Image description
 
জাকারিয়া নূরী

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকাকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতাপশালী কর্মকর্তা হয়ে উঠেছিলেন মো. খুরশীদ আলম। এই কর্মকর্তাকে নিজ বিভাগের মানুষ হিসেবে ব্যাংক লুটের বিশ্বস্ত সহচর হিসেবেই লুফে নেন চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম (এস আলম)। বাংলাদেশ ব্যাংকের দিক থেকে নানা অনিয়মের পথ বের করে সেই অনুযায়ী এস আলমকে চলার পরামর্শ দিতেন তিনি। এমনকি ব্যাংক ঋণ বাগিয়ে নিতে সকল কূটকৌশলও বাতলে দিতেন।

 

পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের সংবেদনশীল বিভাগ খ্যাত-ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ, ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগ, কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, অফসাইট সুপারভিশন বিভাগ এবং সচিব বিভাগে দায়িত্ব পালনের সুবাদে অর্জিত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এস আলমকে ঋণ অনিয়মে সহযোগিতার বিশেষ সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। বিশেষ করে ২০১৭ সালে এস আলমের ইসলামী ব্যাংকসহ ৭টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান জবরদখলের মাধ্যমে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে খুরশীদ আলমের পরামর্শ ছিল অন্যতম নিয়ামক। যার প্রতিদান হিসেবে খুরশীদ আলম ডেপুটি গভর্নর এবং সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবীরের সময় থেকেই সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন খুরশীদ আলম। তার মৌখিক নির্দেশেই চলত পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগের লোকদের জন্য ছিল বাড়তি অগ্রাধিকার। তার সিন্ডিকেটের বাইরে থাকা সব কর্মকর্তা ছিলেন কোণঠাসা। এই খুরশীদ আলম সিন্ডিকেট বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম অফিস এবং টার্গেটেড বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অঘোষিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করত।

 

মূলত এস আলমের ক্ষমতা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতার মধ্যে এক সেতুবন্ধন রচনা করেছিলেন এই খুরশীদ আলম। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে খুরশীদ আলম ডেপুটি গভর্নর হন। তবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে এস আলমের ব্যাংক লুটের সহচর এবং পরামর্শক থাকার দায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের আন্দোলনের মুখে তিনি ডেপুটি গভর্নর হিসেবে পদচ্যুত হন। তবে এই কর্মকর্তা যে নতুন করে অনিয়ম করেছেন তা নয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের রংপুর অফিসে চাকরিকালে অনিয়মের দায়ে শাস্তি হিসেবে তার ইনক্রিমেন্ট স্থগিত ছিল।

 

বাংলাদেশ ব্যাংক গত মঙ্গলবার জানায়, খুরশীদ আলমের স্ত্রী আফরোজা আক্তার ২০১৬ সালে এস আলমের মালিকানাধীন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে সাড়ে তিন কোটি টাকা ঋণ নেন। ঋণ দেওয়ার সময় ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন স্বয়ং এস আলম। তিনি খুরশীদ আলমের স্ত্রী আফরোজা আক্তারকে এই টাকা দেন সম্পূর্ণ ভুয়া ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে। যে ঋণ আজও শোধ করেননি আফরোজা আক্তার, যা সিআইবি প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে।

 

গত ২৪ মে খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তার নিয়োগ বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করছেন ব্যাংকটির গ্রাহকরা। এমন পরিস্থিতিতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ও এসআইবিএলের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এস আলমের ব্যাংক লুটপাটের পরামর্শক হিসেবে খুরশীদ আলমের ভূমিকা এবং তার প্রতিদান হিসেবে খুরশীদ আলমের স্ত্রীকে উপহার হিসেবে ঋণ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

 

