বিদ্যা কৃষ্ণন
ভারতে গত কয়েক সপ্তাহে মোদি সরকারের চরম নিরাপত্তাহীনতা প্রকট হয়ে উঠেছে। এর বলি হয়েছেন একদল কলেজ শিক্ষার্থী। তারা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক প্যারোডি অ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন। সরকার তাদের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দিয়েছে।
এই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি গড়ে ওঠার পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট আছে। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত সম্প্রতি বেকার তরুণদের নিয়ে একটি মন্তব্য করেছেন। তিনি কর্মহীন তরুণদের ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করেন। মূলত তার এই মন্তব্যের প্রতিবাদেই শিক্ষার্থীরা রসিকতা করে এই পেজটি খোলেন।
নির্দোষ এই রসিকতা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ইনস্টাগ্রাম ও এক্সে সিজেপির অনুসারী সংখ্যা লাখ লাখ ছাড়িয়ে যায়। বিবিসি, সিএনএন, দ্য গার্ডিয়ান ও ফ্রান্স ২৪-এর মতো বিশ্ব গণমাধ্যমে এটি নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এতেই টনক নড়ে ভারতের বয়োবৃদ্ধ সরকারের।
তবে আন্দোলন চরমে পৌঁছালেও ক্ষুব্ধ তরুণদের সঙ্গে মোদির সরকার কোনো অর্থবহ আলোচনায় বসেনি। উল্টো মোদি প্রশাসন বিষয়টিকে ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ ও ‘ভারতের সার্বভৌমত্বের’ জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছে। বর্তমানে ভারতে এই পেজটি আর দেখা যাচ্ছে না।
বিদ্রূপাত্মক এই অ্যাকাউন্টটি মুছে ফেলতে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। এর ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রীরা অভিযোগ তুলেছেন, এই অ্যাকাউন্টের প্রতিষ্ঠাতা ‘বিদেশি শক্তির’ প্রভাবে কাজ করছেন। এমনকি এই অ্যাকাউন্টের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদনও করা হয়েছে।
একটি সাধারণ অনলাইন অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে সরকারের এই প্রচণ্ড ক্ষোভ প্রকাশের ধরনটি অনেকটা মশা মারতে কামান দাগার মতো একটি ঘটনা।
শিক্ষার্থীদের এই রসিকতার আড়ালে আসলে ভারতের তরুণ প্রজন্মের হাহাকার লুকিয়ে আছে। তারা এমন এক শ্রমবাজারে ঢুকছেন যেখানে চাকরি নেই। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে তীব্র দাবদাহ আর দূষিত বায়ু। অথচ সরকার তাদের ত্যাগের মহিমা নিয়ে প্রতিনিয়ত উপদেশ দিয়ে যাচ্ছে।
গত মাসেই মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষার (নিট) প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। স্কুল শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফলাফল নিয়েও জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। অথচ ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ জানালে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল দূরদর্শন তাদের ‘পাকিস্তানি’ বলে গালি দিচ্ছে।
ভারত এখন এমন এক দেশে পরিণত হয়েছে, যেখানে সন্তানেরা উদ্বেগের কথা জানালে তাদের ‘দেশদ্রোহী’ সাজানো হয়। পরীক্ষা নিয়ে এসব কেলেঙ্কারির জেরে অনেক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাদের জন্য একটি সান্ত্বনার বাণীও দেননি।
মোদির এই উদাসীনতা সবখানেই স্পষ্ট। তার সহমর্মিতা যেন ভৌগোলিক দূরত্বের ওপর নির্ভর করে। আর্তমানবতার প্রতি তার দরদ ভারত সীমান্ত থেকে যত দূরে, তত বেশি বাড়ে।
ভারতে তীব্র দাবদাহে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তেলেঙ্গানায় একদিনেই মারা গেছেন ৬৭ জন। প্রধানমন্ত্রী এই মৃত্যু নিয়ে কোনো কথা বলেননি। অথচ চীনের শানসি প্রদেশে এক খনি দুর্ঘটনায় প্রাণহানিতে তিনি ঠিকই শোক প্রকাশ করেছেন।
