Image description

রাজশাহী শহর ঘেঁষে বয়ে চলেছে পদ্মা নদী। আর এই নদী শুকিয়ে অসংখ্য চর জেগে উঠেছে। চরে জমেছে বালু, পড়েছে পলিমাটি। এতে নদীতে নৌকার বদলে বালুর ওপর চলছে ট্রাক্টর। পলিমাটিতে হচ্ছে বিভিন্ন রকমের চাষাবাদ। শুধু পদ্মা নদী নয়, ফারাক্কা বাঁধের কারণে পর্যাপ্ত পানি না পেয়ে নদ-নদীগুলো প্রায় মৃত। আর মৃত নদ-নদীগুলো দখল-দূষণের কারণে আত্রাই, ছোট যমুনা, তুলশীগঙ্গা, শিবনদ, নাগর নদসহ ছয়টি নদী অতীত ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। এক সময়ের পূর্ণ যৌবনা স্রোতস্বিনী নদীগুলো বর্ষা মৌসুমেও যেন মরা খালে রূপ নিয়েছে। বেশির ভাগ নদীর দুই পাশে দখল করে নির্মাণ করা হচ্ছে ভবন ও শিল্প কারখানা। দীর্ঘদিন ধরে নদী খনন না করায় পলি জমায় কমে গেছে নাব্য। বর্তমানে ময়লা-আবর্জনার ফেলার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে নদীগুলো।

এদিকে, নদীতে পানি শুকিয়ে যাওয়ার কারণে জেলেদের একটি বড় অংশ বেকার হয়ে গেছেন। যারা নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তাদের এখনই অনেকেই পদ্মা নদী থেকে নৌকা ও জাল গুটিয়ে নিয়েছেন। তারা মাছ শিকার না করে রাজশাহী নগরীতে দিনমজুর ও রিকশা চালানোর পেশা বেছে নিচ্ছেন।

রাজশাহী নগরীর কুমারপাড়া এলাকার ছেলে যতীন বলেন, ‘এক সময় নদীতে মাছ ধরতাম। এখন নদীতে পানি নেই, নেই মাছ। তাই জীবিকা নির্বাহের জন্য রিকশা চালাই।’

জানা গেছে, প্রায় তিনশো বছর আগে পদ্মা নদীর প্রবাহিকায় সৃষ্টি হওয়া দেশের সর্ব পশ্চিমের মনাকষা ইউনিয়ন দিয়ে বয়ে আসা এক সময়ের খরস্রোতা চকের নদীর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। নদীটি এখন আবাদি জমিতে পরিণত হয়েছে। এই নদীটির অবস্থান চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা, বিনোদপুর ও দুর্লভপুর ইউনিয়নে। মনাকষা ইউনিয়নের সর্বপশ্চিমে ভারত সীমান্ত থেকে নদীটি মনাকষা বাজারের দক্ষিণ দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দুর্লভপুর ইউনিয়নের তর্তিপুর এলাকায় গিয়ে পাগলা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়। পরে পদ্মা নদীতে গিয়ে যুক্ত হয়। ভৌগোলিকভাবে নদীটি তর্তিপুর, বিনোদপুর, চৌকা, মনাকষা ও দুর্লভপুরসহ প্রায় ৮টি মৌজার জমির ওপর দিয়ে এক সময় প্রবাহিত হয়েছে। খরস্রোতা এই নদীকে কেন্দ্র করে তীরে গড়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ জনপদ, উত্তরবঙ্গের প্রাচীনতম আদিনা ফজলুল হক কলেজ, দাদনচক হেমায়েত উচ্চ বিদ্যালয়, মনাকষা হুমায়ুন রেজা উচ্চ বিদ্যালয়, মনাকষা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ প্রায় ১৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। চৌকা ও মনাকষাসহ কয়েকটি বিওপি, বড় বড় হাটবাজার, মনাকষা শ্মশান ঘাট, তত্তীপুর শ্মশান ঘাটসহ অসংখ্য ছোট-বড় প্রতিষ্ঠান।

Rajshahi River Newsদেখে বোঝার উপায় নেই, এটি একটি নদী ছিলনদীর পানি ব্যবহার করে সহস্রাধিক কৃষক জমিতে সেচ দিতেন। শত শত জেলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন এবং বর্ষা মৌসুমে নৌকাই ছিল যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম। দেশ-বিদেশের বড় বড় বণিকরা ব্যবসা-বাণিজ্য করতে এই নদীপথে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতেন। নদীটি ছিল এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু একদিকে কালের বিবর্তন, অন্যদিকে ভারতে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর পদ্মা নদী মোড় নেওয়ায় এ নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। নদীর প্রবাহ বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এক শ্রেণির ভূমিদস্যু নদীর হাজার হাজার বিঘা জমি নানা কৌশলে দখল করে নিয়েছে। এ নদীটি স্বাধীনতা উত্তরকালেও ভারতীয় সীমান্ত থেকে তত্তীপুর পর্যন্ত ১২-১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ১৫০-২০০ মিটার প্রস্থ ছিল। কিন্তু চকের নদী আজ অস্তিত্ব বিলুপ্তপ্রায়। নদীর বুকজুড়ে হাজার হাজার বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ হচ্ছে।

 

আরও জানা গেছে, এ নদীর বুকজুড়ে বছরে তিনবার বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদন হয়। তার মধ্যে ধান, পাট, ভুট্টা, সবজি, কলাই, গমসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল উল্লেখ্যযোগ্য। নদীর অধিকাংশ অংশে পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও নদীর স্বাভাবিক গতিপথ সংকুচিত হয়ে খালে পরিণত হয়েছে, আবার অনেক জায়গায় নদীর জায়গা দখল করে চাষাবাদ বা বসতবাড়ি গড়ে উঠেছে। নদীর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি থাকে না।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার মনাকষা এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুল হালিম, আবু হোসেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোয়াজ্জেম হোসনে মন্টু, বদিউর রহমানের ভাষ্যমতে, ‘একসময় এই নদীতে সারাবছর পানি থাকতো। আমরা এখানে গোসল করতাম, মাছ ধরতাম, নৌকায় চলাচল করতাম। কত আনন্দ হতো। এখন নদীটা শুধুই মরা খাল।’

একই এলাকার কৃষকরা জানান, নদী শুকিয়ে যাওয়ায় শ্যালোমেশিনের ও মর্টারের (সাবমার্সিবল পাম্প) মাধ্যমে সেচ ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।

পরিবেশবিদদের মতে, একটি নদী কেবল পানির উৎস নয়, বরং একটি অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য, কৃষি ও অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চকের নদীর মতো ছোট নদীগুলো ধ্বংস হয়ে গেলে তার প্রভাব পড়ে পুরো পরিবেশ ব্যবস্থার ওপর। দেশি মাছের প্রজাতি কমে যাচ্ছে, জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে এবং জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ছে।

স্থানীয়দের দাবি, নদীর জমি দখলমুক্ত করে খনন করতে হবে। নদীখনন হলে আগের অবস্থানে ফিরে গেলে জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পাবে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হবে। 

এ ব্যাপারে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন যোগদান করেছি। নদীটি সম্পর্কে আমার জানা নেই। তবে এখন শুনলাম। জরুরি ভিত্তিতে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে নদীর জমি পুনরুদ্ধার করে নদীর জীবন ফিরিয়ে আনা হবে।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম আহসান হাবিব বলেন, ‘নদীটির হালচাল সম্পর্কে বর্তমানে আমার জানা নেই। তবে এ নদীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় নদীর জমি পুনরুদ্ধার করে খাল খনন প্রকল্পের আওতায় এনে কৃষিকাজ, মাছচাষসহ জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনতে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

এদিকে, নাটোর জেলার ১৯টি নদীর মধ্যে দখল-দূষণে সবচেয়ে বেহাল অবস্থা নারদ নদ ও বড়াল নদীর। এ ছাড়া বারনই ও মুসা নদীও দখল করছেন প্রভাবশালী। এ ছাড়া জেলার ৫৮টি বড় খালের অধিকাংশ দখল হয়ে গেছে।

নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও সরকারদলীয় হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নদীর সংস্কার ও খাল খননের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এ ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দ্রুতই তারা যেন অবৈধভাবে দখল হয়ে যাওয়া খাল পুনরুদ্ধার করেন এবং সেগুলো খনন করেন সেজন্য সোচ্চার আছেন সরকারপ্রধান।’

