Image description

সুলতানা স্বাতী

২০০৩-০৪ সালের দিকে আমি একবার আখাউড়া গিয়েছিলাম বান্ধবী তানিয়ার সঙ্গে, ওদের বাড়িতে। তখনই প্রথম কাছ থেকে দেখি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এবং সেই বহুল আলোচিত কাঁটাতারের বেড়া। মোটা, শক্ত তার—এমনভাবে ডাবল-লেয়ার করে বসানো, মনে হয়েছিল কুকুর বিড়ালেরও সাধ্য নাই বেড়ার ফাঁকফোকর দিয়ে যাতায়াত করার।

এরপর ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছেলেকে দার্জিলিংয়ের একটি স্কুলে ভর্তি করাই। ওই বছর প্রায় প্রতি মাসেই আমরা ছেলের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছি। বেশিরভাগ সময় আমরা গেছি বুড়িমারী-চ্যাংড়াবান্দা সীমান্ত দিয়ে; কখনও বাসে, কখনও মিতালি এক্সপ্রেস ট্রেনে। এখন অবশ্য ট্রেন চলাচল একেবারেই বন্ধ!

এই যাতায়াতের সময় সীমান্তকে নতুন করে দেখতে শিখলাম। কাঁটাতারের বেড়া আগের মতোই আছে, কিন্তু তার আশপাশের জীবন যেন অন্য রকম। বিশেষ করে বুড়িমারী সীমান্ত পার হওয়ার সময় প্রায়ই চোখে পড়তো একটি দৃশ্য—কাঁটাতারের দুই পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন দুজন মানুষ। কখনও দুই নারী, কখনও দুই পুরুষ। খুব কাছাকাছি নয়, আবার খুব দূরেও নয়। ইমিগ্রেশনের সময় চোখে পড়তো! অবশ্যই তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে কথা বলতেন না। হয়তো দুই-তিন মিনিট। কিন্তু দৃশ্যটা অদ্ভুতভাবে ভালো লাগতো। মনে প্রশ্ন জাগতো—তারা কি আত্মীয়? নাকি পাশের মাঠে কাজ করতে গিয়ে পরিচয়? কী নিয়ে কথা বলেন তারা? সংসারের খবর, অসুখ-বিসুখ, নাকি শুধুই সৌজন্য?

এরপর বহুবার সীমান্ত পারাপারে দুই দেশের মানুষকে কাছ থেকে দেখেছি, কথা বলেছি। এ দেশের মানুষ যে শুধু ভ্রমণ, চিকিৎসা আর পড়াশোনার জন্যই ওই দেশে যায় তা কিন্তু নয়। এখনও দুই দেশের সম্পূর্ণ অচেনা দুটি পরিবারের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হয়! এত অবাক হয়েছিলাম জেনে।

একবার দেখলাম এ দেশের এক তরুণী যাচ্ছেন তার শ্বশুরবাড়ি জলপাইগুড়িতে। সেখান থেকে তিনি যাবেন ফ্রান্সে, স্বামীর কাছে। মেয়ের বাড়ি নারায়ণগঞ্জ। দুই পরিবারের যোগাযোগটা কীভাবে হলো? ঘটকের মাধ্যমে? নাকি পূর্বের কোনও আত্মীয়তা? প্রশ্ন করার ইচ্ছে ছিল। অনধিকার চর্চার ভয়ে করিনি।

আরেকবার ট্রেনে দেখেছিলাম শিলিগুড়ির একটি পরিবার—ছেলে, মেয়ে, শ্বশুর-শাশুড়ি, আত্মীয়স্বজন—সবাই মিলে যাচ্ছে কক্সবাজারে ঘুরতে। বাংলাদেশে তাদের কোনও আত্মীয় নেই। পরিবারটিকে খুব সচ্ছল বলেও মনে হয়নি। তবু তারা এসেছে শুধু গল্প শুনে, ভিডিও দেখে। কৌতূহল আর আকর্ষণ—এসব কোনও সীমান্ত মানে না।

এই মাসেও দেখলাম, দুই দম্পতি আমাদের সঙ্গেই সীমান্ত পার হলেন। যাচ্ছেন টাঙ্গাইলের মধুপুরে। আত্মীয়ের বিয়েতে! চ্যাংড়াবান্দা সীমান্তে কড়াকড়ি, বারবার ব্যাগ চেকিং হচ্ছে। তাদের জিজ্ঞেস করা হচ্ছে—কেন এতগুলো শাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন?

এগুলো কি গোল্ড নাকি সিটি গোল্ড? তারা তো অবাক—বিয়েতে যাচ্ছি, শাড়ি পরবো না? গহনা-গায়ে সাজবো না? আর এত বছর পর যাচ্ছি সবার জন্য না হলেও বয়স্কদের জন্য তো কিছু উপহার নিতে হয়!

এই প্রশ্নগুলো সাধারণ, কিন্তু সীমান্তে দাঁড়ালে সাধারণ জিনিসও জটিল হয়ে যায়। তাই পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যতই সীমান্তে কাঁটাতারের দিতে চান না কেন, সেই বেড়া যতই শক্তিশালী হোক, তিনি কি এই আত্মীয়তার সম্পর্কে, এই মনের টানে বেড়া দিতে পারবেন?