নরেন্দ্র মোদি ভারতকে একজন কঠোর শাসকের মতো শাসন করছেন। এখানে তার প্রতিটি নির্দেশই যেন নাগরিকের আনুগত্যের পরীক্ষা। তার সাম্প্রতিক ফরমানগুলো হলো— বাসা থেকে কাজ করুন, জ্বালানি সাশ্রয় করুন এবং বিদেশ ভ্রমণ এড়িয়ে চলুন। তিনি রান্নার তেল ও সোনার ব্যবহার কমানোর পরামর্শ দিচ্ছেন। জনগণকে বলছেন বেশি খাটতে এবং কম ভোগ করতে।
বর্তমান ভারতে আপনার যদি একটি চাকরি, একটি ফ্রিজ কিংবা এসি থাকে, তবে মোদি প্রশাসন আপনাকে ‘বিলাসিতায় মগ্ন’ বলে গণ্য করছে। জনগণের প্রতি তার উপদেশ হলো— পেটে খিদে রেখে কোমরের বেল্ট শক্ত করে বাঁধুন। অথচ এই কৃচ্ছ্রসাধনের নসিহত দিয়েই তিনি নিজে ইউরোপ ভ্রমণে উড়াল দিলেন। তার এই দ্বিচারিতা মানুষকে ভীষণভাবে বিদ্ধ করছে।
ইউরোপ সফরে গিয়েও মোদি সেখানকার মুক্ত সংবাদমাধ্যমকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছেন। তবে নরওয়েতে হেল লিং সেভেন্ডসেন নামের এক সাংবাদিক তাকে একটি সাহসী প্রশ্ন করে বসেন। তিনি মোদির কাছে জানতে চান, কেন তিনি বিশ্বের ‘সবচেয়ে মুক্ত সংবাদমাধ্যমের’ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে ভয় পান?
মোদি সেই সাংবাদিকের চোখের দিকে তাকাতে পারেননি। তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে চলে যান। ভারত থেকে এই দৃশ্য দেখা ছিল এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা।
দীর্ঘ ১৩ বছর পর কেউ মোদিকে সশরীরে প্রশ্ন করছেন— এটি ভারতীয়দের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে। মনে হয়েছে, দীর্ঘ সময় পর এমন এক মানুষের দেখা মিলল, যিনি পানির নিচে শ্বাস নিতে জানেন। দৃশ্যটি যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি ভারতীয়দের জন্য অপমানেরও। উল্লেখ্য, বিশ্ব গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে নরওয়ের অবস্থান এক নম্বরে এবং ভারতের অবস্থান ১৫৭তম।
এই ঘটনার পর ওসলোতে ভারতীয় দূতাবাস ক্ষোভ মেটাতে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সেখানে কূটনীতিক সিবি জর্জ ১৩ মিনিট ধরে রাগান্বিতভাবে কথা বলেন। ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে করা প্রশ্নের কোনো জুতসই উত্তর তিনি দিতে পারেননি। এ সময় তিনি ‘১৪০ কোটি মানুষ’, ‘৫ হাজার বছরের সভ্যতা’, ‘যোগব্যায়াম’ এবং ‘গান্ধী’র মতো কিছু গৎবাঁধা বুলি আওড়ান।
শেষ পর্যন্ত সাংবাদিক সেভেন্ডসেনকেও ভারতীয় সাংবাদিকদের তেতো বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাকে ‘বিদেশি গুপ্তচর’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়। ভারতের কট্টরপন্থী অনলাইন ট্রল বাহিনী তার ব্যক্তিগত তথ্য, ঠিকানা ও ফোন নম্বর ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত তাকে ইনস্টাগ্রাম থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মুক্ত চিন্তার মুখোমুখি হলে মোদি সরকার খেই হারিয়ে ফেলে। সেটা অনলাইনে শিক্ষার্থীদের ‘সিজেপি’ পেজই হোক বা নরওয়ের মুক্ত সংবাদমাধ্যম—সবক্ষেত্রেই মোদি প্রশাসন ও তার ট্রল বাহিনী এক ধরণের অস্তিত্বসংকটে ভোগে। তখন তাদের আচরণ অনেকটা চকোলেটের জন্য বায়না ধরা অবুঝ শিশুর মতো হয়ে যায়। তারা তখন কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে সবার ওপর চড়াও হয়।
তরুণদের সাধারণ প্রশ্ন বা সামান্য রসিকতায় এত আতঙ্কিত হওয়ার বিষয়টি আসলে প্রশ্নকর্তার চেয়ে সরকারের দুর্বলতাই বেশি প্রকাশ করে। সত্য হলো, সরকারের বিশাল প্রচারযন্ত্র দিয়ে মোদির যে উজ্জ্বল ভাবমূর্তি তৈরি করা হয়েছিল, তা এখন বিশ্ব পরিস্থিতির চাপে ফিকে হয়ে গেছে।
যুদ্ধ, মুদ্রাস্ফীতি আর যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতি ও শুল্ক আরোপের মুখে মোদির প্রশাসনিক অযোগ্যতা এখন আর অজানা থাকছে না। এসব কারণে তিনি দিন দিন আরও বেশি অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছেন।
