Image description

ড. সিরাজুল আই. ভূঁইয়া

জাতীয় দুর্যোগ কিংবা কোনো দেশের ইতিহাসে সংঘটিত দুঃখজনক ঘটনার সময় মানুষ সাধারণত তার ব্যাখ্যা ও দায় খুঁজতে চায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ বাস্তবতা নয়, বরং ঘটনার পেছনের রাজনীতিকেই খুঁজে পায়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক হাম টিকাদান-সংকট তারই একটি উদাহরণ। একটি জনস্বাস্থ্য সংকট কীভাবে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দোষারোপের খেলায় রূপ নিল, সেটিই আজ বড় প্রশ্ন। একইসঙ্গে ভারতের কিছু গণমাধ্যম থেকেও বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর বয়ান ছড়িয়ে দেয়া হয়। যদিও এটি মূলত একটি জনস্বাস্থ্য সংকটের গল্প, বিশ্বের অনেক মানুষই এর গভীর রাজনৈতিক দিকগুলো উপলব্ধি করতে পারেননি। বরং স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, বাংলাদেশের কয়েকটি গণমাধ্যম পুরো সত্যকে সমালোচনামূলকভাবে তুলে ধরতে প্রস্তুত ছিল না।

 

জনমনে ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক। শিশুদের মৃত্যু যেকোনো সমাজের জন্য হৃদয়বিদারক। কিন্তু এমন আবেগঘন পরিস্থিতিকে শুধুমাত্র একটি প্রশাসনের ব্যর্থতা হিসেবে সরলীকরণ করা, অথচ এর পেছনের প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা, দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দুর্বলতা এবং ঘটনার পূর্ণ প্রেক্ষাপট অনুসন্ধান না করা অত্যন্ত সমস্যাজনক। আরও উদ্বেগজনক হলো, টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়ার পটভূমি প্রকাশে বাংলাদেশের কিছু গণমাধ্যমের অনীহা। বিষয়টি যোগাযোগ তত্ত্বের আলোকে বোঝা প্রয়োজন।

যোগাযোগবিদ এলিজাবেথ নোয়েল-নিউম্যান প্রথম “স্পাইরাল অব সাইলেন্স” বা “নীরবতার সর্পিল” নামে পরিচিত তত্ত্বটি উপস্থাপন করেন। তার মতে, বিভিন্ন কারণে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অনেক সময় নিজেদের মত প্রকাশ থেকে বিরত থাকে। এই নীরবতার পেছনে কাজ করে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ভয়, নিরাপত্তাহীনতা এবং সাহসের অভাব। আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতায় এলিজাবেথ নোয়েল-নিউম্যানের “স্পাইরাল অব সাইলেন্স” তত্ত্ব অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়।

বয়ান বনাম বাস্তবতা

কিছু সংবাদ প্রতিবেদন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় এমন ধারণা দেয়া হয়েছে যে, এই হাম সংকট সম্পূর্ণভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের অবহেলার ফল। তাদের দাবি, সরকার আন্তর্জাতিক সংস্থার সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছে, দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে টিকা সংগ্রহের পদ্ধতি পরিবর্তন করেছে এবং টিকা সংগ্রহে অযথা বিলম্ব করেছে। তবে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ড. মো. সায়েদুর রহমান ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে জরুরি হাম টিকাদান কর্মসূচি গ্রহণের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার কোনো ধরনের মহামারি-সংক্রান্ত সতর্কবার্তা বা নির্দেশনা পায়নি।