রাজশাহী শহরের পাড় ঘেঁষে বয়ে গেছে পদ্মা নদী। নদীর লালন শাহ মুক্ত মঞ্চের সামনে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে শতাধিক স্থায়ী ও অস্থায়ী দোকানপাট। জেলায় একই অবস্থা অর্ধশত স্থানে। এ ছাড়া বড়াল, নারদ ও হুজা নদীতে বাঁধ দিয়ে ধান ও মাছের চাষ করছেন স্থানীয়রা। মহানগরীর যত বর্জ্য, ময়লা-আবর্জনা মিশ্রিত পানি বারনই নদী দিয়ে ঢুকে পড়ছে পবা উপজেলার সর্বত্র। এতে ব্যাঘাত ঘটছে ফসলের উৎপাদনে। লিজ না নিয়ে অবৈধভাবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কথা স্বীকার করেছেন দখলদাররা। অভিযোগ রয়েছে, কেউ কেউ সরকারি জমিকে নিজের দাবি করে চাঁদা উত্তোলন করছে। এসব দেখার যেন কেউ নেই।

এদিকে, দখল-দূষণের কারণে জনদুর্ভোগের বিষয়টি স্বীকার করে রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর বলেন, ‘মহানগরীতেই শুধু অবৈধ দখলদার রয়েছে এক হাজার ৬১২ জন। তালিকা তৈরি করা হয়েছে, নোটিশ দিয়ে অচিরেই তাদের উচ্ছেদ করা হবে। বিষয়টি রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলামকেও অবহিত করা হয়েছে। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের উচ্ছেদ করা হবে।’

রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার আ ন ম বজলুর রশীদ জানান, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ইতোমধ্যে বেশ কিছু মৃতপ্রায় নদী ও খাল দখলমুক্ত করে সংস্কার ও খনন কাজ শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সবগুলো খাল খনন করা হবে। এজন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বর্তমানে সরকারও খাল খননের জন্য তাগিদ দিয়েছেন। সবকিছু মাথায় নিয়ে রাজশাহী বিভাগের ৮টি জেলায় ধারাবাহিকভাবে কাজগুলো চলবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, রাজশাহী বিভাগে ৪০টিরও বেশি নদ-নদী ও খাল দখল-দূষণের কারণে রয়েছে অস্থিত্ব সংকটে। তবে দুই যুগ আগেও এসব নদীতে নাব্য ছিল।

অন্যদিকে, ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চের ৫০ বর্ষপূর্তিতে গণজমায়েত করবে উদযাপন কমিটি। এ নিয়ে বৃহস্পতিবার (১৪ এপ্রিল) দুপুরে সংবাদ সম্মেলনও করেছেন নেতৃবৃন্দ। এ ছাড়াও নতুন গঙ্গা চুক্তিতে বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন তারা।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গঙ্গা-পদ্মার পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকা ভয়াবহ সংকটে পড়েছে।

বক্তারা বলেন, ১৯৭৬ সালের ১৬ মে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ ছিল বাংলাদেশের পানি অধিকার আন্দোলনের সবচেয়ে বড় গণজাগরণ। সেদিন লাখো মানুষ রাজশাহীর মাদ্রাসা ময়দান থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটের উদ্দেশ্যে পদযাত্রা করেছিলেন।

বক্তারা অভিযোগ করেন, গত পাঁচ দশকে ফারাক্কার কারণে গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় নেমে এসেছে। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে নদীর পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় নদী সংকুচিত হয়েছে, তলদেশ ভরাট হচ্ছে পলি ও বালুতে। বিলুপ্ত হয়ে গেছে কয়েক প্রজাতির মাছ ও জলজপ্রাণী। গঙ্গার ডলফিন, ঘড়িয়াল এবং পদ্মার ইলিশ প্রায় হারিয়ে গেছে। নদীকেন্দ্রিক জীবিকা হারিয়েছেন লাখো মানুষ।

সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা তথ্যমতে, ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি গঙ্গায় পানিপ্রবাহ ছিল ৯০ হাজার ৭৩০ কিউসেক। ২০২৪ সালের একই দিনে তা নেমে আসে ৭৫ হাজার ৪০৯ কিউসেকে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রবাহ কমে ১৫ হাজার ৩২১ কিউসেক।

বক্তারা বলেন, ফারাক্কার প্রভাবে উত্তরাঞ্চলে সেচ সংকট তীব্র হয়েছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রায় সব গভীর নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় আর্সেনিক দূষণও বাড়ছে। অন্যদিকে, দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষি উৎপাদন কমছে, হুমকির মুখে পড়ছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হবে। তাই এখনই নতুন চুক্তির জন্য প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। বক্তারা ১৯৭৭ সালের মতো গ্যারান্টি ক্লজ পুনর্বহাল এবং বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও চিনকে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন যৌথ নদী কমিশন গঠনের দাবি জানান।

