সিঙ্গাপুরের পাঁচ তারকা হোটেলে চট্টগ্রামভিত্তিক বিতর্কিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম মাসুদের দ্বিতীয় ছেলে আশরাফুল আলম মুহিতের ‘এনগেইজমেন্ট’ অনুষ্ঠানে ১৭০ অতিথির আপ্যায়নে খরচ হয়েছিল প্রায় আড়াই কোটি টাকা। অনুষ্ঠানে প্রতিজনের ডিনার প্যাকেজের মূল্য ছিল ৫৪০ সিঙ্গাপুর ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫২ হাজার টাকা। মুহিত ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা মামলার আসামি। যুক্তরাজ্যের স্বায়ত্বশাসিত দ্বীপ ‘আইল অফ ম্যানে’ ৯৭ কোটি টাকা মূল্যের একটি ভিলার মালিকানা আছে তার।
লন্ডনভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের প্রকাশিত নথিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে। নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সিঙ্গাপুরের পাঁচতারকা হোটেল ‘ক্যাপেলা সিঙ্গাপুরে’ অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত বিল ছিল ২ লাখ ৪২ হাজার ১১৪ দশমিক ৪০ সিঙ্গাপুর ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ কোটি ৩১ লাখ ৩১ হাজার ৮০৯ টাকা।
অন্তত নয়টি বিদেশি আর্থিক নজরদারি সংস্থার গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সংকলিত এক অগ্রগতি প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, সাইফুল আলম মাসুদের মালিকানাধীন এস আলম গ্রুপ নয়টি দেশে নিবন্ধিত অন্তত ৪৭০টি শেল কোম্পানির নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। এই অর্থ বাংলাদেশের বর্তমান জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশের সমান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকাশিত নথিতে বর হিসেবে এস আলম গ্রুপের মালিক সাইফুল আলম মাসুদের দ্বিতীয় ছেলে আশরাফুল আলম মুহিত এবং কনে হিসেবে সুবাহ জারিনের নাম রয়েছে। সুবাহ জারিন চট্টগ্রামভিত্তিক মীর গ্রুপের চেয়ারম্যান ও খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুস সালামের মেয়ে।
সিঙ্গাপুরের অনুষ্ঠানের পর ২০২৩ সালের ১০ জুন চট্টগ্রামের রেডিসন ব্লু হোটেলে বিয়ের আয়োজন করা হয়। দুই দিন পর, ১২ জুন একই হোটেলে বিবাহোত্তর সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই অনুষ্ঠানেই কয়েক হাজার অতিথি উপস্থিত ছিলেন এবং সেগুলো চট্টগ্রামের সবচেয়ে ব্যয়বহুল আয়োজনগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল।
সিঙ্গাপুরের হোটেলের বিলে কী ছিল?
নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১০ এপ্রিল ইস্যু করা চূড়ান্ত বিলে ভেন্যু ভাড়া, কাস্টমাইজড ডিনার, সার্ভিস চার্জ ও করসহ মোট বিল ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪২ হাজার ১১৪ দশমিক ৪০ সিঙ্গাপুর ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ কোটি ৩১ লাখ ৩১ হাজার ৮০৯ টাকা।
বিল পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২৫ মে ২৪ ঘণ্টার জন্য ভেন্যু ভাড়া ছিল ৭০ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার (প্রায় ৬৬ লাখ ৮৭ হাজার ৮০০ টাকা)। ২৬ মে অতিরিক্ত ভেন্যু ব্যবহারের জন্য ধরা হয়েছে আরও ৪০ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার (প্রায় ৩৮ লাখ ২১ হাজার ৬০০ টাকা)। কাস্টমাইজড ডিনারের ন্যূনতম ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৩ হাজার ৮০০ সিঙ্গাপুর ডলার (প্রায় ৮৯ লাখ ৬৩ হাজার ৬৫২ টাকা)।
এসব খাত মিলিয়ে সাব-টোটাল দাঁড়ায় ২ লাখ ৩ হাজার ৮০০ সিঙ্গাপুর ডলার (প্রায় ১ কোটি ৯৪ লাখ ৭৩ হাজার ৫২ টাকা)। এর সঙ্গে ১০ শতাংশ সার্ভিস চার্জ ও সিঙ্গাপুর সরকারের প্রযোজ্য কর যুক্ত হয়ে চূড়ান্ত বিলের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ ৪২ হাজার ১১৪ দশমিক ৪০ সিঙ্গাপুর ডলার।
চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১১ এপ্রিলের মধ্যে মোট বিলের ৫০ শতাংশ, অর্থাৎ ১ লাখ ২১ হাজার ৫৭ দশমিক ২০ সিঙ্গাপুর ডলার (প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ ৬৫ হাজার ৯০৪ টাকা) অগ্রিম জমা দিতে হয়েছে। একই পরিমাণ অর্থ ২ মে’র মধ্যে পরিশোধের সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানের পর অতিরিক্ত কোনো ব্যয় হলে তা ব্যাংক ট্রান্সফার বা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে পরিশোধের শর্তও বিলে উল্লেখ ছিল।
১৭০ অতিথির জন্য ডিনার
প্রাথমিক বিল অনুযায়ী, ওয়ালিমা অনুষ্ঠানের জন্য কেবল ভেন্যু ভাড়া ও ডিনার প্যাকেজেই ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৩ হাজার ৮০০ সিঙ্গাপুর ডলার।
নথিতে উল্লেখ রয়েছে, ২০২৩ সালের ২৪ মে সারাদিন ভেন্যু প্রি-সেটআপের জন্য সংরক্ষিত ছিল। ২৫ মে মূল অনুষ্ঠানের দিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত আবারও প্রি-সেটআপ, বিকেল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ককটেল রিসেপশন ও চেঞ্জিং রুম ব্যবহারের সময় এবং রাত ৭টা থেকে ১১টা পর্যন্ত গ্র্যান্ড বলরুমে ডিনারের আয়োজন করা হয়।
ডিনার প্যাকেজের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল জনপ্রতি ৫৪০ সিঙ্গাপুর ডলার, অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫১ হাজার ৫৯২ টাকা। ১৭০ অতিথির জন্য ন্যূনতম ডিনার ব্যয় ছিল ৯৩ হাজার ৮০০ সিঙ্গাপুর ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৯ লাখ ৬৩ হাজার ৬৫২ টাকা। মেনুতে শূকরের মাংস, লার্ড ও অ্যালকোহল থাকবে না বলেও বিলে উল্লেখ করা হয়।
বিএনপি সরকার আসার পর ফের নাগরিকত্ব ছাড়ার আবেদন
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগেই পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে আশরাফুল আলম মুহিত বাংলাদেশ ছেড়ে সিঙ্গাপুরে চলে যান। পরে তার বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও, বিএনপি সরকার গঠনের পর গত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে বাবা-মা ও ভাইয়ের পাশাপাশি তিনিও দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে।
নথি অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপ আইল অব ম্যানে আশরাফুল আলম মুহিতের নামে ব্রুকউড, ১৫ প্রিন্সেস ড্রাইভে প্রায় ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ৯৭ কোটি টাকা মূল্যের একটি ভিলা রয়েছে। ২০২০ সালে তার মা ফারজানা পারভীনের উপহার হিসেবে সম্পত্তিটি নিবন্ধিত হয়।
ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় বড় ভাই আহসানুল আলমের সঙ্গে আশরাফুল আলম মুহিতও আসামি। এছাড়া ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কালো টাকা সাদা করার সুযোগের অপব্যবহার করে ৫০ কোটি টাকার ভুয়া পে-অর্ডারের তথ্য দিয়ে আয়কর নথি দাখিলের অভিযোগে ভাই আসাদুল আলম মাহিরের সঙ্গে তার বিরুদ্ধেও মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।