Image description

সহিদুল আলম স্বপন

রাষ্ট্রের সবচেয়ে দৃশ্যমান মুখ হলো পুলিশ। রাস্তার মোড়ে, হাটে-বাজারে, থানার দরজায় যেখানেই সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রকে স্পর্শ করতে চায়, সেখানেই পুলিশের উপস্থিতি। কিন্তু সেই উপস্থিতি কতটা আশ্বস্তকারী আর কতটা আতঙ্কজনক এই প্রশ্নটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আজও অমীমাংসিত। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ঢেউয়ে যখন সরকার সাইবার পুলিশ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিগ ডাটা বিশ্লেষণের কথা বলছে, তখনও রাজপথে একজন কনস্টেবলের আচরণ, তার পোশাকের পরিপাটি ভাব কিংবা একজন ওসির কথা বলার ভঙ্গি এই ছোট ছোট বিষয়গুলোই নির্ধারণ করে দেয় রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্কের প্রকৃত তাপমাত্রা।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের তৎপরতা নিয়ে বাংলাদেশে আলোচনা হয় দুটি চরম প্রান্তে- অতিরিক্ত প্রশংসায়, নয়তো তীব্র সমালোচনায়। মাঝখানের যে বিশ্লেষণী জায়গাটি, যেখান থেকে সংস্কারের পথ বের হয়, সেটি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ পুলিশ একটি বিশাল বাহিনী,  প্রায় দুই লক্ষেরও বেশি সদস্য নিয়ে গঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব বহন করছে। কিন্তু জনসংখ্যার অনুপাতে পুলিশ-জনগণ অনুপাত এখনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অনেক নিচে। জাতিসংঘের সুপারিশ অনুযায়ী প্রতি এক লক্ষ জনগণের জন্য ২২২ জন পুলিশ সদস্য থাকা উচিত, অথচ বাংলাদেশে এই সংখ্যা এখনো সেই লক্ষ্যমাত্রার ধারে কাছে নেই। সংখ্যার এই ঘাটতি পূরণ না হলে মাঠপর্যায়ে তৎপরতা বাড়ানোর কথা বলা অনেকটা শূন্যের উপর ইমারত গড়ার মতো।

তবে সংখ্যার চেয়েও বড় সংকট হলো মানের। একজন পুলিশ সদস্যের পোশাকি চলনবলন অর্থাৎ তার ইউনিফর্ম পরিধানের শৃঙ্খলা, দাঁড়ানোর ভঙ্গি, কথা বলার ধরন, জনগণের সঙ্গে আচরণের ধরন এগুলো নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়, এগুলো রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বের প্রতীক। বিশ্বের যেসব দেশে পুলিশ সত্যিকার অর্থে জনবান্ধব, সেখানে পোশাকি শৃঙ্খলাকে কেবল নান্দনিকতার বিষয় হিসেবে দেখা হয় না, বরং এটিকে পেশাদারিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। জাপানের পুলিশ কর্মকর্তারা জনগণের সামনে সর্বদা সুশৃঙ্খল পোশাকে উপস্থিত থাকেন এটি সেখানে আইনি বাধ্যবাধকতার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের প্রকাশও বটে। নরওয়ে বা ডেনমার্কের পুলিশ প্রশিক্ষণে মানবাধিকার, যোগাযোগ দক্ষতা এবং সামাজিক সংবেদনশীলতাকে কৌশলগত প্রশিক্ষণের সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বাংলাদেশে পুলিশের মাঠপর্যায়ের তৎপরতা বিশ্লেষণ করলে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও চোখে পড়ে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল নজরদারি, দ্রুত প্রতিক্রিয়া দলের কার্যকারিতা এবং কিছু মহানগরীতে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু এই ইতিবাচক চিত্রের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে থানায় সাধারণ মামলা নিতে গড়িমসি করা, অভিযোগকারীকে উল্টো হেনস্তা করা এবং ক্ষমতাবানদের সামনে নত হওয়ার পুরনো সংস্কৃতি। এই দ্বৈততাই বাংলাদেশ পুলিশের সবচেয়ে বড় পরিচয়-সংকট।

আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের তৎপরতা জোরদার করতে হলে কেবল টহল বাড়ালে বা চেকপোস্ট স্থাপন করলেই চলবে না। দরকার বুদ্ধিভিত্তিক পুলিশিং বা ইন্টেলিজেন্স-লেড পুলিশিংয়ের পূর্ণ বাস্তবায়ন। এর অর্থ হলো, অপরাধ ঘটার পরে প্রতিক্রিয়া দেখানোর বদলে অপরাধ ঘটার আগেই তার পূর্বাভাস পাওয়া এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়া এই মডেলে সাফল্য পেয়েছে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন জেলায় অপরাধের ধরন, ঘটনাস্থল ও সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি জাতীয় ক্রাইম ম্যাপিং ডেটাবেজ তৈরি করা সম্ভব, যা পুলিশের মাঠপর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে অনেক বেশি কার্যকর করবে।

সাইবার অপরাধ দমনে সরকারের নতুন উদ্যোগকে স্বাগত জানাতেই হয়। কিন্তু সাইবার পুলিশ ইউনিটকে কার্যকর করতে হলে শুধু প্রযুক্তির সরঞ্জাম নয়, দরকার প্রযুক্তি-সচেতন মানবসম্পদ। আর্থিক জালিয়াতি, অনলাইন প্রতারণা, ডার্কওয়েবে মাদক ও অস্ত্র পাচার এবং সাইবার সন্ত্রাসবাদ এই অপরাধগুলো মোকাবেলায় যে বিশেষায়িত দক্ষতা প্রয়োজন, তা রাতারাতি তৈরি হয় না। ব্রিটেনের ন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম ইউনিট বা আমেরিকার এফবিআই সাইবার ডিভিশন গড়ে উঠেছে বছরের পর বছরের বিনিয়োগ ও প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশকেও সেই দীর্ঘমেয়াদী পথে হাঁটতে হবে।

আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবেলায় বাংলাদেশ পুলিশের আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা বাড়ানো এখন অপরিহার্য। মাদক পাচার, মানব পাচার ও সন্ত্রাসী অর্থায়নের নেটওয়ার্ক এখন আর দেশের সীমানায় আটকে নেই। ইন্টারপোল, এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং এবং দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা চুক্তির আওতায় তথ্য বিনিময় ও যৌথ অভিযানের সংস্কৃতি আরও প্রসারিত করতে হবে। গ্লোবাল ভিলেজের অংশীদার হওয়ার অর্থ কেবল বাণিজ্য বা কূটনীতিতে নয়, নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বৈশ্বিক সহযোগিতার ভাষায় কথা বলতে পারা।

এই সংস্কারের পথে সরকারের পাশাপাশি জনগণেরও দায় আছে। পুলিশকে কেবল সমালোচনা করলেই হবে না, তাদের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়তে হবে। সাইবার অপরাধের শিকার হলে অভিযোগ করতে এগিয়ে আসতে হবে, ডিজিটাল সাক্ষরতা অর্জন করতে হবে এবং কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একটি সুশৃঙ্খল ও জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে ওঠে রাষ্ট্র ও নাগরিকের যৌথ প্রচেষ্টায় এই সত্যটি আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেওয়া দরকার।

ইউনিফর্মের ভেতরে একজন মানুষ থাকেন সেই মানুষটি যদি প্রশিক্ষিত, নৈতিক এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ হন, তাহলে সেই ইউনিফর্ম হয়ে ওঠে আশ্রয়ের প্রতীক। আর যদি তা না হয়, তাহলে সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তিও সেই আস্থার ঘাটতি পূরণ করতে পারবে না। বাংলাদেশ পুলিশকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের উপযোগী করে গড়ে তোলার মানে তাই শুধু সার্ভারে ডাটা জমানো নয় মানুষের মনে বিশ্বাস জমানোও বটে।

লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি