প্রফেসর ড. দিলীপ কুমার সাহা
রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এখন পর্যন্ত সরকারি তদন্ত শেষ হয়নি, তাই মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাটি হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ বা নবজাতক ওয়ার্ডে ঘটে এবং যান্ত্রিক ত্রুটি বা শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কাউকে দায়ী বলা যায় না। তবে অক্সিজেন বা এয়ার সাপোর্ট সিস্টেমের ত্রুটি, নবজাতক ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল না থাকা, ইনকিউবেটর বা মনিটরিং যন্ত্রপাতির ক্রুটি বিদ্যুৎ বা গ্যাস লাইনের সমস্যা, পর্যাপ্ত নার্স ও চিকিৎসক তদারকির ঘাটতি, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিলম্ব, হাসপাতালের নিরাপত্তা প্রটোকল ঠিকভাবে অনুসরণ না করা ইত্যাদি এমন দুর্ঘটনার পিছনে কারণ হতে পারে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তাদের রিপোর্টের পর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। অনেকে বলছে এসির ক্রুটির কারণে এই প্রাণহানি। এ ক্ষেত্রে আমি শুধু এসির ত্রুটিজনিত মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণগুলো একটু আলোকপাত করবো।
এসি (অরৎ পড়হফরঃরড়হবৎ) নিজে সরাসরি কাউকে ‘শ্বাসরোধ’ করে না , তবে হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডে এসির ক্রুটি, ভুল ব্যবহার বা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মারাত্মক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। নবজাতকদের ফুসফুস অত্যন্ত কোমল ও সংবেদনশীল হওয়ায় বড়দের তুলনায় তারা অনেক দ্রুত আক্রান্ত হয়।
তবে এসির কারণে যেভাবে নবজাতকদের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি হতে পারে তাহলো -(১) অক্সিজেন কমে গিয়ে কার্বন-ডাই-অক্সাইড বেড়ে যাওয়া- যদি নবজাতক ওয়ার্ড সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে এবং এসি শুধু একই বাতাস বারবার ঘুরিয়ে দেয়, কিন্তু বাইরে থেকে বিশুদ্ধ বাতাস প্রবেশ না করে, তাহলে ধীরে ধীরে কক্ষে অক্সিজেনের পরিমাণ কমতে পারে এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড জমতে পারে।
এর ফলে শিশুদের শ্বাস নিতে কষ্ট হয় রক্তে অক্সিজেন স্বল্পতা দেখা দেয়, এটা ঠিক যে নবজাতকরা খুব অল্প অক্সিজেন ঘাটতিতেই সংকটাপন্ন হয়ে পড়তে পারে (২) এসির ভেন্টিলেশন সিস্টেম নষ্ট হওয়া - অনেক হাসপাতালের সেন্ট্রাল এসি সিস্টেমে ঋৎবংয অরৎ ওহঃধশব থাকে, যা বাইরে থেকে বিশুদ্ধ বাতাস আনে। যদি এই অংশ নষ্ট হয় বা বন্ধ থাকে, তাহলে কক্ষের বাতাস ভারী ও দমবন্ধ হয়ে যেতে পারে।
বিশেষ করে - জানালা বন্ধ থাকলে, কক্ষে অনেক মানুষ থাকলে অনেক ইনকিউবেটর ও যন্ত্র চালু থাকলে, তখন বাতাসে অক্সিজেনের ঘাটতি দ্রুত বাড়তে পারে (৩) অতিরিক্ত ঠান্ডা পরিবেশ- নবজাতকের শরীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে দুর্বল। এসির তাপমাত্রা অতিরিক্ত কম হলে শিশুর শরীর ঠান্ডা হয়ে যায় (ঐুঢ়ড়ঃযবৎসরধ)।