তার মতে, জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ হাম টিকাদান কর্মসূচি দু’টি ধাপে পরিচালিত হয়েছিল—প্রথমটি ২০১৪ সালে এবং দ্বিতীয়টি ২০২০ সালে, অর্থাৎ প্রায় ছয় বছরের ব্যবধানে। পরিকল্পনা অনুযায়ী তৃতীয় কর্মসূচি ২০২৪ সালে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে সৃষ্ট অস্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। সে সময় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, হতাহত ও আহতদের চিকিৎসা এবং মৃতদেহ ব্যবস্থাপনার মতো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়। পাশাপাশি হাম ও রুবেলা টিকা সংগ্রহের জন্য গ্যাভির আনুষ্ঠানিক অনুমোদনপত্র বাংলাদেশ পায় ২০২৫ সালের মার্চ মাসে। তার ভাষায়, সে সময় “কোনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে জরুরি বিশেষ হাম কর্মসূচি নেয়ার মতো কোনো সতর্কতা, অ্যালার্ট বা রেড ফ্ল্যাগ ছিল না।”
এ বক্তব্য জনপ্রিয় সেই ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যেখানে বলা হচ্ছিল কর্তৃপক্ষ আগাম সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছে। একইভাবে টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়া সম্পর্কেও তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন।

তার ব্যাখ্যায় তিনি উল্লেখ করেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কোনো ইপিআই টিকা উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়নি; বরং ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি সংগ্রহ পদ্ধতি আগের মতোই অব্যাহত ছিল। তিনি আরও বলেন, টিকা সংগ্রহ সংস্কার নিয়ে যে আলোচনা হয়েছিল, তা ছিল কেবল অনুসন্ধানমূলক—ইপিআই টিকার সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে। কারণ বর্তমান ব্যবস্থা জরুরি ক্রয় পদ্ধতির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। তিনি আরও জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ইপিআই টিকা সংগ্রহের জন্য বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়; সরকার ও এডিবির যৌথ অর্থায়নে প্রায় ১,৪৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এই তথ্যগুলো অন্তর্বর্তী সরকারকে পুরোপুরি দায়মুক্ত করে কি না, সেটি বিতর্কের বিষয় হতে পারে। তবে এগুলো ঘটনাটিকে বোঝার জন্য অবশ্যই একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে।

“স্পাইরাল অব সাইলেন্স” এবং বাংলাদেশের গণমাধ্যমের নীরবতা

তাহলে কেন সাধারণ মানুষ এসব তথ্য জানতে পারল না? সম্ভবত এর উত্তর নিহিত রয়েছে সেই “স্পাইরাল অব সাইলেন্স” তত্ত্বেই। এলিজাবেথ নোয়েল-নিউম্যানের মতে, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা ভবিষ্যৎ প্রতিক্রিয়ার ভয়ে মানুষ ক্রমাগত জনমতের প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করে। তার তত্ত্ব অনুযায়ী, গণমাধ্যমই মূলত সেই “মতামতের পরিবেশ” তৈরি করে। কোনো একটি মতামত যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ মত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন ভিন্নমতাবলম্বীরা আক্রমণের শিকার হওয়ার ভয়ে নীরব হয়ে যায়।

আজকের বাংলাদেশে মনে হচ্ছে, যারা পূর্ববর্তী রাজনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে কথা বলেন, তারা যেমন প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে পারেন, তেমনি অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে কথা বললেও সমালোচনার মুখে পড়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে অনেক সাংবাদিক পূর্ণ সত্য তুলে ধরার পরিবর্তে নীরবতা ও নির্বাচিত ফ্রেমিংয়ের পথ বেছে নিচ্ছেন। এ ধরনের প্রবণতা গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য ভয়াবহ হতে পারে।

যখন মানুষকে পূর্ণ প্রেক্ষাপট ছাড়াই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গল্প খাওয়ানো হয়, তখন জনমত বিকৃত হয়ে যায়। নাগরিকরা পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনামূলকভাবে ভাবার সুযোগ হারায়, কারণ তাদের সামনে কেবল গল্পের একপাশ তুলে ধরা হয়। “স্পাইরাল অব সাইলেন্স” শেষ পর্যন্ত সত্যকেই নীরব করে দিতে পারে।