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রায় ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে, যা বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এর বড় অংশে অর্থাৎ প্রায় ৩,২৪০ কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হয়েছে; তবে নদী, চরাঞ্চল, জলাভূমি ও দুর্গম এলাকায় এখনও অনেক অংশে বেড়া দেওয়া সম্ভব হয়নি। এসব স্থানে নজরদারি চলে টহল, ফ্লাডলাইট ও অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে।

সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পেছনে মূল যুক্তি নিরাপত্তা—অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান ও মানবপাচার ঠেকানো। তবে ভারত এখন অনুপ্রবেশকেই বড় করে দেখছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠনের পর, অনুপ্রবেশ ইস্যুকে জোরালোভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। এর জেরেই সীমান্তে আরও কঠোরতার কথা বলা হচ্ছে।

তবে এর পাশাপাশি আরেকটি বাস্তবতাও আছে। সীমান্তের দুই পাশে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে ভাষা, সংস্কৃতি, এমনকি পারিবারিক সম্পর্কেরও গভীর যোগসূত্র রয়েছে। এই সম্পর্কগুলো কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা যায় না।

সাম্প্রতিক সময়ে ‘পুশইন’ ও ‘পুশব্যাক’ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা বেড়েছে। অভিযোগ আছে, প্রতি বছর ভারত তাদের কিছু গুরুত্বহীন নাগরিককে আমাদের দেশে পাঠিয়ে দেয়। ভারত মনে করে, আমাদের দেশ থেকে অবৈধভাবে কিছু লোক সেদেশে গিয়ে বসবাস করছে। কাজেই তাদের ঠেলে আমাদের এখানে পাঠায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ।

বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিজিবি তা প্রতিরোধ করে তাদের আবার ওই দেশেই ফেরত পাঠায়। এই টানাপড়েনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় পড়ে সেই মানুষগুলো, যাদের পরিচয় ও অবস্থান দুই দেশের সীমারেখার মাঝখানে আটকে যায়।

সম্প্রতি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় দেখা গেছে, বিজিবির কঠোর প্রতিরোধের মুখে দেশের ৫টি সীমান্ত এলাকা দিয়ে পুশইনের চেষ্টা করা ৭২ জনকে বিএসএফ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই জানিয়েছেন, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের আওতায় পড়েন না—এমন ৪৮০০ জন কথিত অনুপ্রবেশকারীকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, আরও ৮৩৬ জন হোল্ডিং সেন্টারে রয়েছেন, যাদের সীমান্তের ওপারে ‘পুশব্যাক’ করবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এরপর থেকেই পুশইন ও পুশব্যাকের ঘটনা বেড়েছে। ফলে শূন্যরেখায় (নো-ম্যানস ল্যান্ড) এক অমানবিক ও চরম অনিশ্চিত জীবন কাটাতে হচ্ছে কিছু অসহায় নারী, শিশু আর বৃদ্ধকে। আকাশের নিচে তাঁদের কোনও আশ্রয় নেই, নেই কোনও খাবার কিংবা ন্যূনতম মানবিক সুবিধা। রাষ্ট্র কিংবা ক্ষমতার রাজনীতি এই প্রান্তিক মানুষদের কথা আসলে ভাবে না। কারণ এই মানুষগুলোর না আছে ক্ষমতা, না আছে কোনও সহায়-সম্বল।

ভারত মনে করে, আমাদের দেশের গরিব মানুষগুলো কাজের খোঁজে তাদের ওখানে যায় এবং থেকে যায়। কিন্তু কথা হচ্ছে, ভারতে কাজের মূল্য কি আমাদের দেশের চেয়েও বেশি। ভারতে বিভিন্ন রাজ্যের মানুষজনই একই রকম সুবিধা পায় না। সেখানে অন্যরা কীভাবে পাবে?

এছাড়া ভারতে জাতিগত ভিন্নতা এত বেশি যে সেখানে যে কারও গিয়ে টিকে থাকাটা বেশ মুশকিল। তবে এই পুশইন আর পুশব্যাকের সঙ্গে কিছু রাজনৈতিক ও মনস্তাত্বিক বিষয়ও জড়িত। হাসিনা সরকারের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল ভারতের। আবার ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ভারতেই আশ্রয় নেন। এর জেরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। তখন থেকেই সেদেশে অনুপ্রবেশকারীদের আটক করার ঘটনা বেড়ে যায়।

এছাড়া ভারত বড় দেশ, আর আমরা আয়তনে ছোট। ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় দেশগুলো সবসময়ই চায় ছোট প্রতিবেশীর ওপর নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে। আর সেই প্রভাব খাটানো যখন সম্ভব হয় না, তখন তারা পুশইন বা অন্য কোনও উপায়ে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপে রাখার চেষ্টা করে। কারণ প্রাকৃতিকভাবে ও ভৌগোলিকভাবে বেশ কিছু ক্ষেত্রে আমরা এখনও তাদের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে বহুল প্রতীক্ষিত তিস্তার পানিবণ্টন ও গঙ্গার পানিচুক্তিসহ বেশ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে দুদেশের মধ্যে আলোচনার প্রস্তুতি চলছে। তাই হয়তো ভারত কৌশলে এই পুশইনের তাস খেলে বাংলাদেশকে আলোচনার টেবিলে চাপে রাখতে চাচ্ছে।

লেখক: সাইকোলজিস্ট