এতে যা হতে পারে তাহলো শ্বাস ধীর হয়ে যাওয়া, অক্সিজেনের চাহিদা বেড়ে যাওয়া, ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া, শিশুর শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি, প্রিম্যাচিউর শিশুদের ক্ষেত্রে এটি সত্যিই আরও বিপজ্জনক; (৪) এসির ফিল্টারে জীবাণু জমা হওয়া- দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করলে এসির ফিল্টার ও ডাক্টে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক (ঋঁহমঁং), ধূলিকণা, ভাইরাস ইত্যাদি জমে যেতে পারে; এসব দূষিত বাতাস নবজাতকের ফুসফুসে প্রবেশ করলে: নিউমোনিয়া, শ্বাসনালীর সংক্রমণ তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে; (৫) এসি থেকে বিষাক্ত গ্যাস লিক হওয়া - এসি মেশিনে ব্যবহৃত রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস যেমন ফ্রেয়ন জাতীয় গ্যাস লিক করলে কক্ষে বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
এর প্রভাবে মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট, অক্সিজেনের ঘাটতি গুরুতর ক্ষেত্রে অজ্ঞান হওয়া নবজাতকদের ছোট ফুসফুস এসব গ্যাসে দ্রুত আক্রান্ত হতে পারে; (৬) আর্দ্রতার ভারসাম্য নষ্ট হওয়া - এসি অতিরিক্ত শুকনো পরিবেশ তৈরি করলে শিশুর নাক ও শ্বাসনালী শুকিয়ে যায়, শ্বাস নিতে অস্বস্তি হয়, ফুসফুসের সংবেদনশীলতা বেড়ে যায় আবার অতিরিক্ত আর্দ্রতা থাকলেও জীবাণু বৃদ্ধি পায়; (৭) বিদ্যুৎ বিভ্রাটে এসি বন্ধ হয়ে যাওয়া- যদি হঠাৎ এসি বন্ধ হয়ে যায় এবং কক্ষে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল না থাকে, তাহলে খুব দ্রুত গরম বেড়ে যায়, বাতাস ভারী হয়ে যায়, অক্সিজেন কমে যেতে পারে, বিশেষ করে ঘওঈট বা নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে এটি ভয়াবহ হতে পারে।
একটা কথা অনস্বীকার্য, নবজাতকদের ফুসফুস পুরোপুরি পরিণত হয় না; তাই নবজাতকের অক্সিজেনের চাহিদা বেশি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, শরীর দ্রুত ঠান্ডা বা গরম হয়ে যায় তাই সামান্য পরিবেশগত ক্রুটিও প্রাণঘাতী হতে পারে।
এক্ষেত্রে অবশ্যই হাসপাতালের এসিও ভেন্টিলেশন নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে, এসির ফিল্টার নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে, ঋৎবংয অরৎ ঈরৎপঁষধঃরড়হ নিশ্চিত করতে হবে, এসির ফিল্টার নিয়মিত জীবাণুমুক্ত করতে হবে এবং তাপমাত্রা ২৪০ -২৬ সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে হবে। জরুরি ব্যাকআপ ভেন্টিলেশন রাখতে হবে ঘওঈট-তে অক্সিজেন ও ঈঙ২ মনিটর বাধ্যতামূলক করতে হবে।
তবে নবজাতকদের মৃত্যু যদি এসির ত্রুটির কারণে হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে ভবিষ্যতে যাতে এহনে ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে এজন্য করনীয় হতে পারে- নবজাতক ওয়ার্ডে ২৪ ঘণ্টা অক্সিজেন ও ভেন্টিলেশন মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে; সব যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও টেকনিক্যাল অডিট বাধ্যতামূলক করতে হবে; জরুরি বিদ্যুৎ ব্যাকআপ সবসময় সচল রাখতে হবে; প্রশিক্ষিত নার্স ও নবজাতক বিশেষজ্ঞ বাড়াতে হবে; সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে; হাসপাতালগুলোর উপর সরকারি নজরদারি ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে।
একটি কথা মনে রাখতে হবে - হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডে এসি শুধু আরাম দেওয়ার যন্ত্র নয়; এটি শিশুদের জীবনরক্ষাকারী পরিবেশ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এর সামান্য ক্রুটি বা অবহেলা ও ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল ও কঠোর তদারকির সমন্বয় ছাড়া নিরাপদ নবজাতক সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
লেখক: প্রাক্তন প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক (সিআইডি) বাংলাদেশ পুলিশ, ঢাকা।