দারুল ফজল মার্কেট। ৯৮ জুবিলি রোড। রাস্তা ও ফুটপাতের ভাসমান হকার ঠেলে ভবনের নিচতলার চলাচলের রাস্তায় পা রাখতেই চোখে পড়ল কয়েকজন পুলিশ। ভবনের দোতলায় নগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়। তাই এই পাহারা। অফিস পাহারা নয়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির কার্যালয়ে কেউ যাতে ঢুকতে কিংবা মিছিল করতে না পারে তার জন্য সতর্কতা।
আজ মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এ উপলক্ষে ঝটিকা মিছিল, সভা সমাবেশ করার সম্ভবনা ছিল দলটির। এ জন্য সারা দেশে ছিল পুলিশি সতর্কতা। দুই দিন আগে দারুল ফজল মার্কেটের সামনে মিছিল করেছিল সিটি কলেজ ছাত্রলীগ। ওই আশঙ্কায় এমন পুলিশ মোতায়েন।
২০২৪ সালে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের কার্যালয়গুলোয় আর নেতাকর্মীদের পা পড়েনি। বরং এর মধ্যে বার বার আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে তিন কার্যালয়। এর মধ্যে নগর আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ভাঙচুর অগ্নিসংযোগ হয় দুই দফা। চট্টগ্রাম জেলাকে রাজনৈতিক দলগুলো তিনটি সাংগঠনিক ভাগে ভাগ করে নাম দিয়েছে-উত্তর, নগর ও দক্ষিণ।
দারুল ফজল মার্কেটের কয়েকশ গজ দূরে দোস্ত বিল্ডিংয়ে অবস্থিত উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় দখল হয়ে যায়। আর নগরের টেরিবাজার মোড়ে দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় পুড়িয়ে দেওয়া হয়। জায়গাটি এখন টিন দিয়ে ঘেরাও করে রাখা হয়েছে।
দারুল ফজল মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় দেখা যায় নগর কার্যালয়ের একটি দরজা ভাঙা। সেটিতে বাইরে থেকে কাঠের বাটাম মেরে দেওয়া। অপর দরজাটিতে ঝুলছে তালা। তাতে ধরেছে মরিচা। ভাঙা কাচে উঁকি দিয়ে ভেতরে দেখা যায়, কয়েকটি চেয়ার। তাতে ধুলোর আস্তরণ। অথচ একসময় প্রতিদিন সরগরম থাকত এই কার্যালয়।
কার্যালয়ের সামনে থাকা নগর আওয়ামী লীগ লেখা ছিল। সেটি মুছে দেওয়া হয়েছে। সামনের বারান্দাটি দখল করে নিয়েছে প্লাস্টিকের জিনিসপত্র। এই কার্যালয় লাগোয়া বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ইউনিটের অফিস। সেখান থেকে বের হলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি উত্তর জেলা ইউনিটের আহ্বায়ক এ এইচ এম জিলানী চৌধুরী।
জিলানী বেশি কিছু বলতে নারাজ। শুধু জানালেন, ‘পট পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের পাশাপাশি আমাদের অফিসও আক্রান্ত হয়। ভাঙচুর হয়। পরে আমরা খুলে বসেছি।’
পাশে থাকা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ চট্টগ্রাম নগরের কার্যালয়টির দেখভাল করেন মোহাম্মদ হারুন। তিনি জানালেন, ‘আওয়ামী লীগের পাশাপাশি দুটি মুক্তিযোদ্ধা সংসদের অফিস ভাঙচুর করে। আওয়ামী লীগের অফিসে বেশি ভাঙচুর হয়। আগুন দেওয়া হয়।’
দারুল ফজল মার্কেট থেকে কয়েকশ গজ দূরত্বে নিউমার্কেটের পাশে দোস্ত বিল্ডিং। এই ভবনের চতুর্থ তলায় উত্তর জেলা কমিটির অফিস। পট পরিবর্তনের পর গত বছরের ২১ অক্টোবর রাতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কয়েকজন কার্যালয়টি দখল করেন। পরে তারা কার্যালয়ের দেওয়ালে লিখে দেয় ‘জুলাই ৩৬’।
এ বছরের ১৬ এপ্রিল শওকতুল আনাম ও কাজী সবুজ নামে দুই যুবলীগ কর্মী উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের ব্যানার টানিয়ে কার্যালয় দখলমুক্ত করার ঘোষণা দেন। ফেসবুকে এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে পুনরায় এনসিপি নেতারা যান সেখানে। পরে লীগের ব্যানার তুলে ফেলেন।
আজ দুপুরে দেখা যায়, কার্যালয়ে একটি তালা ঝুলছে। পাশে জানালার কপাটে লেখা জুলাই ৩৬। এ ছাড়া কক্ষটির দেয়ালে লেখা, ‘জেলা প্রশাসন চট্টগ্রাম কর্তৃক প্রদত্ত রেজিস্ট্রিকৃত ২০ নম্বর সাফ বিক্রয় কবলা দলিল মূলে এই কক্ষের মালিক কাজী নাজমুল হুদা ও আইনুল হুদা গং।’ ওখানে দেওয়া ফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে কেউ ফোন ধরেননি।
দোস্ত বিল্ডিং থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরত্বে টেরিবাজার মোড়। ওখানে একটি টিনের ঘরে ছিল দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়। কার্যালয়টি এখন নেই। শুধু খালি ভিটে পড়ে রয়েছে।
২০২৪ সালের ৬ আগস্ট এখানে আগুন দিয়ে ভাঙচুর করা হয়। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় পুরোপুরি। একটি টিনও নেই। পাশে আল্লার দান ভাতের হোটেল। ওখানকার কর্মী মোবারক জানালেন, প্রায় দুই বছর আগে ভেঙে টিন লুট করে নিয়ে যায়। এরপর জায়গাটির বাইরে টিনের একটি ঘেরাও দিয়ে রাখা হয়।
একসময় আওয়ামী লীগের এই তিনটি কার্যালয় কর্মব্যস্ত দিন পার করত। ছিল নেতাকর্মীদের আনাগোনা। সভা, বৈঠক আরও কত কি। এখন সুনসান নীরবতা।