Image description

বাংলাদেশিরা নাকি সুইস ব্যাংকে ২০২৫ সালে আরো বেশি অর্থ জমা রেখেছেন। এ খবর চাউর হবার পর কিছু দিন ধরে চারিদিকে মুখরোচক আলোচনা।

প্রতি বছরই সুইস ব্যাংক তাদের বার্ষিক হিসাবের সারসংক্ষেপ তৈরি করে। আর প্রতিবারই এ নিয়ে বাংলাদেশে কলরব ওঠে। কিন্তু এবার কলরব বেশি। কারণ সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট আমানতের পরিমাণ ৪১ শতাংশ বেড়েছে। এখন পরিমাণটা নাকি ৮৩৪ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ বা বাংলাদেশি টাকায় গুণলে প্রায় ১২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। আগের বছর ২০২৪ সালেও বেড়েছিল। সেটা ছিল ৩৩ শতাংশ।

এই খবরে অনেকের চোখ কপালে উঠেছে। ২০২৪ সালে আমানত বৃদ্ধির না হয় সহজ ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায়। আওয়ামী সরকারের পলাতক দুর্নীতিবাজেরা তাদের পাচার করা টাকা তো ওই নিরাপদ স্থানেই রাখবেন। কিন্তু ২০২৫ সাল পুরোটাই ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমল, যাদের প্রধান কাজ ছিল দেশে দুর্নীতি, চুরিচামারি রদ করা এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা। ইউনূস আমলে কী করে সুইস ব্যাংকে আমানতের রেকর্ড সৃষ্টি হলো?

সুইস ব্যাংকে টাকা জমা রাখার প্রসঙ্গে এলেই আমার জনপ্রিয় ব্রিটিশ লেখক জেফরি আর্চারের একটা গল্পের কথা মনে পড়ে যায়। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত এ গল্পটির নাম ‘Clean Sweep Ignatius’। এ গল্পের সঙ্গে আমাদের পরিস্থিতির অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। আমি একদফা মিল পেয়েছিলাম ২০০৬-৭ সালে। সেবারও ওয়ান-ইলাভেনের সরকার এসেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে খগড়হস্ত হয়েছিল।

গল্পটা বলা যাক, ছোট করে। তবে তার আগে সবার শুধু এটুকু জানা থাকা দরকার যে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলিতে অর্থ জমা রাখার সবচেয়ে আকর্ষণীয় সুবিধা হলো, এই ব্যাংকগুলি আমানতকারীর তথ্য গোপন রাখার আইনি সুরক্ষা ভোগ করে। রাষ্ট্রের কোনো সংস্থা কোনো আমানতকারীর কোনো তথ্যই চাইতে পারে না। চাইলেও ওই ব্যাংক দেবে না। শুধু তাই না, আমানতকারীর তথ্য এতই গোপন রাখা হয় যে ওই ব্যাংকের ম্যানেজারও আমানতকারীর নাম-ধাম জানে না। কিছু কোড নাম্বার ব্যবহার করা হয় নামের বদলে। পাবলিক পরীক্ষার খাতায় যেভাবে পরীক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষার্থীর পরিচয় গোপন রাখা হয়।

জেফরি আর্চারের গল্পের ঘটনা আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়া। সেখানে সরকারের মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে বরাবর দুর্নীতি এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ ওঠে। তো একবার অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিলেন ইগনেশিয়াস আগারবি নামে এক জাদরেল রাজনীতিবিদ। ক্ষমতার চেয়ারে বসেই তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ শুরু করলেন। ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠলেই নিম্নপদস্থ আমলা, পিয়ন, চাপরাশিদের ধরে ধরে কারাগারে পাঠানো শুরু হলো। উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের হাতেও পরতে শুরু করল হাতকড়া।

ইগনেশিয়াস নিজে সততার পরাকাষ্ঠা। সরকারের কাছ থেকে বেতন নেন না। পরিবারের কেউ সরকারি গাড়িতে চড়ে না। কোথাও ক্ষমতার তেজ দেখান না। চারিদিকে ‘বাহা! বাহা!’ পড়ে গেল। তার নাম দেওয়া হলো ‘পরিচ্ছন্ন ইগনেশিয়াস’। দেশের শীর্ষ নেতৃত্বও তার সততা আর দৃঢ়তায় মুগ্ধ হয়ে গেল।
একদিন প্রেসিডেন্ট জেনারেল ওটোবি ডাক দিলেন ইগনেশিয়াসকে। বললেন, ‘মন্ত্রী মহোদয়, ঘুষ ও দুর্নীতির বিপুল অর্থ এখনও দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে যে! আর সেগুলো গিয়ে জমা হচ্ছে সুইস ব্যাংকে। আপনি কিছু করেন। দেখেন, কারা সেখানে অর্থ জমা রাখছে।’

মন্ত্রী ইগনেশিয়াস টাকা পাচার তদন্তের জন্য বিশেষ ক্ষমতা চেয়ে নিলেন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে। বললেন, তিনি পাচারকারীদের গুষ্টি উদ্ধারের কঠিন মিশনে নামবেন। কিন্তু এ জন্যে পুরো মিশন গোপন রাখতে হবে। তথাস্ত।

