Image description

হাওরে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতির পরিমাণ চালের হিসাবে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ১৪ হাজার মেট্রিক টন, যা বোরো মৌসুমের মোট উৎপাদনের ১ শতাংশের মতো। কিন্তু বাজারে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। চালের দাম আবার বাড়ছে।

রাজধানীর পুরান ঢাকার বাবুবাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ও কারওয়ান বাজারের পাইকারি দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত তিন–চার দিনে চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৫ টাকা বেড়েছে। খুচরায় এখনো এর প্রভাব পড়েনি।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বোরো দেশের চাল উৎপাদনের প্রধান মৌসুম। এ মৌসুমের শুরুতে সাধারণত চালের দাম কমে। এবারও কমছিল। তবে কমার ধারা স্থায়ী হয়নি। দাম আবার বেড়ে যাচ্ছে।

এবার বোরো মৌসুমের শুরুতে বেশি পরিমাণে চাল উৎপাদনের আশা করা হয়েছিল। কিন্তু মৌসুমের মাঝখানে ডিজেলসংকটে সেচ বিঘ্নিত হওয়া এবং শেষ দিকে বৃষ্টি ও ঢলে ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

২০১৭ সালেও বৃষ্টি, আগাম বন্যা ও ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে হাওরে ফসল তলিয়ে গিয়েছিল। তখন চালের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন (২০১৭) বলছে, ওই বছর বোরো মৌসুমে চালের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ২০ লাখ টন। অন্যদিকে বন্যায় আমনেরও ক্ষতি হয়। আমনে ১৫ লাখ টন চাল কম উৎপাদিত হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে মোটা চালের দর কেজিতে ওঠে ৪৮ টাকায়, যা আগের বছরের চেয়ে ১৭ টাকা বেশি ছিল। দেশের ইতিহাসে এ মূল্যবৃদ্ধি ছিল সর্বোচ্চ।

চাল দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য। এর দাম বাড়লে বেশি বিপাকে পড়েন নিম্ন আয়ের মানুষ ও মধ্যবিত্তরা। ২০২০ সালের পর থেকেই দেশে চালের দাম চড়া। বিগত সময়ে দাম কমাতে নানা চেষ্টা হয়েছে। তবে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় দাম কাঙ্ক্ষিত হারে কমেনি।

এবার বোরো মৌসুমের শুরুতে বেশি পরিমাণে চাল উৎপাদনের আশা করা হয়েছিল। কিন্তু মৌসুমের মাঝখানে ডিজেলসংকটে সেচ বিঘ্নিত হওয়া এবং শেষ দিকে বৃষ্টি ও ঢলে ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

হাওরে মোট ৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৩ হেক্টর জমিতে এবার বোরো মৌসুমের ধান চাষ হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ৪৯ হাজার হেক্টর, যা হাওরের মোট জমির প্রায় ১১ শতাংশ।

ক্ষতি কতটা

ক্ষতি কতটা, তার একটি হিসাব করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)। তাদের তথ্য, গত ২৬ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত ৯ দিনের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওরে ক্ষতির মুখে পড়েছেন ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮১১ জন ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষি কৃষক।

সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া—হিসাব এই সাত জেলার। প্রতিবেদনে সবচেয়ে বেশি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সুনামগঞ্জে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষতি হয়েছে নেত্রকোনায়। ক্ষয়ক্ষতির তালিকার তৃতীয় স্থানে রয়েছে কিশোরগঞ্জ।

হাওরের বাইরে বিভিন্ন জেলায় অতিবৃষ্টির কারণেও ধানের কমবেশি ক্ষতি হয়েছে। তবে তার হিসাব হয়নি। মৌসুম শেষে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) উৎপাদনের হিসাব করলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে।

সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জনপ্রতি সাড়ে সাত হাজার টাকা করে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এতে মোট ১৭৭ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে হিসাব করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

হাওরে মোট ৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৩ হেক্টর জমিতে এবার বোরো মৌসুমের ধান চাষ হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ৪৯ হাজার হেক্টর, যা হাওরের মোট জমির প্রায় ১১ শতাংশ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর হাওর অঞ্চলের কৃষিজমিকে পানিপ্রবাহ ও ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে তিন ভাগে ভাগ করেছে। উজান অববাহিকা (আপার বেসিন), মধ্য অববাহিকা (মিডল বেসিন) ও ভাটি অববাহিকা (লোয়ার বেসিন)। অধিদপ্তরটি বলছে, হাওরের মোট কৃষিজমির ৩০ শতাংশ ভাটি অববাহিকায়। এখানে ধান চাষ সব সময় ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতি তিন–চার বছর পর অতিবৃষ্টি ও আগাম বন্যার ঝুঁকি থাকে এখানে।

অধিদপ্তরের সরেজমিন শাখার অতিরিক্ত পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন বলেন, গত দুই বছর এ ধরনের বন্যা বা আগাম বৃষ্টি হয়নি। এবার হাওর থেকে পানি নামতে দেরি হওয়ার ধান চাষ শুরু হয়েছে ১০ থেকে ১২ দিন দেরিতে। অন্যদিকে আগাম বৃষ্টি হয়েছে। সঙ্গে পাহাড়ি ঢল। সবমিলিয়ে এবার ক্ষতি হয়েছে কৃষকের।

এদিকে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জনপ্রতি সাড়ে সাত হাজার টাকা করে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এতে মোট ১৭৭ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে হিসাব করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

জানতে চাইলে অধিদপ্তরের সরেজমিন শাখার অতিরিক্ত পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়কে দিয়েছি। ত্রাণ মন্ত্রণালয় আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে।’

