Image description

মাহমুদুর রহমান 

গত সপ্তাহে জামায়াতে ইসলামীর এক প্রবীণ এমপি নারীঘটিত কাণ্ডে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। তার সংসদ সদস্য পদও সম্ভবত চলে যাবে। সংসদে বিরোধী দল প্রশংসনীয় দ্রুততার সঙ্গে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে। যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপরোক্ত ৭৬ বছরের বৃদ্ধ রাজনীতিবিদ জীবনের প্রায় শেষ প্রান্তে এসে চরমভাবে সমালোচিত, অপমানিত হলেন, তার সূত্রপাত ঘটেছিল সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া কয়েকটি ভিডিওর মাধ্যমে।

আমার দেশ পত্রিকার একটি অতি সিরিয়াস রাজনৈতিক চরিত্র থাকায় সেখানে সচরাচর আমরা কোনো ব্যক্তিগত, চটুল বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করি না। পাঠকরা এতদিনে জেনে গেছেন যে, এটা কোনো বিনোদন পত্রিকা নয়। এই প্রকৃতির অনেক চটকদার খবর নিয়মিত আমাদের কাছে এলেও সেগুলোকে উপেক্ষা করাই আমার দেশ-এর সম্পাদকীয় নীতি। বর্তমান ক্ষেত্রেও অপরাধী যদি একজন সংসদ সদস্য না হতেন, তাহলে আমরা ঘটনাটিকে কোনো গুরুত্বই দিতাম না। 

আলোচ্য সংবাদটি প্রকাশের আগে আমরা সময় নিয়ে, ঢাকা ও সাতক্ষীরার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে, যথাযথ অনুসন্ধানের মাধ্যমে পুরো বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে তবেই সংবাদ প্রকাশ করেছি। কেবল সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও ভাইরাল হওয়ামাত্র ভিউয়ের আশায় ঝাঁপিয়ে পড়িনি। আমার সহকর্মীদের এই প্রশংসনীয় সাবধানতা ও পেশাদারিত্বের ‘অপরাধে’ আওয়ামী ও বিএনপির বট বাহিনীর নানা ধরনের তির্যক মন্তব্য আলোচ্য ভিডিও প্রকাশ-পরবর্তী কয়েক ঘণ্টার জন্য আমাদের হজম করতে হয়েছে। পরবর্তীকালে অবশ্য অনেক পত্রিকাকেই আমার দেশ-এ প্রকাশিত প্রকৃত তথ্য থেকে ধার করে সংবাদ ছাপাতে হয়েছে। বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতারাও আমার দেশ-এর মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট শেয়ার করেছেন। অনেকে মন্তব্য করেছেন, জামায়াতের এমপির রাজনৈতিক কফিনে শেষ পেরেকটা আমার দেশই ঠুকে দিয়েছে। যাহোক, এই ঘটনা রাজনীতি ও সমাজ-জীবনে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রবল ক্ষমতা পুনরায় দেখিয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়ার আক্রমণে একা জামায়াত নেতাই ইদানীং ঘায়েল হচ্ছেন না। সরকারি দলের এমপি, মন্ত্রীরাও যথেষ্ট বিপদের মধ্যে আছেন। কদিন আগেই তো শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের টেলিফোন বাক্যালাপ ভাইরাল হয়ে ঘটনা রাজপথ পর্যন্ত গড়িয়েছিল। বর্তমান প্রজন্মকে নিয়ে তার একটি আপত্তিকর, রসিকতাপূর্ণ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ভারতের ‘ককরোচ’ পার্টির আদলে এদেশে ‘ফার্ম চিকেন’ পার্টি প্রায় গঠিত হয়ে গিয়েছিল। শিক্ষামন্ত্রীকে সংসদে দুঃখ প্রকাশ করে আশু বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে হয়েছে।

বিরোধী দলও এত তাড়াতাড়ি দেশে বড় কোনো ঝামেলা করতে চায়নি। বিষয়টি নিয়ে তারা সংসদে নমনীয়তার পরিচয় দিয়েছেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) শামসুল ইসলামের পরিবারকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্য ধরনের অপপ্রচারের অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। ক্ষমতা হাতে থাকায় অভিযোগ সঠিক না বেঠিক, সেটা নিয়ে তদন্তের প্রয়োজন পড়েনি। হয়তো জামায়াতে ইসলামী বিরোধী দল না হয়ে আজ ক্ষমতাসীন থাকলে, সাতক্ষীরার সাবেক দলীয় আমির গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের পরিবর্তে সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা তার অপকর্ম প্রকাশ করেছেন, তারাই গ্রেপ্তার হয়ে যেতেন। 

