Image description

সুমন সুবহান

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক দাবার বোর্ডে এবার গভীর সমুদ্রের নীল জলরাশি। দীর্ঘদিনের পরিচিত হিমালয়ের উপত্যকা কিংবা কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ রেখার আকাশসীমাকে ছাপিয়ে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর সামরিক প্রতিযোগিতার মূল থিয়েটার হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর।

একদিকে বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানের দূরপাল্লার ঘাতক সাবমেরিন মোতায়েনের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের বৈশ্বিক মেরিটাইম নীতিতে ১৮০ ডিগ্রি ‘ইউ-টার্ন’—এই দুই ভূ-রাজনৈতিক স্রোত আজ একবিন্দুতে এসে মিলেছে। এই যুগপৎ ধাক্কায় নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের একক আধিপত্যবাদী ‘মেরিটাইম ডকট্রিন’ আজ দ্বিমুখী সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।

আপাতদৃষ্টিতে বিচ্ছিন্ন মনে হলেও পেন্টাগনের নীতি বদল এবং ইসলামাবাদ-বেইজিং অক্ষের এই সম্মিলিত সমীকরণ দক্ষিণ এশিয়ার সমুদ্র-নিরাপত্তার চেনা পরিমণ্ডলকে চিরতরে বদলে দিচ্ছে।

প্রথম সংকট: বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানের ‘হ্যাঙ্গর’ ও ‘সি ডেনিয়াল’ কৌশল

ঐতিহ্যগতভাবে ভারতীয় নৌবাহিনী তাদের পশ্চিম উপকূলে বা আরব সাগরে পাকিস্তানের সংঘাত মোকাবিলা করতে অভ্যস্ত ও প্রস্তুত থাকলেও, পূর্ব উপকূলে তথা বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানের এই নতুন সামরিক উপস্থিতি ভারতের জন্য সম্পূর্ণ নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশাল ভারতীয় নৌবাহিনীর সাথে সারফেস লেভেলে সম্মুখ সমরে জেতা পাকিস্তানের জন্য প্রায় অসম্ভব। তাই তারা সাবমেরিন ব্যবহার করে ‘সি ডেনিয়াল’ কৌশল বেছে নিয়েছে।

কলম্বো ডিক্লারেশন: যেখান থেকে সংকটের সূত্রপাত

চলতি বছরের জুনের শুরুতে শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরে নোঙর করা পাকিস্তানি নৌবাহিনীর ফ্রিগেট পিএনএস তাইমুর-এর ডেকে এক হাই-প্রোফাইল কূটনৈতিক ও সামরিক নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। এই ফ্রিগেটটি মূলত চীন থেকে সমুদ্রযাত্রায় রওনা হওয়া পাকিস্তানের প্রথম আধুনিক সাবমেরিন পিএনএস হ্যাঙ্গরকে এসকর্ট করে নিয়ে যাচ্ছিল। চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পাদিত ৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তির আওতায় মোট ৮টি হ্যাঙ্গর ক্লাস সাবমেরিন নির্মিত হচ্ছে। এর মধ্যে প্রথম ৪টি চীন সরাসরি তৈরি করছে এবং বাকি ৪টি করাচিতে প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে নির্মিত হচ্ছে, যা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা শিল্পকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।

শ্রীলঙ্কান সংবাদমাধ্যম দ্য মর্নিংয়ে ২০২৬ সালের ৭ জুন প্রকাশিত প্রতিরক্ষা সাংবাদিক অসিরি ফার্নান্দোর প্রতিবেদনে পাকিস্তানের ১৮তম ডেস্ট্রয়ার স্কোয়াড্রনের কমান্ডার এবং ফ্লোটিলা মিশন কমান্ডার কমোডর ওমর ফারুক পাকিস্তানের এই সুদূরপ্রসারী মেরিটাইম পরিকল্পনার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেন।

সাক্ষাৎকারে কমোডোর ওমর ফারুক অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ভারতের নৌ-নিরাপত্তার মূল দুর্গে আঘাত হানার ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন এবং দীর্ঘপাল্লার সক্ষমতা সমৃদ্ধ এই নতুন সাবমেরিন পিএনএস হ্যাঙ্গর বহরে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে পাকিস্তান নৌবাহিনী এখন বঙ্গোপসাগরে তাদের নিয়মিত ও টেকসই উপস্থিতি বজায় রাখার সক্ষমতা ও পরিধি অর্জন করবে। এটি মূলত একটি কৌশলগত ঘোষণা। ১৯৭১ সালের পর বিগত সাড়ে পাঁচ দশকে এই প্রথম পাকিস্তান তাদের সনাতন সামুদ্রিক সীমানা থেকে হাজার মাইল দূরে অপারেশনাল উপস্থিতি বাড়ানোর কথা জানাল।

