Image description

 অদিতি করিম

সেনাসমর্থিত এক-এগারোর অন্যতম কুশীলব ও ক্ষমতাধর সমন্বয়ক হিসেবে পরিচিত সাবেক আলোচিত সেনা কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত সোমবার (২৩ মার্চ) গভীর রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার নিজ বাসা থেকে তাকে আটক করা হয়।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী হত্যা মামলাসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি ছিলেন। তার বিরুদ্ধে বর্তমানে পাঁচটি মামলা রয়েছে।

এ ছাড়া মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটে জড়িত থাকা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

 

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সময় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এক-এগারোর সেই পট পরিবর্তনে তিনি অন্যতম প্রধান ষড়যন্ত্রকারী ও কুশীলব হিসেবে ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হন এবং ‘গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র সমন্বয়কের দায়িত্ব পান।

তার নেতৃত্বাধীন এই কমিটির অধীনেই তৎকালীন সময়ে দেশজুড়ে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে দেশ বিনাশী তৎপরতা শুরু হয়।

২০০৮ সালের জুনে মঈন-ফখরুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাই কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে পাঠায়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরও তাকে সরিয়ে না দিয়ে বরং তিন দফায় তার চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। ফলে ২০১১ সালের জুন পর্যন্ত তিনি সেই গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক দায়িত্বে বহাল ছিলেন।

সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি ঢাকায় রেস্তোরাঁসহ একাধিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হন।

২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী নাটকীয়ভাবে রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ফেনী-৩ (সোনাগাজী ও দাগনভূঞা) আসন থেকে প্রার্থী হতে তিনি প্রথমে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র কিনে জমা দিয়েছিলেন। তবে তার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় তিনি জাতীয় পার্টির ফরম কেনেন এবং এর পরদিনই সরাসরি জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য পদ লাভ করেন। পরবর্তীতে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত ও পাতানো নির্বাচনে টানা দুবার তিনি একই আসন থেকে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন।

মাসুদ উদ্দিনের গ্রেপ্তার বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি টার্নিং পয়েন্ট। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক-এগারো বিরাজনীতিকীকরণের কালো অধ্যায় হিসেবে পরিচিত।

 

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে সুশীল সমাজের একটি অংশ, সেনাবাহিনীর কিছু শীর্ষ কর্মকর্তা মিলে বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিল। এই ষড়যন্ত্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল, বাংলাদেশের গণতন্ত্র এবং উন্নয়নকে চিরতরে ধ্বংস করা। তৎকালীন সেনাপ্রধান মঈন উ আহমেদ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে এই সরকারের প্রধান কাজ ছিল বাংলাদেশের জনগণের অধিকার হরণ করা। দেশকে পিছিয়ে দেওয়া।

এই সরকার ক্ষমতা দখলের পর থেকেই রাজনৈতিক নেতাদের ওপর নেমে আসে জুলুম এবং নির্যাতন। এই সরকারের তাত্ত্বিক ভিত্তি দিয়েছিল দেশের প্রভাবশালী ও শীর্ষস্থানীয় দুটি সংবাদপত্র। ‘‘সুশীল সমাজের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত এই সংবাদপত্র দুটি মাইনাস ফর্মুলার তত্ব প্রবর্তন করে।” দুই নেত্রীকে সরে যেতেই হবে- শিরোনামে সম্পাদকীয়র মাধ্যমে তারা তৎকালীন সরকারকে বিরাজনীতিকীকরণের পথ দেখায়। এই সময়ে একের পর এক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে গ্রেপ্তার করে মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে তাদের চরিত্রহননের নীলনকশা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে। দেশকে রাজনীতি শূন্য করে, বিদেশি তাঁবেদার রাষ্ট্র বানানোই ছিল মঈন-ফখরুদ্দীন সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

আর সেই লক্ষ্যে, এক-এগারোর সরকার বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নেত্রীকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে। শুধু তাই নয়, দেশকে নেতৃত্ব শূন্য করতে আজকের প্রধানমন্ত্রী ও বেগম জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানকে মিথ্যা অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করে অমানবিক নির্যাতন করা হয়। এক-এগারোর দেশবিরোধী সরকার বাংলাদেশে দেশপ্রেমিক, জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তিকে নিঃশেষ করতে চেয়েছিল। এ কারণেই বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমানকেও বিনা অপরাধে গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করে। এই সময় সংস্কার প্রস্তাবের নামে বিএনপি ভাঙারও ষড়যন্ত্র হয়েছিল।

