়। তবে বিষয়ভিত্তিক অন্যান্য স্থায়ী কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে এ ধরনের নির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা নেই। অন্যদিকে, কার্যপ্রণালি-বিধির ২৪৬ বিধি অনুযায়ী সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের মধ্যেই মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত অবশিষ্ট সব স্থায়ী কমিটি গঠন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দুই অধিবেশনে ৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি এবং ৬টি বিষয়ভিত্তিক স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ফলে তৃতীয় অধিবেশনেই মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত অবশিষ্ট ৩৫টি স্থায়ী কমিটি গঠন করতে হবে। অর্থাৎ, এই অধিবেশনে শুধু বিপুলসংখ্যক কমিটি গঠনই নয়, এসব কমিটির সভাপতি ও সদস্য নির্বাচনও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে পরিণত হবে।
সংসদীয় কমিটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সংসদীয় গণতন্ত্রে শুধু আইন প্রণয়নই সংসদের দায়িত্ব নয়; সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠা করাও সংসদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। আর এই দায়িত্ব পালনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক হাতিয়ার হলো সংসদীয় কমিটি। সংসদের বৈঠকের সীমিত সময় ও আনুষ্ঠানিক কার্যপ্রক্রিয়ার বাইরে কেবল সংসদীয় কমিটিই সরকারের কর্মকাণ্ডের গভীরে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ, অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা করে। অর্থাৎ, সরকার কী করছে, কীভাবে করছে এবং কোথাও অনিয়ম বা ব্যর্থতা ঘটছে কি না—তা দেখার ও শোনার প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব মূলত সংসদীয় কমিটির।
এই কারণে সংসদীয় কমিটিকে সংসদের ‘চোখ-কান’ বলা হয়ে থাকে। একটি সংসদ কতটা কার্যকর, তা অনেকাংশে নির্ভর করে তার কমিটিগুলো কতটা কার্যকরভাবে কাজ করছে তার ওপর।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের কমিটি ব্যবস্থা এক অর্থে ওয়েস্টমিনস্টার ও কংগ্রেশনাল কমিটি ব্যবস্থার একটি সংমিশ্রণ। সংবিধান ও কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী জাতীয় সংসদে স্থায়ী কমিটি, বিল-সম্পর্কিত বাছাই কমিটি এবং বিশেষ কমিটি রয়েছে। বিল-সম্পর্কিত বাছাই কমিটি ও বিশেষ কমিটি সাধারণত নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের জন্য গঠিত হয় এবং দায়িত্ব সম্পন্ন করে সংসদে প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর বিলুপ্ত হয়। এ কারণে এগুলোকে অস্থায়ী কমিটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
অন্যদিকে, স্থায়ী কমিটিগুলো সংসদের মেয়াদকাল পর্যন্ত কার্যকর থাকে। সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদে সংসদীয় কমিটি গঠনের সাংবিধানিক ভিত্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭৬(১) অনুযায়ী সংসদ সরকারি হিসাব কমিটি, বিশেষ অধিকার কমিটি এবং কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অন্যান্য স্থায়ী কমিটি গঠন করে। অনুচ্ছেদ ৭৬(২) অনুযায়ী এসব কমিটির পাশাপাশি অন্যান্য স্থায়ী কমিটিও গঠন করা যায়।
কাঠামোগতভাবে জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলোকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়- (ক) মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি এবং (খ) মন্ত্রণালয়-বহির্ভূত স্থায়ী কমিটি বা বিষয়ভিত্তিক স্থায়ী কমিটি। মন্ত্রণালয়-বহির্ভূত স্থায়ী কমিটির সংখ্যা কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত। অন্যদিকে, মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সংখ্যা সরকারের মন্ত্রণালয়ের সংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিবর্তিত হতে পারে।
মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলো সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড পরীক্ষা ও তদারকি করে। সরকারি হিসাব কমিটি সরকারের ব্যয় ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা পরীক্ষা করে। আবার সরকারি প্রতিশ্রুতি কমিটি সংসদে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করে। অর্থাৎ, সংসদীয় কমিটিগুলোকে যথাযথভাবে কার্যকর করা সম্ভব হলে নির্বাহী বিভাগের ওপর সংসদীয় নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতার একটি শক্তিশালী কাঠামো গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু এখানেই বাংলাদেশের সংসদীয় চর্চার একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—কমিটি আছে, ক্ষমতাও আছে; কিন্তু বাস্তবে সেই ক্ষমতা প্রয়োগের কার্যকারিতা কতটুকু?