এআইপি প্রযুক্তি ও ‘ক্যারিয়ার কিলার’ সক্ষমতা

পাকিস্তানের নতুন কৌশলগত আত্মবিশ্বাসের মূল ভিত্তি হলো চীনের সহায়তায় নির্মিত সাবমেরিনগুলোর বিধ্বংসী প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, যা ভারতের বিলিয়ন ডলারের বিমানবাহী রণতরীগুলোর একক আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। এই সাবমেরিনগুলোতে যুক্ত রয়েছে অত্যন্ত আধুনিক এয়ার ইন্ডিপেনডেন্ট প্রপালশন (এআইপি) প্রযুক্তি। এর ফলে সাবমেরিনটি ব্যাটারি চার্জ করার জন্য বারবার পানির ওপরে না এসে একাধারে ৩০ দিন পর্যন্ত সম্পূর্ণ পানির নিচে থাকতে পারে এবং পরবর্তীতে আরও ৩০ দিন একটানা মিশন পরিচালনা করতে সক্ষম।

গভীর সমুদ্রে শত্রুর চোখ এড়িয়ে এটি নিখুঁত ‘অ্যাডভান্সড স্টেলথ’ নিশ্চিত করে। এই সাবমেরিনে চীনের আধুনিক ওয়াইইউ-৬ ভারী টর্পেডো ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি একটি ডেডিকেটেড ‘ক্যারিয়ার কিলার’ অস্ত্র। এছাড়াও এই সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য বাবর ক্রুজ মিসাইলের সাহায্যে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার দূর থেকে শত্রুপক্ষের রণতরীর রানওয়ে বা উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অচল করা সম্ভব।

মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এবং আইএনএস খুকরির স্মৃতি

১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তানের তৎকালীন পিএনএস হ্যাঙ্গর সাবমেরিনটি ভারতের অ্যান্টি-সাবমেরিন যুদ্ধজাহাজ আইএনএস খুকরিকে ডুবিয়ে দিয়েছিল। সেই সময় পাকিস্তানের সাবমেরিন আতঙ্কে ভারতের বিমানবাহী রণতরীকে আন্দামান সাগরে গিয়ে লুকিয়ে থাকতে হয়েছিল। সেই একই নাম দিয়ে এই নতুন আধুনিক সাবমেরিন ক্লাসের পুনর্জন্ম মূলত ভারতের সাউথ ব্লকের নৌ-কমান্ডারদের জন্য একটি তীব্র মনস্তাত্ত্বিক বার্তা।

দ্বিতীয় সংকট: আমেরিকার ইউ-টার্ন এবং ‘ইন্দো’ শব্দের বিসর্জন

ইতালিতে আয়োজিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হাই-প্রোফাইল সাক্ষাতের আবহ কাটতে না কাটতেই পেন্টাগন (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) ঘোষণা করেছে যে, মার্কিন সামরিক কমান্ডের নাম থেকে ‘ইন্দো’ শব্দটিকে পাকাপাকিভাবে ছেঁটে ফেলা হচ্ছে।

২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেই তৎকালীন প্রতিরক্ষা সচিব জেমস ম্যাটিসের হাত ধরে ‘ইউএস প্যাসিফিক কমান্ড’-এর নাম বদলে রাখা হয়েছিল ‘ইউএস ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড’। এর লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট, ভারত মহাসাগরের কৌশলগত গুরুত্বকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া এবং নয়াদিল্লিকে প্রধান অক্ষ করে এশীয় অঞ্চলে চীনা ড্রাগনের একাধিপত্য রুখে দেওয়া। কিন্তু হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এসে পেন্টাগনের এই বিপরীতমুখী সিদ্ধান্ত গভীর কূটনৈতিক জল্পনার জন্ম দিয়েছে।

ট্রাম্প-জিনপিং গোপন বোঝাপড়া ও কোয়াডের সংকট

আপাতদৃষ্টিতে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর একে ‘ঐতিহাসিক প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য রক্ষা’র প্রয়াস বলে দাবি করলেও, এই নামকরণের রাজনীতির নেপথ্যে চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিনপিংয়ের সাথে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বেইজিং সফরের গোপন ও লেনদেনভিত্তিক বোঝাপড়া রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত কয়েক মাস ধরে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে শুল্ক এবং প্রযুক্তিগত যুদ্ধ চরম মাত্রায় পৌঁছালেও, ট্রাম্প দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে পাশে সরিয়ে রেখে একক বাণিজ্যিক স্বার্থ ও শুল্ক হ্রাসকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। আমেরিকার এই আকস্মিক ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত পিছুটান স্বাভাবিকভাবেই চীনের একাধিপত্য রুখতে গঠিত চারদেশীয় অক্ষ ‘কোয়াড’-কে এক গভীর এবং নজিরবিহীন অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