শিক্ষামন্ত্রীর টেলিফোন কথোপকথন তার অনুমতি ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করার অপরাধে কারো বিরুদ্ধে কেন কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি, সেটা অবশ্য আমার জানা নেই। এমনও হতে পারে, সরকারে শিক্ষামন্ত্রীর ক্ষমতা নিরাপত্তা উপদেষ্টার সমপর্যায়ের নয়। অথবা তিনি যাদের সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলেছিলেন, তারা তার ঘনিষ্ঠজন। এই ঘটনার আগেও এহছানুল হক মিলন নানা বক্তব্য দিয়ে ট্রল হয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার ভোর রাতে হাঁসের মাংস খাওয়ার অভিযান নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় উঠেছিল। মোট কথা, বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, সবাইকে সোশ্যাল মিডিয়া তটস্থ করে রেখেছে।

সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। অপারেশন থিয়েটারে ডাক্তারের হাতের ছুরি আর গভীর রাতে রাস্তায় ছিনতাইকারীর হাতের ছুরি যে এক নয়, এ তো আমরা সবাই জানি। বিজ্ঞানের ভালো এবং মন্দ নিয়ে স্কুলজীবনে রচনা লিখতে হয়নি এমন শিক্ষার্থী কমই খুঁজে পাওয়া যাবে। সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারকেও আমাদের এই নিরিখেই বিবেচনা করতে হবে। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের শেষের পাঁচ বছর ফেসবুক, ইউটিউব ইত্যাদি আন্দোলনের অন্যতম হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল। দেশ থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর আমার কথা বলার অন্যতম মাধ্যমই ছিল কনক সরওয়ারের ইউটিউব চ্যানেল।

পিনাকী ভট্টাচার্য এবং ইলিয়াস হোসেন দেশের বিপুল অংশের মানুষের কাছে যে রীতিমতো জাতীয় নায়কের উচ্চতায় পৌঁছে গেছেন, তার মূলেও রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। আলজাজিরায় ‘অল দি প্রাইম মিনিস্টার’স মেন’ এবং নেত্র নিউজে ‘আয়নাঘরের সংবাদ’ বাংলাদেশের জনগণকে যথাক্রমে জুলকারনাইন সায়ের এবং তাসনিম খলিলের সঙ্গে পরিচিত করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার সহায়তা ছাড়া তারা বর্তমান অবস্থানে পৌঁছাতেন না। জুলাই বিপ্লবে ছেলেমেয়েদের তৈরি করা নানা ধরনের মিম ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত যুদ্ধে সেসব মিম ময়দানের মারণাস্ত্রকে পরাজিত করেছিল। হাসিনার আমলে দেশের তথাকথিত মূলধারার গণমাধ্যম ফ্যাসিবাদের দালালে পরিণত হলে সোশ্যাল মিডিয়াই প্রকৃত অর্থে ‘ফোর্থ স্টেট’ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মূলধারার গণমাধ্যম হারানো বিশ্বস্ততা এখনো পুরোপুরি ফিরে পায়নি। 

পাশের দেশ ভারতে মোদির দুঃস্বপ্ন হয়ে আবির্ভূত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ জন্মই নিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে। মাস দুয়েক আগেও এমন এক অদ্ভুত নামের দল প্রতিষ্ঠা কারো কল্পনাতেও ছিল না। তিরিশ বছর বয়সি, যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ভারতীয় তরুণ অভিজিৎ দীপকে ভারতের বর্তমান বিজেপিপন্থি প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের দেশটির প্রতিবাদী তরুণ প্রজন্মকে হেয় করে দেওয়া এক মন্তব্যের প্রেক্ষিতে ক্ষুব্ধ হয়ে এক্স হ্যান্ডেলে এ বছর ১৬ মে কেবল ছয় শব্দের এক পোস্ট দিয়েছিলেন, What if all Cockroaches come togetherÑঅর্থাৎ, সব তেলাপোকা যদি এক হয়ে যায়? পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় রাতারাতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তেলাপোকার নানা ধরনের মিমে ভর্তি হয়ে গিয়েছিল। মাত্র দুই মাসের মধ্যে সেই ছয় শব্দের পোস্ট, ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর মোদি সরকারের জন্য রাজপথের সবচেয়ে কঠিন আন্দোলনের চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামের ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্মটি আজ কোটি কোটি ভারতীয় তরুণের প্রধান প্রতিবাদী মঞ্চে পরিণত হয়েছে।