অতীতের অভিজ্ঞতা: ক্ষমতা আছে, কার্যকারিতা সীমিত
অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে সংসদীয় কমিটির কার্যকারিতার অন্তত কয়েকটি বড় সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। প্রথমত, সংসদীয় কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। ফলে কোনো কমিটি দীর্ঘ পর্যালোচনা ও অনুসন্ধানের পর গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তা বাস্তবায়ন না করলে কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ সীমিত থাকে।
দ্বিতীয়ত, কমিটির গঠনেই যদি সরকারি দলের সংখ্যাগত আধিপত্য থাকে, তাহলে কমিটির স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। সংসদীয় গণতন্ত্রে কমিটির শক্তি মূলত দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করার সক্ষমতার মধ্যে নিহিত। কিন্তু সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য না থাকলে কমিটি সহজেই সরকারের সিদ্ধান্ত অনুমোদনের আরেকটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।
তৃতীয়ত, কমিটির প্রতিবেদন সংসদে পর্যাপ্ত আলোচনার সুযোগ না পেলে তার রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব কমে যায়। এমন যদি হয় যে একটি কমিটি কোনো অনিয়ম বা প্রশাসনিক দুর্বলতা চিহ্নিত করে সুপারিশ করল, কিন্তু সংসদের মূল অধিবেশনে সেই প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা হলো না—তাহলে জনগণের কাছে সেই কমিটির দায়বদ্ধতা ও কার্যকারিতা কতটা থাকবে?
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন। সংসদীয় কমিটির কোনো সদস্য কিংবা সভাপতির দায়িত্ব পালনের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক বা রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাত তৈরি হলে কমিটির নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই শুধু কমিটি গঠন করলেই হবে না; কমিটির সদস্যদের আচরণ, স্বার্থের ঘোষণা এবং নৈতিক জবাবদিহিতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তবে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা একেবারে হতাশাজনক নয়। পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম ও নবম জাতীয় সংসদে সংসদীয় কমিটিগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় ছিল। এ সময়ে কমিটি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, রাজনৈতিক পরিবেশ অনুকূল হলে সংসদীয় কমিটি যে কার্যকর হতে পারে, বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাতেই তার প্রমাণ রয়েছে।
সমস্যা প্রকট হয়েছিল দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদে। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে কার্যকর রাজনৈতিক বিভাজন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা দুর্বল হয়ে পড়ায় সংসদীয় তদারকির ওপরও তার প্রভাব পড়ে। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংশোধনী বিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রতিবেদন প্রদানের ক্ষেত্রে সংসদীয় কমিটির কাজে প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের অভিযোগও আলোচিত হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে—সংসদীয় কমিটি কি সত্যিই সংসদের প্রতিষ্ঠান, নাকি সরকারের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার অংশ?
এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সংসদীয় কমিটির মূল উদ্দেশ্য সরকারের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করা নয়; বরং সরকারের কর্মকাণ্ড পরীক্ষা করা, অনিয়ম চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজন হলে সংশোধনের জন্য সুপারিশ করা।
ত্রয়োদশ সংসদে সৃষ্ট নতুন সম্ভাবনা ও অনিশ্চয়তা
এই প্রেক্ষাপটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সামনে একটি নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। নতুন কমিটি গঠন কেবল সাংগঠনিক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি হতে পারে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। তবে কমিটি গঠনকে ঘিরে ইতিমধ্যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও তৈরি হয়েছে। জুলাই সনদের ২৪ নম্বর সুপারিশে সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, বিশেষ অধিকার কমিটি, অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত কমিটি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি—এই চারটি কমিটির সভাপতি পদে বিরোধী দলের সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতিদের সংসদে আসনসংখ্যার অনুপাতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে।
এর অর্থ হলো, চারটি নির্দিষ্ট কমিটির সভাপতির পদ ছাড়াও সংসদে বিরোধী দলের ৯০টি আসনের অনুপাতে আরও ১০টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলের পাওয়ার কথা। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দুই অধিবেশনে গঠিত ১৫টি স্থায়ী কমিটির মধ্যে এখন পর্যন্ত সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতির একটি পদই বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছে।
ফলে জুলাই সনদের এই সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়টি তৃতীয় অধিবেশনে কমিটি গঠনের সময় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলীয় জোট সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি বর্জন করায়, এই সুপারিশ বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সরকার যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে কমিটিগুলো নিয়ন্ত্রণ করে এবং বিরোধী দলের ভূমিকা সীমিত হয়ে যায়, তাহলে সংসদীয় কমিটি নির্বাহী বিভাগের ওপর কার্যকর নজরদারির পরিবর্তে সরকারের সিদ্ধান্তকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। অন্যদিকে, বিরোধী দল যদি সাংবিধানিক সংস্কারসহ গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়, তাহলেও সংসদীয় তদারকি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কারণ, কার্যকর বিরোধী দল ছাড়া সংসদীয় কমিটির অনুসন্ধান, প্রশ্ন, সমালোচনা এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ে।
অতএব, সরকার ও বিরোধী দল—উভয়েরই সংসদীয় কমিটিকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে একটি প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কার্যকর কমিটির জন্য কী করা আবশ্যক?
