Image description

হানিফ রাশেদীন

বাংলাদেশের রাজনীতিতে চীন গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশীদার। অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে বেইজিংয়ের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগত প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের ভূ-অবস্থানও নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক এখন শুধু দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।

স্বাধীনতার পর নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক বর্তমান অবস্থানে পৌঁছেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় চীনের অবস্থান এবং স্বাধীনতার পর দূরত্ব সত্ত্বেও দুই দেশ ধীরে ধীরে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

এই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে রয়েছে বিএনপির ভূমিকা। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন গতি পায়। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময় সেই সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হয়। রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের পাশাপাশি চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি ও বিএনপির মধ্যেও নিয়মিত যোগাযোগ গড়ে ওঠে।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রথম চীন সফর নতুন করে আলোচনায় এনেছে এই সম্পর্কের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। কেবল আনুষ্ঠানিক সৌজন্য এই সফর, না বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা—সেই প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে আলোচিত।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের গুরুত্ব কেবল দ্বিপক্ষীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার, আঞ্চলিক কৌশলগত ভারসাম্য এবং চীনের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার দিকনির্দেশনাও প্রতিফলিত হতে পারে।

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক

১৯৭২: জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের প্রচেষ্টায় চীন ভেটো দেয়।

১৯৭৫: বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় চীন।

১৯৭৬: দুই দেশের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৭৭-১৯৮১: জিয়াউর রহমানের আমলে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়তে শুরু করে।

১৯৯১-১৯৯৬: খালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারিত হয়।

২০০১-২০০৬: বিএনপির দ্বিতীয় মেয়াদে চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগীতে পরিণত হয়।

২০১৬: চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরে সম্পর্ক ‘কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বে’ উন্নীত হয়; একই বছর বাংলাদেশ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) যুক্ত হয়।

২০২৬: প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম চীন সফরে যান তারেক রহমান।

সম্পর্কের ভিত্তি নির্মাণে জিয়াউর রহমান

মুক্তিযুদ্ধের সময় চীন পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয়। স্বাধীনতার পরও বেইজিং দীর্ঘ সময় বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। ১৯৭২ সালে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের প্রচেষ্টায় চীন ভেটো দেয়। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক শুরু থেকেই জটিল ছিল।

তৎকালীন বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ ঘনিষ্ঠ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতের সঙ্গে। অন্যদিকে চীন ছিল পাকিস্তানের কৌশলগত মিত্র। ফলে দূরত্ব ছিল স্বাভাবিক।

১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। বাংলাদেশ বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ৩১ আগস্ট চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় এবং ১৯৭৬ সালে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সম্পর্ক নতুন গতি পায়। তিনি ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতিকে বাস্তব কূটনীতিতে রূপ দেন। তাঁর সময় বাংলাদেশ একদিকে পশ্চিমা বিশ্ব, যুক্তরাষ্ট্র ও মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতাও বাড়ায়।

সত্তরের দশকের শেষভাগে প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও প্রযুক্তি সহযোগিতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সামরিক আধুনিকীকরণে চীন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে ওঠে। পাশাপাশি কৃষি, শিল্প ও অবকাঠামো খাতেও সহযোগিতা বিস্তৃত হয়।

এই সময়েই দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগের ভিত্তি তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির দলীয় সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে দেয়।

খালেদা জিয়ার সময়ের বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক

১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর বিএনপি সরকার গঠন করলে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নতুন মাত্রা পায়।

নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের নীতি গ্রহণ করে। ফলে উন্নয়ন ও অবকাঠামো খাতে নতুন অংশীদার খোঁজে ঢাকা। এই প্রেক্ষাপটে চীন গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হয়ে ওঠে।

খালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদে (১৯৯১–১৯৯৬) বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। অবকাঠামো, জ্বালানি, যোগাযোগ ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বিস্তৃত হয়। প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও জোরদার হয়।

২০০১ সালে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় এলে সম্পর্ক আরও গভীর হয়। খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদে (২০০১–২০০৬) চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হয়।

এই সময়ে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ ও শিল্প খাতে চীনা বিনিয়োগ বাড়ে। সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় ও প্রশিক্ষণ সহযোগিতাও বিস্তৃত হয়।

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে দুই দেশের পারস্পরিক অবস্থানও কাছাকাছি আসে। রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের পাশাপাশি বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে নিয়মিত দলীয় যোগাযোগ গড়ে ওঠে।

পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারের অধীনে বাংলাদেশ–চীন সম্পর্ক ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। অবকাঠামো, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে চীনের সম্পৃক্ততা ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে।

বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এখন অর্থনীতি, বাণিজ্য, অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হলেও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশের ঘাটতি এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের জন্য চীনের গুরুত্ব বেড়েছে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং আঞ্চলিক সংযোগের কারণে। অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান চীনের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ।

গত এক দশকে অবকাঠামো, জ্বালানি ও যোগাযোগ খাতে দুই দেশের সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন এবং উৎপাদন খাতে চীনা বিনিয়োগের আগ্রহও বেড়েছে।

এ ছাড়া তিস্তা ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামো, শিল্প স্থানান্তর ও প্রযুক্তি খাতেও দুই দেশের সহযোগিতা ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে।

তারেক রহমানের সফর: ভবিষ্যতের সমীকরণ

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম চীন সফর কয়েকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এটি বিএনপির দীর্ঘদিনের চীন-নীতির ধারাবাহিকতার প্রতিফলন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন বিনিয়োগ, ঋণ ও উন্নয়ন সহযোগিতার সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে।

এ সফর আঞ্চলিক ভূরাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশ যে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে চায়, সফরটি সেই বার্তাও বহন করছে।

জিয়াউর রহমানের সময় যে সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল এবং খালেদা জিয়ার সময় যা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল; তারেক রহমানের এই সফর সেই সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতায় এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।

এখন দেখার বিষয়, এই সফর দুই দেশের সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন করতে পারে কিনা। একই সঙ্গে নজর থাকবে, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আগামী দশকে কোন নতুন উচ্চতায় পৌঁছায় এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন ও পররাষ্ট্রনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলে।