খায়ের মাহমুদ
বাংলাদেশে ‘বিনা বিচারে আটক’ কথাটা শুনলেই আমার মনে হয়, আমরা ন্যায়বিচারের সবচেয়ে মৌলিক ধারণাটার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের আপস করে চলেছি। সংবিধান আমাদের শিখিয়েছে— জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা ‘আইনানুযায়ী ব্যতীত’ হরণ করা যাবে না, গ্রেফতার হলে কারণ জানাতে হবে। আইনজীবীর সহায়তা দিতে হবে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে। এগুলো কেবল নিয়ম নয়, এগুলো রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি, বহু মানুষের ক্ষেত্রে বিচার নয়, কারাগারটাই আগে শুরু হয়— পরে তদন্ত, পরে চার্জশিট, পরে শুনানি, আর সেই ‘পরে’ কখনও কখনও মাস নয়, বছর হয়ে যায়।
এই সংকটকে নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের ঘটনা। সংবাদে বলা হয়েছে, ৮১ বছর বয়সে তিনি প্রায় ২৮০ দিন ধরে কারাগারে আছেন, অথচ একাধিক মামলা থাকলেও কোনও মামলায় এখনও চার্জশিট জমা দেয়নি পুলিশ। তার বয়স ও শারীরিক জটিলতার কথাও আলোচনায় এসেছে। এখানে ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বা অতীত ভূমিকা দিয়ে বিচার করতে চাই না। কারণ আজ যে মানুষটি ‘অপছন্দের’, হতে পারেন কাল সেই একই প্রক্রিয়ার শিকার হতে পারেন অন্য কেউ। আমার কাছে বড় প্রশ্নটা হলো— যদি চার্জশিটই না থাকে, বিচারই শুরু না হয়, তাহলে কারাগারে থাকা কি শাস্তির মতো হয়ে উঠছে না? এই সমস্যার শিকড় শুধু ‘ইচ্ছা’ বা ‘প্রতিহিংসা’তে সীমাবদ্ধ নয়, এটি আমাদের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার ভেতরের কিছু কাঠামোগত অভ্যাসের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। ফৌজদারি কার্যবিধির (সিআরপিসি) ধারা ৫৪ পুলিশকে ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেফতারের ক্ষমতা দেয় ঠিকই, কিন্তু সেটি ‘যৌক্তিক অভিযোগ/বিশ্বাসযোগ্য তথ্য/যৌক্তিক সন্দেহ’ এবং গ্রেফতার কেন প্রয়োজন, তার লিখিত কারণ রেকর্ড করার শর্তসহ। আবার ধারা ১৬৭–তে বলা আছে, ২৪ ঘণ্টায় তদন্ত শেষ না হলে ম্যাজিস্ট্রেট নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটক অনুমোদন করতে পারেন, অর্থাৎ এখানে মূল দর্শন ছিল বিচারিক তদারকি। কিন্তু এই তদারকির বাস্তব প্রয়োগ যখন ‘রুটিন অনুমোদন’ হয়ে যায়, তখন গ্রেপ্তার-রিমান্ড-হেফাজত সবকিছু মিলিয়ে আটক দীর্ঘায়িত হয়, আর বিচার শুরু হওয়ার আগেই একজন মানুষ দীর্ঘ সময় কারাগারের ভেতর পড়ে থাকেন।
এই জায়গাটায় জামিনের প্রশ্নটা আমার কাছে সবচেয়ে সংবেদনশীল। সিআরপিসি’র ৪৯৭ ধারায় বলা আছে— অজামিনযোগ্য অপরাধেও আদালত জামিন দিতে পারে, বিশেষভাবে ১৬ বছরের নিচে, নারী, বা অসুস্থ/অক্ষম ব্যক্তির ক্ষেত্রে জামিন বিবেচনার কথাও রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে তো আরও পরিষ্কার— ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটসের (আইসিসিপিআর) ৯ অনুচ্ছেদে বলা আছে, বিচার-পূর্ব আটক সাধারণ নিয়ম হওয়া উচিত নয়, দ্রুত বিচারকের সামনে হাজির করা, যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে বিচার বা মুক্তি, এগুলো রাষ্ট্রের আইনগত বাধ্যবাধকতা। অথচ আমার মনে হয়, আমাদের চর্চায় ‘জামিন আমার অধিকার’ ধারণাটি ধীরে ধীরে ‘জামিন আমার অনিশ্চিত সুবিধা’ হয়ে গেছে, বিশেষত যখন এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা, বা একই ঘটনার ওপর নানা মামলা, বা নতুন করে ‘গ্রেফতার দেখানো’, এসব যুক্ত হয়ে যায়।
মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের ৯, ১০ ও ১১ অনুচ্ছেদে কোনও ব্যক্তিকে নির্বিচার আটক রাখাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, একইসঙ্গে এটি প্রত্যেকের ন্যায্য ও প্রকাশ্য শুনানির অধিকার নিশ্চিত এবং ‘দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক ব্যক্তিকে নির্দোষ’ নীতিকে প্রতিষ্ঠা করেছে। একইসঙ্গে আইসিসিপিআরের ৯ অনুচ্ছেদ আবার বলছে, কাউকে আটক কখনও ইচ্ছামতো হতে পারে না, গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে বিচারকের সামনে দ্রুত হাজির করা, যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে বিচার বা মুক্তি এবং বিচার-পূর্ব আটককে সাধারণ নিয়ম না বানানোর নীতি রাষ্ট্রকে অবশ্যই মানতে হবে। এখন আন্তর্জাতিক আইনের এই মানদণ্ড আমাদের বাস্তবতার সঙ্গে মেলালে, আমাদের আইনের ভাষা আর জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে যে একটা বড় দূরত্ব তৈরি হয়েছে সেটা স্পষ্ট হয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এই দীর্ঘসূত্রতার চিত্রটি সংবাদে বহুবার এসেছে, সাবেক মন্ত্রী, এমপি, সাবেক আমলা ও সাংবাদিকদের মধ্যে অনেকে চার্জশিট ছাড়াই দীর্ঘদিন আটক ছিলেন বা আছেন, এমন তথ্য সম্প্রতি ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদনে এসেছে। যেখানে কারও ক্ষেত্রে ৫০০ দিনেরও বেশি আটকের উদাহরণও উল্লেখ করা হয়। একই প্রতিবেদনে কারাবন্দির সামগ্রিক সংখ্যাও উঠে এসেছে, নির্বাচনের আগে দেশে কারাবন্দি ছিলেন প্রায় ৮৫ হাজার, পরে তা প্রায় ৮০ হাজারে নেমেছে। অর্থাৎ কিছু মুক্তি ঘটলেও উল্লেখযোগ্য একটি অংশ এখনও কারাগারে। আমার কাছে এটিই ইঙ্গিতপূর্ণ, সরকার বদলালেও, এমনকি নির্বাচন হয়ে নির্বাচিত সরকার এলেও, বিচার-পূর্ব আটক ও বিচার বিলম্বের কাঠামোগত চাপটা রয়ে যায়, যার ফলে ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ কেবল শাসক বদলালে থামে না।
আরও একটু খোলাসা করে বলতে গেলে— অন্তর্বর্তী সরকার-পর্বে আমরা যে উদ্বেগগুলো দেখেছি, ঢালাও মামলা, দীর্ঘ তদন্ত, চার্জশিট দাখিলে বিলম্ব, জামিন শুনানি এগোতে না পারা, একাধিক মামলায় মুক্তি আটকে থাকা, সেগুলোর অনেকটাই নির্বাচিত সরকারের সময়েও কার্যত চলছে, কারণ এগুলো শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়— এগুলো তদন্ত সক্ষমতা, প্রসিকিউশন কাঠামো, মামলার সংখ্যা, আদালতের ব্যাকলগ, এবং সর্বোপরি ‘গ্রেফতারকে সহজ, বিচারকে কঠিন’ করে ফেলা এক সংস্কৃতির ফল। আমি এখানে কাউকে আলাদা করে দোষ দিচ্ছি না, বরং বলছি— আমরা যেন বারবার একই চক্রে ফিরে আসছি। এক শাসনে যেটা অন্যায় বলে মনে হয়, পরের শাসনে সেটাই ‘চাপের বাস্তবতা’ হিসেবে টিকে থাকে।
