Image description

ওলিউর রহমান

১৯৯৫ সালের ১১ জুলাই ছিল বসনিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দিন। তিন বছর ধরে চলা গণহত্যা এ দিনে সকল সীমা অতিক্রম করেছিল। দেশটির সেব্রেনিৎসা শহরে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ৮ হাজারের বেশি মানুষ হত্যা করা হয়েছিল ১১ জুলাই। গতকাল ছিল সেব্রেনিৎসা গণহত্যার ৩১তম বার্ষিকী।

বসনিয়া গণহত্যা। নব্বইয়ের দশকে সংঘটিত এই গণহত্যা আধুনিক ইউরোপের সবচেয়ে নির্মম মানবিক বিপর্যয়গুলোর একটি। এদিন বসনিয়াক মুসলমানদের ওপর হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ও নারীদের ওপর ভয়াবহ সহিংসতা চালানো হয়েছিল।

প্রায় ৫১ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের বসনিয়া-হার্জেগোভিনা বলকান অঞ্চলের একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। দেশটির পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণে ক্রোয়েশিয়া, পূর্বে সার্বিয়া, দক্ষিণ-পূর্বে মন্টেনেগ্রো এবং দক্ষিণে অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের একটি ক্ষুদ্র উপকূল রয়েছে। রাজধানী সারায়েভো।

১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৪ শতাংশ ছিলেন বসনিয়াক, ৩১ শতাংশ সার্ব এবং ১৭ শতাংশ ক্রোয়াট। ঐতিহাসিকভাবে বসনিয়ায় ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির গভীর প্রভাব রয়েছে। সারায়েভোর গাজি হুসরেভ বে মাদরাসা এবং ফ্যাকাল্টি অব ইসলামিক স্টাডিজ দীর্ঘদিন ধরে ইসলামি শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

পঞ্চদশ শতকে সুলতান মুহাম্মদ আল-ফাতিহ বসনিয়াকে উসমানীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। উনিশ শতকের শেষদিকে উসমানীয় সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগে অঞ্চলটি অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় শাসনের অধীনে চলে যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এটি যুগোস্লাভিয়ার অংশে পরিণত হয় এবং ১৯৯২ সালে ইউরোপের বুকে একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করে।

কিন্তু সার্বরা বসনিয়ার মুসলমানদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী বা ইসলামি মনোভাবের বিস্তার- কোনোটাকেই সহ্য করতে পারছিল না। ফলে মুসলমানদের নির্মূল করার উদ্দেশ্যে বসনিয়ায় জাতিগত শুদ্ধি অভিযান শুরু করে তারা।

১৯৯২ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া মুসলিম নিধন থামে ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরে। ততদিনে সার্ব সৈন্যরা নৃশংসভাবে লক্ষাধিক মুসলিম যুবক, বৃদ্ধ ও বালককে হত্যা করে। বহুসংখ্যক মুসলিম নারীর ইজ্জত হরণ করে। এমনকি বাদ দেয়নি অতিশয় বৃদ্ধা বা ছোট মেয়েদেরও।

যুগোস্লাভিয়ার ওপর অস্ত্র-নিষেধাজ্ঞার কারণে বসনিয়ানরা আত্মরক্ষার অস্ত্রও পাচ্ছিল না। নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেওয়ার আবেদন করলেও জাতিসংঘ তা গ্রাহ্য করেনি। বরং সার্বদের ঘটনায় হস্তক্ষেপ করাকে অনধিকারচর্চা বলে অভিহিত করে।

এক পর্যায়ে জাতিসংঘ বসনিয়ায় শান্তিরক্ষী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। একটি বৃহৎ স্বাধীন রাষ্ট্রের মাত্র ছয়টি স্থানকে বসনিয়ানদের জন্য সেফ জোন হিসেবে নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু যেখানে ৩৭ হাজারের বেশি সৈন্য প্রয়োজন ছিল সেখানে মাত্র ৭ হাজারের মতো সৈন্য মোতায়েন করা হয়। এর মধ্যে কার্যকরভাবে মোতায়েন ছিল মাত্র ৩ হাজারের কিছু বেশি সৈন্য।

সেব্রেনিৎসা শহরকে সেফ এরিয়া হিসেবে ঘোষণা করলেও সেখানে ৬ হাজার সৈন্যের প্রয়োজনীয়তার বিপরীতে মোতায়েন করা হয়েছিল মাত্র কয়েকশ ডাচ শান্তিরক্ষী। সেটাও আবার খুবই সাধারণ অস্ত্র সজ্জিত অবস্থায়।

সব কিছু সাজানোই ছিল। ফলে কোনও রকম বাধা ছাড়াই ডাচ সৈন্যদের একপ্রকার সহায়তায় ১১ জুলাই শহরটি দখলে নিয়ে ব্যাপক গণহত্যা শুরু করে সার্বরা।

১১ জুলাই সেব্রেনিৎসা দখলের পর কয়েক ঘন্টার মধ্যে আট হাজারেরও বেশি বসনিয়াক পুরুষ ও কিশোরকে হত্যা করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃত। সেই গণহত্যার প্রমাণ ভিডিওচিত্র ধ্বংস করে সেখানে জাতিসংঘের নিযুক্ত ডাচ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা। এভাবেই গণহত্যার প্রমাণ লোপাট করা হয়।

২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) সেব্রেনিৎসার হত্যাযজ্ঞকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। যদিও আদালত রায়ে সেব্রেনিৎসা হত্যাযজ্ঞকে গণহত্যা অভিহিত করে, একই সঙ্গে আদালত রায়ে উল্লেখ করে যে, সার্বিয়া এই গণহত্যা প্রতিরোধ এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে আদালত সার্বিয়া রাষ্ট্রকে সরাসরি গণহত্যা সংঘটনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেনি।

বসনিয়ার এই ট্র্যাজেডি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যর্থতা, মানবাধিকার রক্ষায় দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ এবং গণহত্যা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হয়ে আছে। বসনিয়ার এই ঘটনা মুসলমানের জন্য পশ্চিমা দুনিয়া আর জাতিসংঘের আচরণকে বোঝার জন্য যথেষ্ট সহায়ক।

তথ্যসূত্র : আল-জাজিরা, বিবিসি, নিউ ইয়র্ক টাইমস, টাইম ম্যাগাজিন