সংবাদ সম্মেলন থেকে শনিবার (১৬ মে) বিকাল ৩টায় রাজশাহীর বড়কুঠী পদ্মাপাড়ে আয়োজিত গণজমায়েতে সর্বস্তরের মানুষকে অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।

পরিবেশবিদ ও নদী বাঁচাও আন্দোলন রাজশাহীর নেতা এবং ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চের ৫০ বর্ষপূর্তিতে গণজমায়েত উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট এনামুল হক বলেন, ‘আমরা অনেক আগে থেকেই নদী বাঁচাও আন্দোলন করে যাচ্ছি। তবে মূল বিষয়টি হলো, ভারত আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করে গঙ্গাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানি একতরফাভাবে সরিয়ে নিচ্ছে। এ কারণে পদ্মা থেকে শুরু করে শাখা উপশাখা নদীগুলো শুষ্ক মৌসুমের আগেই শুকিয়ে যাচ্ছে। আর এর প্রভাব পড়ছে এ অঞ্চলের মানুষের ওপর।’

এ ছাড়াও শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে রাজশাহী অঞ্চলে কয়েক হাজার হেক্টর জমির চাষাবাদ বিঘ্নিত হয়। প্রতি বছরই লোকসান গুনতে হয় কৃষকদের। কৃষিতে এবার স্বপ্ন দেখাচ্ছে পদ্মা ব্যারেজ। পানি সংরক্ষণ করা হলে রাজশাহী অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ এর উপকার পাবে। 

ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষায় রাজবাড়ীর পাংশায় হতে যাচ্ছে পদ্মা ব্যারেজ। এর মাধ্যমে সংরক্ষণ করা যাবে বর্ষার বিপুল জলরাশি। ব্যারেজ হলে আমুল বদলে যাবে কৃষকদের ভাগ্য। এমনটাই বলছে কৃষি বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমন্বিত এ পানি ব্যবস্থাপনায় পদ্মার শাখা নদীগুলোর নাব্য ফিরে আসবে। লবণাক্ততা রোধ করে রক্ষা করা যাবে সুন্দরবনকে। এ ছাড়া রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পানির জোগানও নিরবচ্ছিন্ন হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, শুধু আঞ্চলিক নয়, জাতীয় অর্থনীতিরও ‘গেম চেঞ্জার’ হতে যাচ্ছে এই প্রকল্প। পানি উন্নয়ন বোর্ড রাজশাহীর উপসহকারী প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, ‘আমরা এখন ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। সেটি না তুলে তখন আমরা ভূ-পৃষ্ঠের পানি ব্যবহার করে সেচ দিতে পারবো। রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে যে পানি প্রয়োজন সেটিও আমরা পর্যাপ্ত পরিমাণে পাবো। আমাদের এই অঞ্চলের কৃষকদের যে দাবি-দাওয়া দীর্ঘদিনের, যেটা নিয়ে আন্দোলন করেছেন, তাও পূরণ হবে।’

রাজশাহীর গোদাগাড়ীর উপজেলার বড়গাছি গ্রামের কৃষক আবু তাহের বলেন, ‘পদ্মাতে যদি পানি ঠিক থাকে তাহলে গভীর নলকূপে পানির সমস্যা হবে না। তখন চাষাবাদেও সমস্যা হবে না। বিশেষ করে, আমরা যারা চরে চাষাবাদ করছি, তারা বেশি সুফল পাবো।’

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার কিশোরপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল বাছির বলেন, ‘পদ্মায় শীতকাল থেকে পানি চলে যায়। সে সময় আমাদের চাষাবাদে সমস্যা হয়। চৈত্র মাসে পানির জন্য সবচেয়ে বেশি সমস্যায় থাকতে হয়। পানি ধরে রাখতে পারলে সবদিক দিয়ে সুবিধা থাকবে। এ ছাড়াও চরে মানুষের যাওয়া-আসায় বেশ সুবিধা পাওয়া যাবে।’

নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, ‘পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করে পানি ধরে রাখা হলে রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত নদীর পানির স্তর তুলনামূলক উঁচু রাখা সম্ভব হবে। ব্যারাজে সংরক্ষিত পানি বিভিন্ন নদীপথে ডাইভার্ট করা হবে, যার লক্ষ্য শুকনো মৌসুমে এসব নদীতে পানিপ্রবাহ সচল রাখা। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকট কমানো।’