কাকপক্ষীর অগোচরে কয়েক মাস ধরে প্রস্তুতি নিলেন অর্থমন্ত্রী। খোঁজ, খোঁজ, খোঁজ। তারপর একদিন পরিবারকে যুক্তরাষ্ট্রে রেখে একটা ব্রিফকেস হাতে গোপনে পা রাখলেন সুইজারল্যান্ডের রাজধানী জেনেভায়। হোটেলে রাত কাটিয়ে পরদিন সকাল সকাল হাজির হলেন সুইস ব্যাংকগুলোর একটিতে। রিসেপশ ডেস্কে বললেন, ব্যাংকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করতে চান। নাইজেরিয়ার অর্থমন্ত্রী স্বয়ং হাজির। ব্যাংক চেয়ারম্যান ছুটে এলেন। বিপুল খাতিরযত্নে মন্ত্রীকে তার খাস কামরায় নিয়ে গেলেন।
কক্ষে যখন দুজন একা, তখন মন্ত্রী ইগনেশিয়াস বিনীত ভঙ্গিতে অনুরোধ করলেন এই ব্যাংকে যেসব নাইজেরিয়ান নাগরিকের অ্যাকাউন্ট আছে, তাদের নামের তালিকা দিতে। ব্যাংকের চেয়ারম্যানও একই রকম বিনয় বজায় রেখে জবাব দিলেন, এ কাজের এক্তিয়ার তার নেই। তখন মন্ত্রী তার ব্রিফকেস খুলে দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের চিঠি দেখালেন। প্রেসিডেন্ট নিজে এ তথ্য চেয়েছেন। ব্যাংক চেয়ারম্যান অটল। তিনি বললেন, গ্রাহকদের গোপনীয়তা বজায় রাখা তাদের সর্বোচ্চ নীতি। অলঙ্ঘনীয়।

এবার ইগনেশিয়াস সুর বদলালেন। কড়া ভাষায় একের পর এক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের হুমকি দিতে শুরু করলেন। তাতেও কাজ হলো না। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কিছুতেই নতি স্বীকার করে না।
এবার বেপরোয়া ইগনেশিয়াস যেটা করলেন, সেটা অবিশ্বাস্য। তিনি তার ব্রিফকেসের ডালা আবার খুললেন। সেখান থেকে বের করলেন একটা পিস্তল। লোডেড। আর সেটা তিনি ঠেসে ধরলেন চেয়ারম্যানের চোয়ালে। তথ্য না দিলে গুলি করে মাথার খুলি উড়িয়ে দেবেন। চেয়ারম্যান তবু অবিচল। প্রাণ গেলে যাক। ব্যাংক তার নীতি থেকে এক চুল নড়বে না।

ক্লান্ত অর্থমন্ত্রী পিস্তল নামিয়ে নিলেন। এবার ব্রিফকেসের একটা গোপন চেম্বার খুললেন। সেখান থেকে বের হলো কয়েক মিলিয়ন ডলারের নোটের বান্ডিল। সেগুলো টেবিলে রেখে তিনি ব্যাংক চেয়ারম্যানকে বললেন, ‘নিন, এবার আমার নামে একটা অ্যাকাউন্ট খুলুন আর এগুলো জমা রাখুন।’
তাহলে দেখা যাচ্ছে, ইগনেশিয়াস আসলে পরীক্ষা করছিলেন সুইস ব্যাংকের গোপনীয়তার দেয়াল কতটা দুর্ভেদ্য। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো কীভাবে দুর্নীতির দুষ্টচক্রে পতিত হয় এবং কীভাবে দুর্নীতি দমনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ক্ষমতাসীনরাই দুর্নীতির নিয়ামকে পরিণত হন, তার কাহিনি আমাদের দেশেও চিরচেনা।

সুইস ব্যাংকের এবারের রেকর্ড আমানত বৃদ্ধির খবরকে অনেকে ইউনূস সরকারের ‘পরিচ্ছন্ন’ মন্ত্রীদের ‘ইগনেশিয়াসগিরি’র সুষ্পষ্ট স্বাক্ষর হিসেবে দেখছেন। আবার ইউনূস সরকারের প্রতি অনুরক্তরা বলছেন, এগুলো পতিত আওয়ামী সরকারের পলাতক দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী-ব্যবসায়ীদের টাকাই কিস্তিতে ঢুকছে।

তবে একটু খোঁজখবর করলে যে কেউ বুঝবেন, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানতের অর্থ নিয়ে এতো হাঙ্গামার কিছু নেই। কারণ সুইস ব্যাংকের কোনো অ্যাকাউন্টে বাংলাদেশিদের অর্থ থাকা মানেই সেটা পাচার করা অর্থ হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। একে তো যে-কোনো প্রবাসী বাংলাদেশি সুইস ব্যাংকে বৈধভাবে অ্যাকাউন্ট খুলে তাতে তাদের বৈধপথে অর্জিত অর্থ সেখানে রাখতে পারেন। রাখেনও। আবার রপ্তানির সঙ্গে জড়িত যে-কোনো বাংলাদেশি কোম্পানি রিটেনশন কোটা অ্যাকাউন্ট হিসেবে আইনসিদ্ধভাবে সুইস ব্যাংকে টাকা রাখতে পারে। তাছাড়া সুইস ব্যাংকের অনেক নিয়ম-কানুন ইতিমধ্যে বদলে গেছে ওইসিডি, যুক্তরাষ্ট্র আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের চাপে। এখন সুইস ব্যাংকগুলো পরনো আমলের মতো ততটা গোপন নয়। এগুলোয় টাকা রাখতে গেলে সেটার বৈধ উৎস এখন ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে দেখাতে হয়। এমনকি বিদেশি কেউ অর্থ রাখলে সেটা যে পাচার হয়ে না এসে বৈধ পথে এসেছে, তার প্রমাণাদিও দাখিল করতে হয়।

এসব কারণে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ দেখামাত্র সেটাকে সরাসরি পাচার হওয়া টাকা ভাবার অবকাশ কম। সুইস ব্যাংক একটা পুরনো অচল মিথে পরিণত হচ্ছে।