বিনাবিচারে আটক সাংবাদিকদের প্রসঙ্গটি এই বিচারহীনতার সংকটকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে। দিনের পর দিন সাংবাদিকদের বিনা বিচারে আটক রাখার সঙ্গে শুধু একজন অভিযুক্তের ব্যক্তিস্বাধীনতা নয়, জনগণের জানার অধিকারও জড়িত। সম্প্রতি ডেইলি স্টারের এক অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, জুলাই অভ্যুত্থানের এক বছরের বেশি সময় পরও অন্তত ২৯৬ জন সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যবস্থাপক হত্যা ও সহিংসতা-সম্পর্কিত মামলায় জড়িত। ২৭ জেলায় সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী অন্তত ১০১ জনের বিরুদ্ধে হত্যা, ২২ জনের বিরুদ্ধে হত্যা চেষ্টা, ১১২ জনের বিরুদ্ধে ভাঙচুর বা বিস্ফোরক-সম্পর্কিত অভিযোগ, এবং অন্তত ১৮ জন গ্রেপ্তাফতার হয়েছেন। সবচেয়ে অস্বস্তিকর অংশটা হলো— কোনও কোনও অভিযোগকারী বলেছেন, তারা তালিকাভুক্ত অনেক আসামিকে চেনেন না। কোথাও রাজনীতিক বা স্থানীয় লোকজন বা অন্যদের প্রভাবে অভিযোগপত্র তৈরি হয়েছে। ফলে প্রকৃত অপরাধী নির্ধারণও জটিল হয়েছে এবং নিহতদের ন্যায়বিচারও ঝুঁকিতে পড়েছে। সুতরাং, এমন পরিস্থিতিতে ‘ঢালাও আসামি’ কেবল অভিযুক্তের জন্য নয়, ভুক্তভোগীর পরিবারের জন্যও এক ধরনের অবিচার, কারণ এতে বিচারপ্রক্রিয়া আরও দুর্বল হয়, এবং সত্যিকারের দায়ীদের বিচারের পথও অস্পষ্ট হয়ে যায়।
এই দীর্ঘ আটকের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো, এটি স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বন্দিদের প্রতি অন্যায় আচরণের ঝুঁকি বাড়ায়। নির্যাতনবিরোধী কনভেনশন (সিএটি) বলছে, কোনও জরুরি অবস্থা বা রাজনৈতিক অস্থিরতাও নির্যাতনের অজুহাত হতে পারে না, রাষ্ট্রকে নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। আর নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস (ইউএন স্ট্যান্ডার্ট মিনিমাম রুলস) বন্দিদের মর্যাদা, স্বাস্থ্যসেবা, এবং অমানবিক আচরণ থেকে সুরক্ষার ন্যূনতম মান নির্ধারণ করে। যখন একজন মানুষ বছরের পর বছর ‘বিচারাধীন’ অবস্থায় জেলে থাকেন, তখন কারাগার-জীবনই এক ধরনের শাস্তি হয়ে ওঠে, যদিও আইন ও আন্তর্জাতিক নীতিমালা বলে, শাস্তি হওয়া উচিত কেবল দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরে।
পরিশেষে এতটুকুই বলবো, এটা শুধু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের গল্প নয়, আবার শুধু নির্বাচিত সরকারেরও আলাদা গল্প নয়। এটা আমাদের রাষ্ট্রীয় চর্চার ভেতরে ঢুকে পড়া এক ধরনের ‘স্বাভাবিকতা’, যেখানে মামলা-গ্রেফতার দ্রুত, কিন্তু তদন্ত-চার্জশিট-বিচার ধীর, যেখানে ‘অপরাধীকে শাস্তি’ আর ‘অভিযুক্তকে জেলে রাখা’, এই দুইয়ের পার্থক্য ঝাপসা হয়ে যায়। নির্বাচিত বিএনপি সরকার আসার পরও যদি আমরা একই ধরনের দীর্ঘসূত্রতা, বিচার বিলম্ব এবং কারাগারে দীর্ঘ অপেক্ষার বাস্তবতা দেখতে থাকি, তাহলে আমাদের বুঝতে হবে, সমস্যাটা আর ‘কোনও সরকার’ প্রশ্নে আটকে নেই, সমস্যাটা আমরা কোন ধরনের বিচারনীতি ও বিচার-সংস্কৃতি মেনে চলছি সেই জায়গায়। আমাদের মনে রাখা উচিত— আইনের শাসন কোনও পক্ষের সুবিধা নয়, এটি সবার নিরাপত্তা।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়