এস আলম-খুরশীদ আলম ঘনিষ্ঠতা

২০১৬ সালে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন এস আলম। তখন থেকেই খুরশীদ আলমের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে তার। খুরশীদ আলম তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টের মহাব্যবস্থাপক (বর্তমান পরিচালক সমমান পদ)। ঘনিষ্ঠতার সূত্রে এস আলমকে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণের নামে লুটপাটের কলাকৌশল বাতলে দিতেন তিনি।

 

খুরশীদ আলমের বাড়ি চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায়। এস আলম স্বভাবজাতভাবেই চট্টগ্রামের পটিয়া তথা পুরো বিভাগের মানুষকে বাড়তি গুরুত্ব দেন। ইসলামী ব্যাংক দখলে নেওয়ার পর কোনো পরীক্ষা ছাড়াই প্রায় ৯ হাজার লোক নিয়োগ দেন তিনি। এই লোক নিয়োগেও খুরশীদ আলম পরামর্শ দিয়েছিলেন।

 

খুরশীদ আলমকে এস আলমের পুরস্কার

অনিয়মে সহযোগিতার প্রতিদান হিসেবে খুরশীদ আলমের স্ত্রীর নামে ভুয়া প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে সাড়ে তিন কোটি টাকার ঋণ উপহারের ব্যবস্থা করেন এস আলম। এ জন্য খুরশীদ আলমের স্ত্রী আফরোজা আক্তার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক জামাল মোল্লার স্ত্রী আলেয়া খানম চৌধুরীর নামে একটি ভুয়া কোম্পানি খোলা হয়। এই কোম্পানিতে তাদের শেয়ার যথাক্রমে ১৬ শতাংশ ও ২৬ শতাংশ। আলেয়া খানম চৌধুরী কোম্পানিটির চেয়ারম্যান ও আফরোজা আক্তার পরিচালক। এ ছাড়া কোম্পানিটিতে আরও তিনজন পরিচালক রয়েছেন, যারা তাদেরই আত্মীয়-স্বজন বলে একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। ‘এগ্রোক্রপ লিমিটেড’ নামের ওই কোম্পানির ঠিকানা দেখানো হয় ধানমন্ডিতে। তবে ধানমন্ডির ওই ঠিকানায় এগ্রোক্রপ লিমিটেড নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী বলছে, ২০১৬ সালে ‘এগ্রোক্রপ লিমিটেড’ নামের ওই কোম্পানিকে ৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ঋণ দেয় ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। ঋণ দেওয়ার সময় এস আলম নিজে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান থাকায় ঋণের একটি টাকাও আর শোধ করা হয়নি।

 

দুর্নীতির দায়ে শাস্তি হয়েছিল খুরশীদ আলমের

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের রংপুর অফিসে মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে খুরশীদ আলম কৌশলে ৫৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছিলেন। এ ঘটনায় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর ২০১৮ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ একটি অফিস আদেশ জারি করে। এর আগে ২০১৭ সালের ৩ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণের প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক স্টাফ রেগুলেশনস-২০০৩-এর ৪৪ (১) (বি) ধারা অনুযায়ী তার দুটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) বন্ধ করা হয়।

 

দীর্ঘ আট বছর পর ওই প্রমাণিত প্রতিবেদনকে ভুল দাবি করে অনৈতিকভাবে অবস্থান নিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান, যিনি সামনে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর পদের দৌড়ে এগিয়ে আছেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘সে সময় খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধে ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছিল। ফলে তাকে যে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল, তা যথাযথ ছিল না। এ কারণেই পরে তিনি নির্বাহী পরিচালক এবং ডেপুটি গভর্নর হিসেবে পদোন্নতি পান।’

 

তবে তার সহকর্মীদের মতে, আরিফ হোসেন খান চট্টগ্রামের বাসিন্দা এবং আওয়ামী লীগের সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম অফিসে কর্মরত ছিলেন বলেই এস আলমের ইসলামী ব্যাংকে মালিকানা ফিরে পাওয়া এবং খুরশীদ আলমের অপকর্মকে ঢাকতে মুখপাত্রের দায়িত্বের বাইরে আগ বাড়িয়ে কথা বলা শুরু করেছেন।

