Image description
মনে আছে শহীদ হৃদয়ের কথা? ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে ধারণ করা একটি ভিডিও পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন পুলিশ সদস্য এক তরুণকে একটি গলিতে নিয়ে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে। কিছুক্ষণ পর একজন পুলিশ সদস্য খুব কাছ থেকে বন্দুক ঠেকিয়ে হৃদয়কে গুলি করে। রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর পুলিশ তার নিথর দেহ টেনে নিয়ে যায়। পরে অভিযোগ ওঠে, তার মরদেহ তুরাগ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
আজও সেই মরদেহের কোনো সন্ধান মেলেনি। তাই শহীদ হৃদয়ের কপালে জোটেনি কবর এমনকি জোটেনি প্রাপ্ত স্বীকৃতিও।
 
হৃদয়ই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি প্রতি মাসে কিছু টাকা বাড়িতে পাঠাতেন। কারণ, গুরুতর মূত্রনালীর জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে তার বাবা লাল মিয়া ঠিক মতো কাজ কর্ম করতে পারতেন না। আজ সেই অসুস্থ লাল মিয়াকেই আবার রাস্তায় নেমে ছেলের চালানো অটোরিকশাই চালাতে হচ্ছে।
 
তার ভাষায়, "আমরা খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। চাষ করার মতো কোনো জমি নেই। অসুস্থতার কারণে যে অটোরিকশা চালানো ছেড়ে দিয়েছিলাম, এখন বেঁচে থাকার জন্য আবার সেটাই চালাতে হচ্ছে।"
 
সরকারিভাবে শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়ায় হৃদয়ের পরিবার এখনো সরকার ঘোষিত ৩০ লাখ টাকার অনুদান এবং জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে ৫ লাখ টাকার আর্থিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত।
 
ছেলের মরদেহ উদ্ধার এবং তাকে শহীদ হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে লাল মিয়া ২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আবেদন করেন। এর চার দিন পর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অধীন জুলাই গণঅভ্যুত্থান বিশেষ সেল-এ পাঠানো এক চিঠিতে জানায়, হৃদয়ের মরদেহ কিংবা কবরের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে এ বিষয়ে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা চাওয়া হয়।
 
পরবর্তীতে বিশেষ সেলটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তরে একীভূত করা হয়। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আনোয়ারুল নাসের জানিয়েছেন, তিনি সম্প্রতি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং হৃদয়ের নাম কেন এখনো সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, তা খতিয়ে দেখবেন।
 
অন্যদিকে, জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামাল আকবর বলেন, ফাউন্ডেশন ইতোমধ্যে শহীদের পরিবারকে সহায়তা দিয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে হৃদয়ের নাম গেজেটে অন্তর্ভুক্ত না করা পর্যন্ত তার পরিবারকে কোনো ধরনের সহায়তা দেওয়া সম্ভব নয়।
 
প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু শহীদ হৃদয়ের বাবা-মা এখনো জানেন না, তাদের একমাত্র সন্তানের মরদেহ কোথায়। তারা জানেন না, কোথায় গিয়ে সন্তানের জন্য একমুঠো মাটি ছুঁয়ে দোয়া করবেন। বিচার, স্বীকৃতি আর একটি কবরের অপেক্ষায় আজও প্রহর গুনছে অসহায় পরিবারটি।