সংসদীয় কমিটি কার্যকর করার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রথমত, কমিটির কাজের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। কমিটি যেন শুধু সরকারি সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা শোনার জায়গা না হয়ে সরকারের কর্মকাণ্ড পরীক্ষা করার প্রকৃত প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় সংসদীয় কমিটির ভূমিকা মূলত উপদেশমূলক; কমিটির সিদ্ধান্ত বা সুপারিশ বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয় বা বিভাগসমূহ বাধ্য নয়। তাই কমিটির সুপারিশের বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সরকারের লিখিত জবাব প্রদান বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এতে সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি সংসদের কাছে স্পষ্ট থাকবে।
একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কমিটি-প্রতিবেদনের ওপর সংসদে আলোচনার বিধান থাকা প্রয়োজন। এতে কমিটির সুপারিশ নিয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হবে এবং সংসদীয় তদারকি ও জবাবদিহিতা আরও কার্যকর হবে।
দ্বিতীয়ত, কমিটির গঠন ও নেতৃত্বে দলীয় ভারসাম্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে সংসদীয় রেওয়াজ অনুযায়ী সংসদীয় কমিটির সভাপতি সাধারণত সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হন। ফলে অধিকাংশ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতিও সরকারদলীয় সদস্য হয়ে থাকেন। যদিও বিগত কয়েকটি সংসদে সরকারি হিসাব-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি বিরোধী দলের সদস্যকে করা হয়েছে, তবুও সামগ্রিকভাবে সংসদীয় কমিটিগুলোর নেতৃত্ব ও গঠনে দলীয় ভারসাম্যের অভাব লক্ষ্য করা যায়। এর ফলে সরকারের কার্যক্রমের ওপর স্বাধীন ও কার্যকর সংসদীয় তদারকি অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারি হিসাব-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির পাশাপাশি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তদারকিমূলক কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলের সদস্যদের জন্য সংরক্ষণের বিষয়টি কার্যপ্রণালি-বিধিতে অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি না, তা বিবেচনা করা যেতে পারে। কমিটিতে দলীয় ভারসাম্য বৃদ্ধি পেলে সরকারের ওপর কার্যকর ও নিরপেক্ষ তদারকি আরও শক্তিশালী হবে। এ ছাড়া সংসদীয় কমিটির সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান, পেশাগত অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও সংসদীয় তদারকির মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতাশালী, কারণ তিনি একই সঙ্গে সরকারপ্রধান এবং সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা। কিন্তু শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রী মানেই দুর্বল সংসদ—এটি কোনো গণতান্ত্রিক অনিবার্যতা নয়। বরং শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি শক্তিশালী সংসদীয় কমিটি থাকলেই নির্বাহী ক্ষমতার ওপর কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। আর এখানেই ত্রয়োদশ সংসদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
নতুন সংসদের কমিটিগুলো যদি সরকারি ব্যয়, নীতি বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, দুর্নীতি, নাগরিক সেবা এবং সংসদে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে কঠোর ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান করতে পারে, তাহলে সংসদীয় গণতন্ত্রের চরিত্রই বদলে যেতে পারে।
কমিটি গঠনই শেষ নয়-কেবল একটি পদক্ষেপ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী সকল ধরণের স্থায়ী কমিটি গঠিত হলেই সংসদীয় তদারকি কার্যকর হবে—এমন ধারনা পোষণ করার কোনো কারণ নেই। আসল পরীক্ষা শুরু হবে কমিটিগুলো কাজ শুরু করার পর। কমিটি কতবার বৈঠক করল, কতজন কর্মকর্তাকে ডেকে পাঠাল কিংবা কতটি প্রতিবেদন তৈরি করল—শুধু এসব হিসাব দিয়ে কার্যকারিতা বিচার করা যাবে না। বরং দেখতে হবে, কমিটি সরকারের কতগুলি সিদ্ধান্ত পরীক্ষা করেছে? কতগুলি অনিয়ম চিহ্নিত করেছে? কী কী সুপারিশ করেছে? সর্বোপরি সরকার এই সকল সুপারিশের কতগুলি বাস্তবায়ন করেছে?
মনে রাখা প্রয়োজন সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদের শক্তি শুধু কতগুলো আইন পাস হলো, তার মধ্যে নিহিত নয়; সরকারের ওপর সংসদ কতটা কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠা করতে পারল, তার মধ্যেও সংসদের শক্তি নিহিত।
তাই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সামনে প্রশ্নটি শুধু কোন দল কতটি কমিটির সভাপতি হবে?—এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো—সরকার ও বিরোধী দল কি সংসদীয় কমিটিকে দলীয় ক্ষমতা বণ্টনের ক্ষেত্র না বানিয়ে নির্বাহী বিভাগের ওপর কার্যকর নজরদারির প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পারবে? সংসদের জনপ্রতিনিধিদের কাছে এই প্রশ্নের যথাযথ উত্তর প্রাপ্তি জনগণের প্রত্যাশা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ।
- ড. কে এম মহিউদ্দিন: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়