 

কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে খুরশীদ আলমের পদত্যাগ

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিক্ষোভ ও কর্মকর্তাদের চাপের মুখে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমসহ চারজন পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তাকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিন বছরের চুক্তিতে ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। কিন্তু ব্যাংক লুটেরা এস আলমের পরামর্শক এবং পতিত সরকারের দোসর হওয়ার দায়ে নিয়োগের মাত্র ৭ মাসের মাথায় তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

 

ইসলামী ব্যাংকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ

গত ২৪ মে খুরশীদ আলমকে দেশের সর্ববৃহৎ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেন বর্তমান গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তবে সেদিন ঈদের আগে ব্যাংকের শেষ কর্মদিবস হওয়ায় তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। কিন্তু ঈদের পর ব্যাংক খোলার পর খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণের দাবিতে আন্দোলন চলমান রেখেছেন গ্রাহকরা। অপরদিকে ব্যাংক থেকে টাকা অস্বাভাবিকভাবে তোলা হচ্ছে। কেউ কেউ ভালো ব্যাংকে টাকা স্থানান্তর করছেন। এ অবস্থা চলতে থাকলে ব্যাংকটির গ্রাহকরা বিপদে পড়ার শঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করা সত্ত্বেও এস আলমের ক্ষমতার জোরে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হন খুরশীদ আলম। আর খুরশীদ আলমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্র ধরেই বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হচ্ছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এস আলমকে ঋণ অনিয়মের পথ দেখিয়েছেন খুরশীদ আলম। পতিত সরকারের সময় ভুয়া প্রতিষ্ঠানের আড়ালে এস আলম ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নেন। সেখানে একজন ডেপুটি গভর্নরের স্ত্রীকে মাত্র ৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকার ঋণ ‘উপহার’ গণ্য করার ইস্যুর মধ্যেই পড়ে না।

 

ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরে দেশছাড়া হন। তার নিয়ন্ত্রণে থাকা সাতটি ব্যাংক এখন বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনা করছে। এসব ব্যাংক থেকে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি বের করে পাচার করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশে তার সম্পদ জব্দ হওয়া শুরু হয়েছে। এদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পদত্যাগ করতে হয় খুরশীদ আলমকে। আর জামাল মোল্লাকে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন খুরশীদ আলমকে আবার ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান করা হয়েছে।

 

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের থেকে জানা যায়, এস আলমের কাছে যখন কেউ ঘুষ দাবি করত, তখন তিনি তাদের ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা দিতেন। এ জন্য ব্যাংকগুলো তাদের নামে কোম্পানি তৈরি করে ঋণ সৃষ্টি করত। এ ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

 

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের বলেন, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ মালিক খুরশীদ আলমের স্ত্রী। ওই ঋণ পরবর্তী সময়ে খেলাপি হয়েছে। ফলে খুরশীদ আলমকে ঋণখেলাপি হিসেবে অভিহিত করা সঠিক নয়। তার স্ত্রীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ঋণ খেলাপি হলেও খুরশীদ আলম ব্যক্তিগতভাবে ঋণখেলাপি নন।

 