দিল্লির মেরিটাইম ডকট্রিন: ঘরের মাঠে একাকীত্ব

ইনডোপাকম থেকে পাকম-এ রূপান্তর ওয়াশিংটনের প্রধান মিত্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে নয়াদিল্লির অনন্য সামরিক ও রাজনৈতিক মর্যাদাকে যেমন ম্লান করেছে, তেমনি ভারতের স্বাধীন আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সমুদ্র-নিরাপত্তা ডকট্রিনে এক বিশাল বড় ধাক্কা দিয়েছে। যেমন:

কৌশলগত ভারসাম্যহীনতা

এতদিন ভারত ‘কোয়াড’ এবং মার্কিন অংশীদারিত্বের ওপর ভরসা করে ভারত মহাসাগরে চীনের বিরুদ্ধে একটি বড় প্রতিরোধ ব্যূহ গড়ে তুলেছিল। কিন্তু আমেরিকা তার নিজের বাণিজ্যিক স্বার্থে পিছু হটলে ভারতকে একাই এই বিশাল অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

অ্যান্টি-সাবমেরিন ডিফেন্সে বাড়তি চাপ

বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানের হ্যাঙ্গর সাবমেরিনের নিয়মিত উপস্থিতির ফলে ভারতকে এখন বাধ্য হয়েই তাদের ইস্টার্ন নেভাল কমান্ড এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের নিরাপত্তা বহুগুণ বাড়াতে হবে। এর ফলে পি-৮১ নেপচুন-এর মতো দূরপাল্লার অ্যান্টি-সাবমেরিন বিমান এবং ডেডিকেটেড করভেটের পেছনে ভারতের প্রতিরক্ষা বাজেট ও সামরিক মনোযোগের বড় অংশ ব্যয় করতে হবে, যা তাদের অন্য থিয়েটারগুলোকে দুর্বল করতে পারে।

আঞ্চলিক মেরিটাইম ও অর্থনৈতিক সমীকরণ: বাংলাদেশ ফ্যাক্টর

শ্রীলঙ্কান সংবাদমাধ্যম দ্য মর্নিংয়ে কমোডর ফারুকের দেওয়া বিবৃতির পেছনে বেইজিং-ইসলামাবাদ-কলম্বো এবং সাম্প্রতিক ঢাকা-ইসলামাবাদ অক্ষের প্রচ্ছন্ন কূটনৈতিক রসায়ন কাজ করছে, যা দিল্লির জন্য উদ্বেগের বড় কারণ।

চীনের ‘স্ট্রিং অফ পার্লস’ ও প্রক্সি যুদ্ধ

পাকিস্তানের এই পদক্ষেপের পেছনে মূলত চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ কৌশলের প্রচ্ছন্ন সমর্থন রয়েছে। বঙ্গোপসাগর এবং মালাক্কা প্রণালীর দিকে ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্য ও নজরদারিকে ব্যস্ত রাখতে চীন এখানে পাকিস্তানকে একটি ‘স্ট্র্যাটেজিক প্রক্সি’ হিসেবে ব্যবহার করছে। এর ফলে যুদ্ধের সময় ভারত চাইলেও তার পুরো নৌ-শক্তিকে মালাক্কা প্রণালীতে চীনের এনার্জি সাপ্লাই রুট ব্লক করার জন্য পাঠাতে পারবে না; বরং তাকে নিজের ঘরের মাঠ অর্থাৎ বঙ্গোপসাগরেই পাকিস্তানের সাবমেরিন শিকারে ব্যস্ত থাকতে হবে।

সাপ্লাই চেইন ও গভীর সমুদ্রবন্দরের ঝুঁকি

বঙ্গোপসাগর এই অঞ্চলের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান লাইফলাইন। পাকিস্তানের সাবমেরিন মোতায়েনের ফলে এই রুটে মেরিটাইম ইন্স্যুরেন্সের খরচ বৃদ্ধি এবং যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সামগ্রিক আঞ্চলিক সাপ্লাই চেইন নতুন ঝুঁকির মুখে পড়বে। পাশাপাশি, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, পায়রা কিংবা মাতারবাড়ির মতো উদীয়মান গভীর সমুদ্রবন্দরগুলোর কৌশলগত নিরাপত্তার সমীকরণও এর ফলে নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন হবে।

দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক বাজেট বৈষম্য ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

