Image description

উম্মুল ওয়ারা সুইটি

বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে সফল কর্মসূচিগুলোর একটি হলো সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি—ইপিআই। এই কর্মসূচির হাত ধরেই একসময় হাম, পোলিও, ডিপথেরিয়া, টিটেনাসসহ বহু প্রাণঘাতী রোগ নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু আজ সেই অর্জনের ভিত্তিই যেন কেঁপে উঠছে। টিকা হাতে থাকলেও সিরিঞ্জ না থাকার মতো এক অবিশ্বাস্য বাস্তবতা আমাদের সামনে হাজির হয়েছে—যা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং একটি সম্ভাব্য জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের ইঙ্গিত।

বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বিশেষ করে গ্যাভি, দ্য ভ্যাকসিন এলায়েন্স ও ইউনিসেফ এর সহায়তায় পরিচালিত হয়েছে। এর ফলে টিকা সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং বিতরণ প্রক্রিয়া ছিল তুলনামূলকভাবে সুসংগঠিত। কিন্তু নীতিগত পরিবর্তন, প্রশাসনিক দ্বিধা এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় জটিলতা—এই তিনটি কারণ এখন পুরো ব্যবস্থাকে ধাক্কা দিয়েছে।

সরকার সরাসরি টিকা কিনবে, নাকি ইউনিসেফের মাধ্যমে—এই সিদ্ধান্তে দীর্ঘ সময় লেগেছে। ফলাফল—টিকার মজুত ফুরিয়ে যাওয়া, ক্যাম্পেইন পিছিয়ে যাওয়া, আর এরই মধ্যে মাঠে সংক্রমণের বিস্তার।

সমাজকালের একটা প্রতিবেদনে চোখ আটকে গেল। "পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হামের টিকা আছে, নেই সিরিঞ্জ"-এই শিরোনামের প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, টিকা হাতে এসেছে, কিন্তু সিরিঞ্জের অভাবে থমকে আছে জাতীয় ক্যাম্পেইন—এরই মধ্যে বাড়ছে হাম সংক্রমণের ঝুঁকি। টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নিতে দেরি, প্রশাসনিক জটিলতা আর প্রস্তুতির ঘাটতিতে দেশের টিকাদান কর্মসূচি এখন চাপে পড়েছে।

শুধু ক্ষমতার বদল দেখতে দেখতে মানুষ যখন ক্লান্ত। তখন আবার হামের সংক্রমণ। কে কার উপর দোষ চাপাবে।

 

সিরিঞ্জ সংকট: ছোট ভুল, বড় বিপদ

 

টিকা থাকা সত্ত্বেও সিরিঞ্জ না থাকা—এ যেন জাহাজ আছে কিন্তু নাবিক নেই। টিকাদান কার্যক্রমে সিরিঞ্জ একটি মৌলিক উপাদান। অথচ সেটির ঘাটতি প্রমাণ করে পরিকল্পনার ঘাটতি কতটা গভীর।এটি শুধু একটি সরবরাহ সমস্যাই নয়, বরং নীতিনির্ধারণের ব্যর্থতা। কারণ, টিকা সংগ্রহের পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় রেখে সিরিঞ্জ সংগ্রহ না করা মানে পুরো ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া।

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২–১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু এখনো টিকার আওতায় আসেনি, তাদের জন্য এটি মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।

বাংলাদেশে ইতোমধ্যে শত শত শিশু আক্রান্ত এবং বহু মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে শিশুদের ভিড় বাড়ছে, অনেক ক্ষেত্রে জটিলতা যেমন নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এমনকি মস্তিষ্কে প্রদাহও দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই সংক্রমণের অনেকটাই প্রতিরোধযোগ্য ছিল, যদি সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করা যেত।

গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্যকর্মীরা এখনো ঘরে ঘরে গিয়ে টিকা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। শহরে সিটি করপোরেশনের ভ্যাকসিনেটর ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার কর্মীরা দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় তাদের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

জাতীয় ক্যাম্পেইন, যা দ্রুত সময়ে লাখ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার সবচেয়ে কার্যকর উপায়—তা পিছিয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

দায় এড়ানোর সুযোগ নেই সরকারের। নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব, এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমঝোতায় দেরি—এসব মিলিয়ে একটি ‘সিস্টেমিক ফেইলিউর’ তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের মতো সংবেদনশীল জায়গায় এমন দোলাচল অগ্রহণযোগ্য। কারণ, এখানে প্রতিটি বিলম্ব মানে একটি শিশুর জীবন ঝুঁকিতে পড়া।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব, তবে তাৎক্ষণিক ও সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া নয়—জরুরি ভিত্তিতে সিরিঞ্জ সংগ্রহ ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

জাতীয় টিকাদান ক্যাম্পেইন দ্রুত চালু করতে হবে

সংক্রমিত এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি বাড়াতে হবে। টিকার বাইরে থাকা শিশুদের শনাক্ত করে দ্রুত আওতায় আনতে হবে।জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে।

বাংলাদেশ একসময় টিকাদান কর্মসূচিতে বিশ্বের জন্য উদাহরণ ছিল। সেই অর্জনকে হারাতে বসা শুধু স্বাস্থ্য খাতের ব্যর্থতা নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক উন্নয়ন ধারার জন্যও একটি বড় হুমকি।

শিশুর হাতে টিকা পৌঁছানো কোনো দয়া নয়—এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে সামান্য গাফিলতি যদি শত শত শিশুর জীবন কেড়ে নেয়, তবে তার দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।

এখনই সময়—সিদ্ধান্ত নেওয়ার, দায়িত্ব নেওয়ার, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—শিশুদের বাঁচানোর।