এক-এগারো সরকার শুধু রাজনীতিবিদদের নয়, বেসরকারি খাতের স্বনামধন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও শুরু করে ষড়যন্ত্র। এক-এগারো সরকারের দ্বিতীয় এজেন্ডা ছিল অর্থনীতি ধ্বংস করা। দেশ পরনির্ভর, বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীল করা। যেন দাতাদের ক্রীতদাস হয়ে চলতে আমরা বাধ্য হই। বাংলাদেশে যেসব দেশপ্রেমিক ব্যবসায়ী-শিল্পোদ্যোক্তা কোটি মানুষের কর্মসংস্থান করেন, তাদের হয়রানি করা, নানা রকম মিথ্যা মামলা, মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে তাদের ইমেজ নষ্ট করাই ছিল এক-এগারো কুশীলবদের অন্যতম মিশন। এক-এগারোতে আমরা দেখেছি বিভিন্ন বড় বড় ব্যবসায়ী-শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মনগড়া, ভিত্তিহীন, বানোয়াট সংবাদ প্রকাশ করে কিছু সংবাদপত্র, যারা এক-এগারো কুশীলবদের এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী ছিল। প্রকৃত দুর্নীতিবাজদের আড়াল করে অর্থনীতি ধ্বংসের ষড়যন্ত্র এক-এগারোর আবিষ্কার। সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজ হিসেবে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এবং উদ্যোক্তাদের তথাকথিত তালিকা প্রকাশ করে তাদের সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা করা হয়। অবৈধভাবে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয়। প্রায় ষোলশত কোটি টাকা বেআইনিভাবে আদায় করে বেসরকারি খাতের মেরুদণ্ড ভেঙে ফেলা হয়েছিল এক-এগারোর সময়। পরবর্তীতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত এক-এগারোর সময় এই অর্থ আদায় অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়। কিন্তু ওই রায় ঘোষণার পরও আজ পর্যন্ত সেই টাকা ব্যবসায়ীদের ফেরত দেওয়া হয়নি।

এক-এগারো ছিল আসলে বাংলাদেশ বিরোধী চক্রান্ত। এই চক্রান্তের অন্যতম খল নায়ক ছিলেন মাসুদ উদ্দিন। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে মাসুদ দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করেছিলেন। দীর্ঘ ১৯ বছর পর মাসুদ উদ্দিনের গ্রেপ্তার তাই এই ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচনের জন্য একটি বড় পদক্ষেপ। তবে শুধু মাসুদ উদ্দিন একা নয়, এক-এগারো ষড়যন্ত্রের আরও অনেক কুশীলব রয়েছেন। যারা দেশে এবং বিদেশে অবস্থান করছেন। সেই সময় সেনা গোয়েন্দা সংস্থার দুজন কর্মকর্তার নাম সবাই জানে। ব্রিগেডিয়ার বারী এবং জেনারেল আমিন উদ্দিন (যিনি বিহারি আমিন নামে পরিচিত) সেসময় প্রচণ্ড ক্ষমতাবান ছিলেন। তারা ছিলেন মাসুদ উদ্দিনের একান্ত অনুগত। এই দুজনই রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অসত্য, ভিত্তিহীন অভিযোগ তৈরি করত, এক-এগারোর সমর্থক হিসেবে পরিচিত দুটি সংবাদপত্রে তা প্রকাশ করে পরিস্থিতি সৃষ্টি করে তাদের গ্রেপ্তার করত। ওই দুই পত্রিকার একজন সম্পাদক স্বীকার করেছেন যে, সেনা গোয়েন্দা সংস্থা পরিবেশিত রিপোর্ট তিনি যাচাইবাছাই ছাড়াই প্রকাশ করেছেন। এই সংবাদপত্র দুটির সম্পাদকরাও এক-এগারোর কুশীলব। বাংলাদেশের সুশীল সমাজের বেশ কয়েকজন প্রতিনিধি আছেন, যারা এক-এগারোর পক্ষে ওকালতি করেছেন। তাদের সেই সময় সরব দেখা গেছে। এদের অনেকেই ড. ইউনূস সরকারের আমলে ভোল পাল্টে আবারও ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছিলেন। বিভিন্ন সংস্কার কমিটিতে যুক্ত হয়ে তারা ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করেছিলেন।

মাসুদ উদ্দিনের গ্রেপ্তার বন্ধ দরজা খোলার মতো। এই গ্রেপ্তারের পথ ধরে এক-এগারোর সব ষড়যন্ত্রকারীকে চিহ্নিত করা দরকার। সব কুশীলবের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। বাংলাদেশে যেন ভবিষ্যতে আর কখনো এ রকম দেশবিরোধী অসাংবিধানিক কাজ করার কেউ সাহস না পায়, সেজন্য এক-এগারো নিয়ে একটি তদন্ত কমিশন গঠন এখন সময়ের দাবি। সেই কমিশন সব ষড়যন্ত্রকারীর মুখোশ উন্মোচন করবে। এক-এগারোর সময় যারা নির্যাতিত হয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার হয়ে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের বাস্তবায়ন ঘটিয়ে ব?্যবসায়ীদের কাছ থেকে অবৈধভাবে আদায় করা অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে এখনই। মাসুদ উদ্দিনের গ্রেপ্তার নিঃসন্দেহে একটি ভালো ও সাহসী সিদ্ধান্ত। বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু এখানেই যেন তৎপরতা শেষ না হয়। মঈন উদ্দিন, ফখরুদ্দীনসহ এক-এগারোর সব কুশীলবকে আইনের আওতায় আনতে পারলেই ভবিষ্যতে অবৈধ ক্ষমতা দখলের পথ চিরতরে বন্ধ হবে।

অদিতি করিম : লেখক ও নাট্যকার

সৌজন্যে: বাংলাদেশ প্রতিদিন