দক্ষিণ এশিয়ার এই উত্তাল মেরিটাইম প্রতিযোগিতার যুগে আঞ্চলিক দেশগুলোর সামরিক বাজেটের দিকে তাকালে এক বিশাল বৈষম্য চোখে পড়ে, যা শক্তি ভারসাম্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যেখানে ভারত ও পাকিস্তান যথাক্রমে ৮৬ বিলিয়ন ও ১০.৮ বিলিয়ন ডলারের বিশাল সামরিক বাজেট নিয়ে নিজেদের সমুদ্রসীমা আধুনিকায়ন করছে, সেখানে বাংলাদেশের ৫০০ বিলিয়ন ডলারের জিডিপি থাকা সত্ত্বেও সামরিক বাজেট মাত্র ৩.৫ বিলিয়ন ডলার। এই সীমিত বাজেট এবং দুটি পুরনো ‘মিং-ক্লাস’ সাবমেরিন নিয়ে বঙ্গোপসাগরের আসন্ন হাই-টেক সামরিকায়নের যুগে দেশের মেরিটাইম নিরাপত্তা অক্ষুণ্ন রাখা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। উদীয়মান গভীর সমুদ্রবন্দর ও সমুদ্রসম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে বাংলাদেশকে অবশ্যই তার নিজস্ব সামরিক বাজেট ও কৌশলগত প্রতিরক্ষানীতি দ্রুত পুনর্বিন্যাস করতে হবে।

বিশ্ব কূটনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় এবং জ্বলন্ত প্রশ্ন—চীনের ক্ষোভ প্রশমন, বাণিজ্যিক শুল্ক হ্রাস ও নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখতে ট্রাম্প কি তবে ভারতকে একাকী রেখেই এশিয়ার নতুন কোনো মাস্টার প্ল্যান সাজাচ্ছেন?

একদিকে বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানের আধুনিক হ্যাঙ্গর সাবমেরিনের ২ মাসের নিঃশব্দ ও ওত পেতে থাকা চ্যালেঞ্জ; অন্যদিকে বৈশ্বিক মঞ্চে প্রধান কৌশলগত মিত্র আমেরিকার স্বার্থপর পিছুটান—এই দুইয়ের কবলে পড়ে ভারতের মেরিটাইম ডকট্রিন এখন এক গভীর আবর্তে নিমজ্জিত। এই পরিবর্তিত অবস্থান এবং পাকিস্তানের নতুন নৌ-সমীকরণ মূলত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্যে এক আসন্ন বড় ধরনের প্রলয়ঙ্করী ঝড়েরই স্পষ্ট পূর্বাভাস দিচ্ছে। এই ঝড়ে দিল্লি তার সমুদ্রসীমার একাধিপত্য কতটা ধরে রাখতে পারবে, তা নির্ভর করবে তাদের আগামী দিনের ‘একাকী’ লড়াইয়ের কৌশলগত দক্ষতার ওপর। তবে এই মহাসাগরীয় উত্তেজনার আঁচ থেকে মুক্ত নয় বাংলাদেশও। ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল জিডিপি থাকা সত্ত্বেও মাত্র ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের নগণ্য সামরিক বাজেট এবং দুটি পুরনো ‘মিং-ক্লাস’ সাবমেরিন নিয়ে এই আসন্ন হাই-টেক সামরিকায়নের যুগে ঢাকা কতটা সুরক্ষিত, তা পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে।

বাংলাদেশের সামনে এখন প্রধান করণীয় হলো একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, বাস্তবসম্মত এবং ত্রি-মাত্রিক ‘মেরিটাইম ডিফেন্স ডকট্রিন’ প্রণয়ন করা। কক্সবাজারের পেকুয়ায় বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক সাবমেরিন ঘাঁটি ‘বানৌজা শেখ হাসিনা’-কে সচল ও অর্থবহ করতে হলে অবিলম্বে বহরে যুক্ত করতে হবে সমসাময়িক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ আধুনিক সাবমেরিন ও মেরিটাইম প্যাট্রোল এয়ারক্রাফট। কোনো একক ব্লকের ওপর সামরিক বা কৌশলগতভাবে নির্ভরশীল না হয়ে বেইজিং, ওয়াশিংটন এবং দিল্লির সাথে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, যেন বাংলাদেশের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল কোনো পরাশক্তির প্রক্সি যুদ্ধের ময়দানে পরিণত না হয়। পাশাপাশি, চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ির মতো গভীর সমুদ্রবন্দরগুলোর সুরক্ষায় নিজস্ব কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনীর ‘সারফেস-টু-এয়ার’ এবং অ্যান্টি-সাবমেরিন ডিফেন্স সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করা জরুরি। মেরিটাইম ইন্স্যুরেন্সের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং যুদ্ধের সময়েও জ্বালানি ও বাণিজ্যের বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন সচল রাখতে ব্লু-ইকোনমি ও কৌশলগত সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে আগামী দিনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার মূল চাবিকাঠি।

  • সুমন সুবহান: নিরাপত্তা বিশ্লেষক