বিষয়টি নিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নুরুন আখতার (দুর্যোগ পূর্বাভাস, সাড়াদান ও সমন্বয়) প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা এ মাস থেকে আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি শুরু করব। মে, জুন ও জুলাই—এ তিন মাস এটি অব্যাহত থাকবে।’

বোরো মৌসুমে চালের দাম কমে। এবারও অনেকটা কমছিল। সেটা এখন বাড়ছে।
মহিউদ্দিন রেজা, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের বরিশাল রাইস এজেন্সির ব্যবস্থাপক

দাম বাড়ছে

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার দেশে ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো মৌসুমের ধান চাষ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্য ২ কোটি ২৭ লাখ টন। দেশের ধান উৎপাদনের ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে। বিবিএসের হিসাবে, গত বোরো মৌসুমে দেশে ২ কোটি ১৩ লাখ টনের কিছু বেশি চাল উৎপাদিত হয়েছিল।

মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের বরিশাল রাইস এজেন্সির ব্যবস্থাপক মহিউদ্দিন রেজা প্রথম আলোকে বলেন, বোরো মৌসুমে চালের দাম কমে। এবারও অনেকটা কমছিল। সেটা এখন বাড়ছে।

একই কথা বলেন পুরান ঢাকার বাবুবাজারের চালের আড়ত শিল্পী রাইস এজেন্সির মালিক কাওসার রহমান। তিনি বলেন, নতুন চালের চাহিদা সাধারণত কম থাকে। পাইকারিতে সপ্তাহখানেক আগে আসা সরু চাল পুরোনো চালের চেয়ে কেজিতে ১০ টাকা কমে বিক্রি হয়েছিল। এখন আবার কেজিতে ৪-৫ টাকা বেড়েছে। একই রকমভাবে কমেছিল মোটা ও মাঝারি চালের দরও। এখন আবার সব ধরনের চালের দাম ২ থেকে ৫ টাকা বাড়তি।

বাবুবাজারে নতুন মোটা চাল প্রতিকেজি ৪৫-৪৬ টাকা, পাইজাম ও বিআর-২৮ চাল ৫১-৫২ টাকা, মিনিকেট ৬০-৬৬ টাকা ও নাজিরশাইল মানভেদে ৭০ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, খুচরা বাজারে মোটা চালের কেজি মানভেদে ৪৮ থেকে ৬০ টাকা। মাঝারি চালের দাম ৫২ থেকে ৬৮ টাকা। সরু চাল ৭০ থেকে ৮৫ টাকা।

কয়েক বছর ধরে চালের দাম চড়া। কম ছিল ২০২০ সালের শুরুতে। টিসিবির হিসাবে, ২০২০ সালে ১ জানুয়ারি মোটা চালের কেজি ছিল ৩০-৩৫ টাকা। মাঝারি চাল ৪০-৫০ টাকা ও সরু চাল ৪৫-৬০ টাকা কেজিতে পাওয়া যেত। অবশ্য ওই বছর মার্চ থেকে দাম বাড়তে থাকে।

চালের দাম বাড়ছে। কিন্তু কৃষকেরা ধানের দাম পাচ্ছেন না। সামনে চাল মালিকদের ‘সিন্ডিকেট’ হবে। এমন পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে যে বাজারে চালের সংকট হচ্ছে।
মো. শাহজাহান কবীর, সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট

বিশ্ববাজার পরিস্থিতি

বিশ্বব্যাংকের বৈশ্বিক পণ্যমূল্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে চালের দাম চার মাস ধরে মোটামুটি স্থিতিশীল আছে। টনপ্রতি দর ৩৫০-৪০০ ডলারের মধ্যে রয়েছে।

বাংলাদেশে চাল আমদানি সাধারণত নিষিদ্ধ থাকে। প্রয়োজন হলে অনুমতি দেওয়া হয়। তবে বিশ্লেষকদের মত হলো, নির্দিষ্ট পরিমাণ শুল্ক আরোপ করে আমদানি উন্মুক্ত রাখা উচিত। যাতে দাম বেড়ে গেলে আমদানি হয় এবং বাজার স্থিতিশীল থাকে। একেবারে নিষিদ্ধ রাখলে বাজারে কারসাজির সুযোগ তৈরি হয়।

দেশ এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে রয়েছে। সর্বশেষ এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁরা বলছেন, এখন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো নয়। কর্মসংস্থান ও আয়বৃদ্ধির সুযোগ কম। এ সময়ে চালের কারণে যাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে না যায়, সেদিকে নজর রাখতে হবে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক মো. শাহজাহান কবীর প্রথম আলোকে বলেন, চালের দাম বাড়ছে। কিন্তু কৃষকেরা ধানের দাম পাচ্ছেন না। সামনে চাল মালিকদের ‘সিন্ডিকেট’ হবে। এমন পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে যে বাজারে চালের সংকট হচ্ছে।

শাহজাহান কবীর বলেন, এ সংকট থেকে উত্তরণে একমাত্র পথ হলো সরকারের চালের মজুত বাড়াতে হবে। কোনো অবস্থাতে সরকারের চালের মজুত ১২ লাখ ৫০ হাজারের টনের নিচে নামতে পারবে না (বর্তমানে রয়েছে ১২ লাখ ৬১ হাজার টন)। বাজারে যখন চালের দাম বাড়ার চেষ্টা হবে, তখন সরকার বাজারে চালের সরবরাহ বাড়িয়ে দাম নিয়ন্ত্রণ করবে।