সম্প্রতি একটি ভিডিও ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে বেশ আলোচনা শুরু হয়েছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বাংলাদেশের সংগীতশিল্পী হাবিব ওয়াহিদের গাওয়া ‘মহা জাদু’ গানটি। ভিডিওটি ছিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম নিয়ে।
‘আমার বন্ধু মহা জাদু জানে’ গানটি বেশ পুরোনো। বাউল খোয়াজ মিয়ার লেখা এই গান বহু বছর ধরে বাংলার লোকসংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে। গ্রামবাংলার আসর থেকে শুরু করে ইউটিউবে অনেকের গলায় গানটি শোনা গেছে। তবে ‘মহা জাদু’ নতুন করে আলোচনায় এসেছে কোক স্টুডিও বাংলার তৃতীয় মৌসুমে। সেখানে হাবিব ওয়াহিদের সুর ও কণ্ঠের সঙ্গে তাজাকিস্তানের শিল্পী মেহরনিগরি রুস্তমের ফারসি অংশ যুক্ত হয়ে গানটিকে নতুন মাত্রা দেয়। লোকগান ও আধুনিক সংগীতের মিশেলে গানটি আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছেও পৌঁছে যায়।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর ভিডিওতে এই গানটি কেন ব্যবহার করা হয়েছে, তা নিয়ে অনেকের কৌতূহল রয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। হাবিব ওয়াহিদ নিজেও বিষয়টি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাঁর ধারণা, হয়তো গানটি তাদের ভালো লেগেছে বলেই ব্যবহার করা হয়েছে।
অনেকের ধারণা, এর পেছনে বিশেষ কোনো রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক কারণ নেই। এটি হয়তো কাকতালীয়। হয়তো কোক স্টুডিও বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম হওয়ায় গানটি আন্তর্জাতিকভাবে সহজেই মানুষের নজরে এসেছে। আবার এমনও হতে পারে, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ভিডিওর ‘ভাইব’-এ ম্যাচিং করে এমন বাংলা গান খোঁজা হয়েছিল, আর সেই সূত্রেই গানটি তাদের কাছে পৌঁছেছে।
সফট পাওয়ার
তবে এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংস্কৃতির প্রভাব বা ‘সফট পাওয়ার’। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গান, সিনেমা, সাহিত্য কিংবা খেলাধুলার মতো সাংস্কৃতিক উপাদানকে এখন সফট পাওয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হয়। যেখানে কোনো দেশ সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহার না করেও তার সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে অন্য দেশের মানুষের মনে জায়গা করে নেয়। দক্ষিণ কোরিয়ার কে-পপ, ভারতের বলিউড কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের হলিউড এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও লোকগান দেশের পরিচয়কে বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর ভিডিওতে ‘মহা জাদু’র ব্যবহার সেই সম্ভাবনারই একটি ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। আসলে মানুষ অনেক সময় কোনো দেশের রাজনীতি বা অর্থনীতি সম্পর্কে যতটা না জানে, তার চেয়ে বেশি জানে সেই দেশের গান, সিনেমা বা শিল্পীদের মাধ্যমে। ফলে তা দেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও পরিচয়েরও প্রতিনিধি হয়ে ওঠে।
একজন খোয়াজ মিয়া
‘মহা জাদু’ গানের গীতিকার বাউল খোয়াজ মিয়া গত বছরের ২৬ জুন প্রয়াত হয়েছেন। ১৯৪২ সালে সিলেটে জন্ম নেওয়া এই মরমি সাধক ছিলেন দুর্বিন শাহের শিষ্য। তাঁর গানে মানবতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, পারঘাটাতত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব, শিষ্যতত্ত্ব, সৃষ্টিতত্ত্ব, আত্মা-অন্বেষণ, প্রেম ও ভক্তিমূলক চেতনার প্রকাশ দেখা যায়। তিনি বাংলাদেশের বিখ্যাত মরমি সাধক দুর্বিন শাহের শিষ্য। আর বায়াত গ্রহণ করেছিলেন ছাবাল শাহের।
ছোটবেলা থেকেই খোয়াজ মিয়া গান গেয়ে ঘুরে বেড়াতেন শখের বশে। একসময় এই শখ নেশায় পরিণত হয়। সিলেট অঞ্চলের বাউলদের ভাব-বাণী তাঁর ভেতরে তোলপাড় করতে থাকে। তবে নিজের এলাকায় গান গাইতে পারতেন না। কারণ, বাবা গানবাজনা পছন্দ করতেন না। তাই যৌবনকালে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে আশপাশের গ্রামে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মহাজনি, মালজোড়া গান গাইতে থাকেন।