গত কয়েক বছর ছিল ভারতের জন্য এক চরম শোক ও বিষাদের সময়। মোদি সরকারের ভুল নীতিগুলো দেশের বুকে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। নোট বাতিল, কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা (৩৭০ অনুচ্ছেদ) বিলোপ কিংবা কোভিডের অব্যবস্থাপনা ছিল তার সরকারের বড় বড় ব্যর্থতা।
তবে প্রতিদিনের ছোট ছোট ব্যর্থতাগুলোই সাধারণ মানুষকে বেশি ব্যথিত করছে। কোথাও সেতু ভেঙে পড়ছে, কোথাও তীব্র পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। আবার কোথাও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে চলে যাচ্ছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করতে এই সরকার কতটা ব্যর্থ। বিপুল অর্থ খরচ করে প্রচারণা চালিয়েও মানুষের এই চরম হতাশা এখন আর ঢেকে রাখা যাচ্ছে না।
একটি জাতির টিকে থাকার জন্য ন্যূনতম সমৃদ্ধি, আশা ও ভবিষ্যতের প্রতি আস্থা প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে ভারতে এমন পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে যে প্রধানমন্ত্রীর কথায় কেউ ভরসা পাচ্ছেন না। তিনি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি অজনপ্রিয়।
মূলত কোনো জনমত ছাড়া তিনি এখন সরকার চালাচ্ছেন। গত দুটি নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে বিরোধী দল, সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীরা প্রশ্ন তুলেছেন। ভারতকে এখন একটি ‘নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
বিজেপি এখন কেবল ভোট জেতার যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। দেশ চালানোর মতো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক দক্ষতা তাদের নেই। সাংবাদিকদের প্রতিটি প্রশ্ন, সাধারণ মানুষের প্রতিটি মিম বা টুইট এখন মোদির বিশাল অহমিকার বেলুনকে ফুটো করে দিচ্ছে।
এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মোদি এবং সিবি জর্জের মতো আমলারা এখন অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছেন। অবস্থা এতটাই খারাপ যে, সরকারের অন্ধ অনুগত সংবাদমাধ্যমগুলোও এখন আর কায়দা করে মোদিকে ‘সফল শাসক’ হিসেবে তুলে ধরতে পারছে না।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ সব সময়ই মানুষের মনের ক্ষোভ প্রশমনের একটি উপায় হিসেবে কাজ করে। ভারতীয় তরুণদের দুঃখ-দুর্দশার কথা চেপে রেখে তাদের অসন্তোষ দূর করা যাবে না।
বরং এতে তাদের মধ্যে উগ্রতা বা চরমপন্থা দানা বাঁধতে পারে। সরকারের আতঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। দক্ষিণ এশিয়ার দিকে তাকালে দেখা যায়, বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের (জেন-জি) আন্দোলনের মুখে অনেক ক্ষমতাধর সরকারের পতন হয়েছে। সেসব আন্দোলনের শুরুটা কিন্তু এই ‘সিজেপি’র মতোই খুব সাধারণ ও নিরীহ ছিল।
এই চরম দুরবস্থার মধ্যেও একমাত্র আনন্দের সংবাদ হলো— মোদির সাফল্যের মোহ এখন কেটে গেছে। হাজারো প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ‘সিজেপি’ এখনো টিকে আছে। সেই সঙ্গে অন্যান্য ভিন্নমতও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। গত দুই মেয়াদে সাফল্যের যে রঙিন বেলুন উড়েছিল, এবার পরিস্থিতি তার উল্টো।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি সম্ভবত মোদির শেষ মেয়াদ এবং শুরুতেই তিনি নজিরবিহীন চাপের মুখে পড়েছেন। একদিন হয়তো এই সরকারের পতন ঘটবে। কিন্তু ভারতের এই ‘তেলাপোকারা’ অর্থাৎ লড়াকু তরুণেরা ঠিকই টিকে থাকবে।
লেখক পরিচিতি: বিদ্যা কৃষ্ণন একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক। তিনি মূলত সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে লেখালেখি করেন। ২০২১ সালে তার প্রথম বই ‘ফ্যান্টম প্লেগ’ প্রকাশিত হয়েছে।