খুরশীদ আলম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে পরে এমবিএ করেন। ১৯৮৮ সালে সহকারী পরিচালক হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যোগ দেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক হওয়ার আগে ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ, ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ, কৃষি ঋণ বিভাগ, পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট, ডিপার্টমেন্ট অব কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট, ডিপার্টমেন্ট অব অফসাইট সুপারভিশন, এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্ট, সচিব বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুরে। এক মেয়ে ও এক ছেলের বাবা তিনি।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) এক তদন্ত প্রতিবেদনের মূল পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক এই ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে শিল্পগোষ্ঠীটি মূলত ঋণের টাকা ব্যবহার করেছে, যার বড় অংশই এসেছে খোদ ইসলামী ব্যাংক এবং গ্রুপটির আগে থেকে দখলে নেওয়া অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে। কাগুজে বা ভুয়া প্রতিষ্ঠানের (শেল কোম্পানি) নামে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়। এরপর সেই অর্থ দিয়ে ইসলামী ব্যাংকের ৭২ শতাংশ শেয়ার কিনে ব্যাংকের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। আর ২০১৭ সালে ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর এই পাইপলাইন বা অর্থপ্রবাহ উল্টো দিকে চলতে শুরু করে। অর্থাৎ, ব্যাংকের মালিকানা ব্যবহার করে গ্রুপটি আরও ব্যাপক ঋণ সুবিধা নিতে থাকে এবং পুরো আর্থিক ব্যবস্থায় নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে।

 

বিএফআইইউর প্রতিবেদনে যা বর্ণনা করা হয়েছে, তা কেবল একটি সাধারণ করপোরেট অধিগ্রহণ নয়। এটি ‘রেগুলেটরি ক্যাপচার’ বা নিয়ামক সংস্থাকে কবজা করার একটি ধ্রুপদী উদাহরণ। যেখানে একটি ব্যবসায়ী গ্রুপ ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিজস্ব মূলধন ব্যবহার করে একটি ব্যাংক কিনে নেয় এবং পরবর্তীতে সেই ব্যাংকটিকে তাদের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য বিস্তারের বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) তখন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল বা চোখ বন্ধ করে রেখেছিল।

 

বিএফআইইউর তদন্তে দেখা গেছে, ২০১৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে চট্টগ্রামভিত্তিক এই শিল্পগোষ্ঠী ২২ জন প্রক্সি (বেনামি) শেয়ারহোল্ডার এবং সন্দেহভাজন কিছু কাগুজে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ইসলামী ব্যাংকের ৭২ শতাংশ শেয়ার কুক্ষিগত করে। শেয়ার কেনার জন্য ব্যবহৃত অর্থের একটি বড় অংশ এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আনা হয়। এই অর্থ মূলত ইসলামী ব্যাংক থেকেই নেওয়া ঋণের মাধ্যমে জোগান দেওয়া হয়।

 

এ ছাড়া ব্যাংকের শেয়ার কেনা দুটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের এক লেনদেনে এস আলম গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠানের কোম্পানি সচিবের সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে বিএফআইইউ। এই সব তথ্যের ভিত্তিতে বিএফআইইউ সন্দেহ করছে যে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শেয়ার কেনার পেছনেও এস আলমের যোগসূত্র থাকতে পারে। এটি নিশ্চিত হলে, ব্যাংকটিতে গ্রুপটির প্রকৃত মালিকানা দাঁড়াবে প্রায় ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ। তাই এস আলমের এই সম্পৃক্ততার পূর্ণ চিত্র উন্মোচনে আরও ব্যাপক ও গভীর তদন্তের সুপারিশ করেছে বিএফআইইউ।

 

হাইকোর্টে জমা দেওয়া ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বিএফআইইউ জানিয়েছে, ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের শেয়ার কেনার সঙ্গে সম্পর্কিত নথিপত্র ও তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। এসব নথির মধ্যে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক (সাবেক এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক), ইউনিয়ন ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, মার্চেন্ট সিকিউরিটিজ, নিউ এরা সিকিউরিটিজসহ বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কোর ব্যাংকিং সিস্টেমে সংরক্ষিত জমা ও ঋণ হিসাবের রেকর্ড, ভাউচার, অনুমোদনের চিঠি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য।

 

বিএফআইইউর তথ্যমতে, তারা ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পর্ষদ সদস্যদের শেয়ার কেনার এই রেকর্ডগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী: ‘বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, ব্যাংকটির ৭২ দশমিক ০৭ শতাংশ শেয়ারই এস আলম গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।’

 

