Image description
গোলাম রব্বানী
 

তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা নিয়ে আপাতত সব ধরনের আইনি জটিলতার অবসান হলো বলা যায়। পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার রায়ের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে পুনর্বহাল করা হয়েছে। এর ফলে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল, তা আবার ফিরল।

এতে গত দুই দশক ধরে দেশে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের যে সংকট তৈরি হয়েছিল, আপাতত তার অবসান হলো। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা আগের মতোই থাকবে, নাকি নতুন করে পুনর্গঠন করা হবে, তা এখনো নির্ধারণ হয়নি। পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার সময় নির্ধারণ ও উপদেষ্টাদের শপথসহ বেশ কিছু বিষয়ে এখনো সুরাহা হয়নি। ফলে যেতে হবে সংসদে।

পঞ্চদশ সংশোধনী মামলায় আপিলকারী ড. বদিউল আলম মজুমদারের আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেছেন, পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোটা বাতিল না হওয়ায় কিছু টেকনিক্যাল সমস্যা তৈরি হবে। কারণ হাইকোর্টের রায়ে সবগুলো বিধান বাতিল হয়নি। আরও কিছু বিধান বাতিল করা প্রয়োজন ছিল। যেমন উপদেষ্টা, প্রধান উপদেষ্টার শপথ নেওয়াসংক্রান্ত বিধান সংবিধানে ফিরে আসেনি। বিচারপতিরা যে উপদেষ্টা বা প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিতে পারবেন, সেই বিষয়ে একটা বিধান ছিল, সেটা ফিরে আসেনি।

তার মতে, যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হওয়ার পরে নির্বাচন হবে, কাজেই বিধান ছিল, সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে, তারপর নির্বাচন হবে। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনী দিয়ে বিধান করা হয়, সংসদ ভেঙে যাওয়ার ৯০ দিন আগেই নির্বাচন করতে হবে। সেই বিধান যদি বহাল থাকে, তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা সম্ভব হয় না। যেহেতু সংসদ ভেঙে দেওয়ার আগেই আপনাকে নির্বাচন করতে হচ্ছে, আপনি তো তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যেটা সংসদের মেয়াদ শেষে গঠিত হওয়ার কথা, সেটা গঠন করতে পারছেন না। কাজেই এখানে একটা বড় স্ববিরোধিতা আছে।

 

 

তিনি বলেছেন, আমরা ভেবেছিলাম আপিল বিভাগ পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোটা বাতিল না করলেও এসব বিষয়ে কিছু অবজারভেশন দেবেন বা অতিরিক্ত যে ধারাগুলো বাতিল করা প্রয়োজন, সেগুলো বাতিল করবেন। তবে বাতিল না করায় এখন যেটা হলো, এই টেকনিক্যাল বিষয়গুলো সংসদকে সুরাহা করতে হবে।

সংসদ চাইলে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা রিডিফাইন করতে পারে জানিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, যেহেতু ভাইব্রেন্ট পার্লামেন্ট আছে এবং আদালতের অবজারভেশনও আছে যে, অনেকগুলো বিষয়ে পরবর্তী পার্লামেন্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন হওয়ার পরে সংসদ যদি মনে করে আগে যে কাঠামোতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল ছিল, সেটি হয়তো এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রিডিফাইন করবে, তাহলে সেই ক্ষমতা তো পার্লামেন্টের আছেই।

এদিকে এসব আইনি জটিলতার পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নতুন পরিকল্পনা এবং নির্বাচনী ইশতেহারে দলগুলোর এ বিষয়ে করা প্রতিশ্রুতি তত্ত্বাবধায়কের নতুন ফরম্যাটেরই ইঙ্গিত মেলে।

ত্রয়োদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছিল, সেখানে বিচার বিভাগ সংশ্লিষ্টদের অন্তর্ভুক্তি প্রশ্নে বিভিন্ন সময় বিতর্ক সৃষ্টি হয়। মূলত উচ্চ আদালতকে বিতর্কমুক্ত রাখতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বিচারপতিদের রাইরে রাখার ভাবনা শুরু হয়। রাজনৈতিক দলগুলোও এর বিকল্প ভাবতে শুরু করে।

ক্ষমতাসীন বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতাহারে বলেছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা কেমন হবে তা পরবর্তী সংসদে আলোচনা এবং স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। তবে বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বাইরে রাখতে চায় বিএনপি।

নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী যদি বিএনপি পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রপতিকে বাইরে রাখতে চায়, তবে তা নতুন করে একটি রূপ পাবে নিঃসন্দেহে।

 

পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে দেশের ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্য হয়। তবে এমন সরকারের রূপরেখা কেমন হবে সে বিষয়ে রয়েছে একাধিক বিকল্প। তবে এসব বিকল্প চূড়ান্তভাবে গৃহীত হবে কী হবে না, তাও নির্ভার করছে সংসদের ওপর।