হামের প্রাদুর্ভাব সচরাচর একক কোনো সরকারের কারণে ঘটে না

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ, যা সাধারণত প্রাদুর্ভাব আকারে দেখা দেয়। টিকাদানের হার কমে যাওয়া, সরবরাহব্যবস্থার ব্যর্থতা, টিকা গ্রহণে অনীহা, জনসংখ্যার চলাচল, দুর্বল স্বাস্থ্য অবকাঠামো এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা—এসবই হামের প্রাদুর্ভাব ঘটাতে ভূমিকা রাখে।
অধ্যাপক ড. মো. সায়েদুর রহমানও এ ক্ষেত্রে ব্যুরোক্রেটিক জড়তা, প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতির ভাঙন, প্রকল্প অনুমোদনে বিলম্ব এবং সমন্বয়হীনতার বিষয়গুলো স্বীকার করেছেন।

তবুও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানেন, হামের প্রাদুর্ভাব সাধারণত কোনো একক সরকারের আমলে সৃষ্ট সমস্যা নয়। টিকাদান ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিলে তার দায় কেবল একটি প্রশাসনের ওপর চাপানো যায় না। শিশুদের মৃত্যুকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো ভবিষ্যতের টিকাদান ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করবে। আর একবার যদি মানুষের আস্থা ভেঙে পড়ে, তবে তার পরিণতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এমন পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক।

ভঙ্গুর গণতন্ত্রে গণমাধ্যমের দায়িত্ব

দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার কাজ হলো ক্ষমতাকে সমালোচনামূলকভাবে পর্যালোচনা করা, কিন্তু সেটিকে কখনোই চটকদার রাজনৈতিক প্রচারণায় পরিণত হতে দেয়া নয়। সাংবাদিকদের দায়িত্ব হলো পরিস্থিতির ভারসাম্যপূর্ণ চিত্র তুলে ধরা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান পরিবেশন করা নয়। যখন সাংবাদিকতা তার দায়িত্ব ভুলে যায়, তখন একটি দেশের গণতন্ত্রও বিপন্ন হয়ে পড়ে। বর্তমানে বাংলাদেশের গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো এক গভীর সংকটের মুখোমুখি—তারা কি রাজনৈতিক স্বার্থের সেবা চালিয়ে যাবে, নাকি গণমাধ্যম হিসেবে নিজেদের প্রকৃত দায়িত্ব পুনরুদ্ধার করবে? টিকা সংগ্রহ এবং হামের প্রাদুর্ভাবকে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করা উচিত নয়।
বরং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণের অস্ত্র হিসেবে এই ট্র্যাজেডিকে ব্যবহার না করে বাংলাদেশের মানুষের উচিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে ভাবা—কীভাবে সরকার পরিবর্তনের সময়েও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যায়? কীভাবে টিকা সরবরাহব্যবস্থাকে ব্যুরোক্রেটিক জটিলতা থেকে নিরাপদ রাখা যায়?

সংকটকালে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত যোগাযোগব্যবস্থা কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়? এবং সর্বোপরি, কীভাবে এমন একটি বিভক্ত সমাজে সত্যকে রক্ষা করা সম্ভব, যেখানে নীরবতা সাংবাদিকতার জায়গা দখল করে নিচ্ছে?

সত্য ছাড়া কোনো গণতান্ত্রিক সমাজ বিকশিত হতে পারে না। এলিজাবেথ নোয়েল-নিউম্যান বহু দশক আগে সতর্ক করেছিলেন—যখন “স্পাইরাল অব সাইলেন্স” জনপরিসরকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন বাস্তবতার চেয়ে “সম্মতির ধারণা” আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আর যখন সত্য অস্বস্তিকর হয়ে পড়ে, তখন সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হয় কোনো সরকার বা নেতা নয়—বরং জনগণের জানার অধিকার।

ড. সিরাজুল আই. ভূঁইয়া যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের সাভানাহ স্টেট ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগের অধ্যাপক।

(এই মতামত লেখকের নিজস্ব)