এদিকে ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপি গ্রাহক পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এরমধ্যে ১৫টি প্রতিষ্ঠানই এস আলম গ্রুপ ও গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় সাইফুল আলমের পাশাপাশি আছেন তার ছেলে আহসানুল আলম এবং জামাতা বেলাল আহমেদ। এ ছাড়া সাইফুল আলমের একাধিক ভাই এবং তাদের পরিবারের অন্য সদস্যরাও এসব কোম্পানির মালিকানায় রয়েছেন। ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসলামী ব্যাংক থেকে সবচেয়ে বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে এস আলম সুপার এডিবল অয়েলের নামে। বর্তমানে ব্যাংকটিতে এ প্রতিষ্ঠান খেলাপি ঋণেও শীর্ষে।

 

২০১৭ সালে ব্যাংকের শেয়ার কেনার সময় এই কোম্পানি থেকেও অর্থ গেছে। প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণ ১৩ হাজার ৪০ কোটি টাকা। এরপর এস আলম রিফাইন্ড সুগারের খেলাপি ঋণ ১০ হাজার ২৮১ কোটি টাকা, এস আলম ভেজিটেবল অয়েলের ১০ হাজার ১১৩ কোটি, সোনালী ট্রেডার্সের ৪ হাজার ৮৫৩ কোটি এবং এস আলমের মা চেমন আরার নামে করা কোম্পানি চেমন ইস্পাতের খেলাপি ঋণ ৩ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা। এই চারটি প্রতিষ্ঠানের তিনটি থেকেই শেয়ার ক্রয়ের সময় অর্থ গিয়েছে।

 

এ ছাড়া শীর্ষ ২০ খেলাপি গ্রাহকের মধ্যে আরও রয়েছে আহসানুল আলমের মালিকানাধীন ইনফিনিয়া সিআর স্ট্রিপস, যার খেলাপি ঋণ ২ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। এস আলম কোল্ড রোলড স্টিলসের খেলাপি ঋণ ২ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা, কর্ণফুলী ফুডসের ১ হাজার ৭৮৩ কোটি এবং ইনহেরেন্ট ট্রেডিং অ্যান্ড ইমপেক্সের ১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা, যেটি এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের আত্মীয় আনসারুল আলম চৌধুরীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান।

 

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র মো. আবুল কালাম সংবাদমাধ্যমকে জানান, ব্যাংকে কোন গ্রুপের কত শেয়ার ধারণ রয়েছে তার তদারকি করা মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব। বিএসইসির প্রধান কাজ হলো বড় অঙ্কের শেয়ার ক্রয়ের ক্ষেত্রে যথাযথ তথ্য প্রকাশ বা ডিসক্লোজার নিশ্চিত করা। তিনি আরও বলেন, কোনো কোম্পানির বিনিয়োগের অর্থের উৎস বা মানিলন্ডারিং-সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখার দায়িত্ব বিএফআইইউর। সিকিউরিটিজ আইনের সুনির্দিষ্ট লঙ্ঘন প্রমাণিত হলে বিএসইসি অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

 

সর্বশেষ বিএফআইইউ জানায়, এস আলম ৯টি দেশে অর্থ পাচার করেছে। তার মধ্যে ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপ রাষ্ট্র সাইপ্রাসে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও তার স্ত্রীর মালিকানাধীন একটি বিলাসবহুল দোতলা বাড়ি ক্রোক করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। সাইপ্রাসের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ ইউনিটের ‘মোকাস’-এর আবেদনের পর গত ১৯ মে এই সম্পত্তি ক্রোকের আনুষ্ঠানিক আদেশ আসে। বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮০০ কোটি ইউরোর বেশি অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সাইপ্রাসের নিকোসিয়া জেলা আদালত লিমাসসোল জেলার পারেকলিসিয়ায় অবস্থিত এস আলমের এই সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দেয় বলে জানা গেছে।

 

লেখক: সাংবাদিক