যে দেশে নানা ধরনের ফন্দিফিকির করে এক নির্বাচনে হারিয়ে দিয়ে মমতা ব্যানার্জির মতো প্রবীণ ক্যারিশম্যাটিক নেতাকে মোদি প্রায় রাজনীতির ময়দানছাড়া করে দিয়েছেন, সাহসী তরুণ অভিজিৎ বিদেশের নিরাপদ জীবন ছেড়ে জেন-জি প্রজন্মকে নেতৃত্ব দিতে আগাম ঘোষণা দিয়ে সেই দেশের রাজধানীতে উপস্থিত হয়ে প্রমাণ করেছেন একমাত্র তরুণরাই পারে পরিবর্তন আনতে। আমার মতো কোনো বৃদ্ধ দুই হাত প্রসারিত করে আবু সাঈদের মতো জীবন দিতে পারে না। বিজেপির বুলডোজারের নিচে ভারতের প্রাচীনতম দল কংগ্রেস চিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়ার পর ক্ষুদ্র তেলাপোকারা সেই বুলডোজারকেই যেন অকেজো করে দিয়েছে। ভারতের বিখ্যাত ভিন্নমতের লেখিকা অরুন্ধতী রায় সঠিক বলেছেন, তেলাপোকারা নিরস্ত্র হলেও বিপজ্জনক। 

শেষ পর্যন্ত এদের আন্দোলনের কাছে পরাজয় মেনে নরেন্দ্র মোদি তার হিন্দুত্ববাদী সরকারের শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করাতে বাধ্য হয়েছেন। সদ্য সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান নিজেও তরুণ বয়সে ওড়িশার ডাকসাইটে হিন্দুত্ববাদী ছাত্রনেতা ছিলেন। আমাদের এহছানুল হক মিলনকে ভারতের ধর্মেন্দ্র প্রধানের তুলনায় ভাগ্যবান বলতেই হচ্ছে যে তাকে পদত্যাগ করতে হয়নি। পাশাপাশি দুই দেশেই সোশ্যাল মিডিয়া ক্রমেই মূলধারার গণমাধ্যমের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। আজ সব দেশে অধিকারহারা মানুষের তথ্য পাওয়ার ভরসার স্থল যেন সোশ্যাল মিডিয়া।

দিল্লিতে সাম্প্রতিক আন্দোলনের সময় বিজেপিপন্থি মিডিয়া যাদের গোদি মিডিয়া নামে ভারতে সবাই চেনে, সেই সব মিডিয়ার কর্মীরা তাদের মতো করে বাঁকানো খবর পরিবেশন করতে গিয়ে আন্দোলনরত জেন-জিদের হাতে রীতিমতো নাজেহাল হয়েছেন। গোদি মিডিয়ার নির্লজ্জ দালালিতে ভারতের সাধারণ জনগণ ত্যক্তবিরক্ত হয়ে উঠেছেন। সেই সব তথাকথিত ‘মেইনস্ট্রিম’ মিডিয়ার প্রাইম টাইমের খবর বাদ দিয়ে সবাই এখন আকাশ ব্যানার্জি, রাভিশ কুমার এবং ধ্রুব রাঠির মতো জনপ্রিয় ইউটিউব কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের কথা শুনছেন। এটাই বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সর্বত্র করপোরেট ও অলিগার্ক মিডিয়ার বাস্তবতা। দুর্ভাগ্যের কথা হলো, আমাদের অধিকাংশ মিডিয়া জুলাই বিপ্লব থেকে শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। তোষামোদ বোধহয় এদের ডিএনএতে ঢুকে গেছে।

কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার আবার উল্টো পিঠ রয়েছে, যার উল্লেখ না করলে আমি বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার অভিযোগে অভিযুক্ত হতে পারি। মূলধারার গণমাধ্যমের মতো জবাবদিহিতা না থাকার ফলে সোশ্যাল মিডিয়া অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর বাহন হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে অনেক নিরপরাধ ব্যক্তি সমাজে অপমানিত এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাছাড়া নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারও ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। বিভিন্ন পদ্ধতিতে সাইবারবুলিংয়ের আশঙ্কাও দিন দিন বেড়ে চলেছে। 

বিষয়টিকে আপনারা সমাজের বৃহত্তর হিতের জন্য ব্যক্তির গোপনীয়তার স্বাধীনতাকে বিসর্জন দেওয়ার সমতুল্য বিবেচনা করতে পারেন। তবে তখনই নাগরিকের জন্য সবচেয়ে বেশি বিপদের সৃষ্টি হয়, যখন কোনো স্বৈরাচারী সরকার রাষ্ট্রশক্তিকে ব্যবহার করে ভিন্নমতাবলম্বীদের হেয় করতে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে মিথ্যা, বিকৃত ও অবমাননাকর তথ্য ছড়াতে থাকে। আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এ ধরনের বিপদ বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন দেশের স্বৈরাচারী সরকার ভিন্নমতকে দমাতে আধুনিক বিজ্ঞানের এসব ক্ষতিকর প্রয়োগ অনবরত করে যাচ্ছে। সবদিক বিবেচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে ভারসাম্য আনাটাই বর্তমান সময়ের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।