১৯৬২ সালের কথা, খোয়াজ মিয়ার বয়স তখন মাত্র ২২ বছর। বাড়ির কাউকে না জানিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়েন গুরুর খোঁজে। গানের প্রতি আকর্ষণ তাঁকে টেনে নিয়ে যায় দুর্বিন শাহর দুয়ারে। শুরু হয় গুরুর দেখানো পথে নতুন জীবন। তবে পরিবারের চাপে পড়ে ২৫ বছর বয়সে বিয়ে করতে হয়। মূলত গানের উন্মাদনা থেকে তাঁকে সংসারমুখী করতেই পরিবারের এই সিদ্ধান্ত। কিন্তু সংসারের বন্ধন তাঁর গানকে থামাতে পারেনি। খোয়াজ মিয়া সংগীতচর্চা চালিয়ে গেছেন।
প্রথম সন্তান জন্মের কিছুদিন পর খোয়াজ মিয়ার স্ত্রী মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ঘটে বিবাহবিচ্ছেদ। গানপাগল উদাস খোয়াজ মিয়া সেই সন্তানের প্রতি ঠিকঠাক দায়িত্ব পালন করতে পারেননি তখন। সংসারে মন বসাতে আবার তাঁকে বিয়ে করানো হয়। সংসারে কিছুটা মন বসলেও গানবাজনা চালিয়ে যেতে থাকেন তিনি। পাঁচ সন্তান জন্মের পর মারা যান বাউল খোয়াজের দ্বিতীয় স্ত্রীও। এবারে সংসারের দায়িত্ব ও জীবিকানির্বাহের জন্য গানচর্চার ফাঁকেই বিভিন্ন কাজ করতে হয় তাঁকে। এরপর তৃতীয় স্ত্রীর সঙ্গে শেষ জীবন পর্যন্ত সংসার বেঁধেছিলেন তিনি। জীবনে নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়েছেন, কিন্তু গান লেখা-গাওয়া থেমে যায়নি খোয়াজ মিয়ার।

২০২৪ সালের এপ্রিলে খোয়াজ মিয়ার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপে জেনেছিলাম, দীর্ঘ সংগীত জীবনে তিনি প্রায় হাজারখানেক গান লিখেছেন। কয়েকটি বইও প্রকাশিত হয়েছে। ওই সাক্ষাৎকারে ‘মহা জাদু’ গানের প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘গানটা লেখা হয়েছে ১৯৬৮ সালের দিকে। তখন আমি আত্ম-অনুসন্ধান করছিলাম।’ তাঁর জনপ্রিয় গানের তালিকায় রয়েছে ‘যাইও না যাইও না কন্যা গো’, ‘দূর দেশে না যাইও বন্ধু রে’, ‘তুমি কই রইলায় রে প্রাণনাথ’, ‘বৃন্দাবনে শ্যাম’ ও ‘আল্লাহ তুমি দয়াময়’-এর মতো কালজয়ী সব গান।
খোয়াজ মিয়ার জীবন, গান ও দর্শন নিয়ে বই লিখেছেন সৈয়দা আঁখি হক। তাঁর মতে খোয়াজ মিয়ার গানের মূল সুর হলো আধ্যাত্মবাদ। মহা জাদু গানটি সাধারণ প্রেমের গান মনে হলেও, এর গূঢ় অর্থ আসলে আধ্যাত্মিক। খোয়াজ মিয়া তাঁর মুর্শিদের প্রেমে ছিলেন পাগল। গানে যে ‘বন্ধু’ বা ‘প্রেমিকার’ কথা বলা হয়েছে, তা মূলত তাঁর মুর্শিদ ও স্রষ্টার প্রতি নিবেদন। মুর্শিদই সেই জাদুকর, যিনি অদৃশ্য সুতোর টানে ভক্তের আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করেন।
শিল্পের কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই
একজন কম আলোচিত বাউল গীতিকারের গান কীভাবে গ্রামবাংলা থেকে উঠে এসে দুই দেশের সম্পর্কের আবহে স্থান করে নেয়, সেটি সত্যিই বিস্ময়কর। অনেক সময় রাজনীতি ও কূটনীতির আনুষ্ঠানিক ভাষার বাইরে সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে। ‘মহা জাদু’ গানটির ঘটনাও যেন সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এই গানটি কেন বেছে নিয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট উত্তর হয়তো জানা যাবে না। তবে এটুকু বলা যায়, গানটি ভিডিওতে একটি বিশেষ আবহ তৈরি করেছে। প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের এই সময়ে একটি লোকগান ইউটিউব, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যেতে পারে। ‘মহা জাদু’র এই যাত্রা সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ।
এ ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি গান তাঁর স্রষ্টার জীবনকাল অতিক্রম করে বহু দূরে পৌঁছে যেতে পারে। খোয়াজ মিয়া হয়তো কখনো ভাবেননি, তাঁর লেখা গান একদিন দুই দেশের রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের আলোচনায় উঠে আসবে। কিন্তু সেটিই ঘটেছে। এভাবেই সংস্কৃতি সীমান্ত পেরিয়ে বিভিন্নভাবে অন্য দেশের মানুষের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তোলে, আর এক সাধকের সৃষ্টি ছড়িয়ে পড়ে ‘মহা জাদু’র মতো।