Image description
পাহাড়ে অর্থের প্রলোভনে মিশনারির ধর্মান্তরের মচ্ছব
‘তখন আমার বয়স ১১-১২ বছর। আমার বাবা কঠিন রোগে আক্রান্ত। হাসপাতালে ভর্তি করানোর মত আর্থিক সামর্থ্য আমার পরিবারের ছিল না। একদিন আমার দূরবর্তী এক আত্মীয় এসে বললেন, আমি এক হাসপাতালে চাকরি করি। তোমার বাবাকে সেখানে ভর্তি করে দাও। টাকা-পয়সা নিয়ে দুশ্চিন্তা করো না। যা হোক তার কথামতো বাবাকে সেখানে ভর্তি করা হলো। তার আয়ু শেষ হয়ে যাওয়ায় তিনি আর সুস্থ হয়ে উঠলেন না। বরং হাসপাতালে নেয়ার প্রায় দুই মাস পর মারা গেলেন। হাসপাতালের চার্জ এল প্রায় ৩২ হাজার টাকা। কর্তৃপক্ষ বলল, সমস্যা নেই। তবে তোমরা প্রতি সপ্তাহে এখানে অন্তত একবার করে আসবে। এরপর প্রতি সপ্তাহে আমরা সেখান যেতাম। আমরা গেলে তারা আমাদের হাসপাতালের পেছনের দিকে নিয়ে যেত। সেখানে এক এলাহি কারবার। একটি বিরাট গির্জা। বাইরে থেকে কল্পনাই করা যায় না এখানে এত সুন্দর গির্জা থাকতে পারে। এভাবে তাদের সাথে আমাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়তে লাগল। তারা আমাদের বিভিন্ন উপহার-উপঢৌকন দিত। একপর্যায়ে তারা আমাদের কুরআন খুলে ওইসব আয়াত দেখাতে লাগলো, যেখান যিশুখ্রিস্টের (হজরত ঈসা আ.) বিভিন্ন আলোচনা রয়েছে। তার বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনা বিবৃত হয়েছে। এভাবে তারা আমাদের বোঝাতে লাগলো, খ্রিস্টধর্মই প্রভুর একমাত্র মনোনীত ধর্ম। কারণ বর্তমানে মুসলমানরা নানা প্রান্তে লাঞ্ছিত, অপদস্থ, অন্যদিকে খ্রিস্টানদের জয় জয়কার। ধীরে ধীরে তারা আমাদের খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের আমন্ত্রণ জানায়। আমার মা, ভাইবোন সবাই ছিলাম গ-মূর্খ। আমরা তাদের ধর্ম গ্রহণ করে খ্রিস্টান হয়ে যাই। একবার নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসতে চাইলে তারা বলল, তোমাদের ওপর কত টাকার ঋণ আছে, স্মরণ রেখো। এছাড়াও আমরা আমাদের ধর্মে ফিরে যেতে চাইলে বিভিন্ন হুমকি ধমকি দিয়ে থাকে। এভাবেই চলছে আমাদের পরিবার।’ নিজ পরিবারের ধর্মান্তরিত হওয়ার কাহিনি বলছিলেন রাঙামাটির বাসিন্দা ক্যামেরুন। তার পূর্বনাম রবিউল হক। এনজিওর ফাঁদে পড়ে মুসলমান থেকে খ্রিস্টান হয়েছে তার পুরো পরিবার। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা শত শত এনজিও এবং বিভিন্ন মিশনারি সংস্থা মানবসেবার মহান ব্রতের ছদ্মাবরণে সাধারণ জনগণকে বিভিন্ন কৌশলে ধর্মান্তরিত করার কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। ষোলো কোটি জনসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ ছোট একটি দেশ, বাংলাদেশ। দারিদ্র্য, অশিক্ষা প্রভৃতি দেশটাকে খ্রিস্টান মিশনারিদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। বাংলাদেশে কর্মতৎপর এনজিওর সংখ্যা বর্তমানে ৩০ হাজার। বাংলাদেশে প্রতি বর্গমাইলে ৩.৫টা বিদেশি এনজিও রয়েছে। মিশনারির স্বর্গরাজ্য বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকাকে ঘিরে এনজিও এবং আন্তর্জাতিক খ্রিস্টান লবি ভিনদেশি সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও ধর্মপ্রচারের লক্ষে সুদীর্ঘকালব্যাপী নানামুখী ষড়যন্ত্র চালিয়ে আসছে। চিকিৎসা, সমাজসেবা ও মানবসেবার ছদ্মাবরণে তারা মূলত পার্বত্য এলাকার দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীকে ইউরোপীয় জীবনাচার ও দর্শনের দিকে আকৃষ্ট করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। স্কুল প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, হাসপাতাল স্থাপন, ঋণ প্রদান, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, দারিদ্র্য বিমোচন, কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট ও নারীর ক্ষমতায়ন প্রভৃতি মুখরোচক কর্মসূচির আড়ালে রয়েছে এদেশে ইউরোপীয় সংস্কৃতি ও খ্রিস্টান ধর্ম প্রচার করার নীলনকশার বাস্তবায়ন। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকায় প্রায় ৪৫টি ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর বসবাস। শতবছর ধরে বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত হয়ে ২০ লাখ মানুষ ক্রমাগত প্রান্তীয় পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, চরম দারিদ্র্য, ক্ষুধা, অনাহার, মৃত্যু, মহামারি, অপুষ্টি ও স্যানিটেশেন সমস্যা তাদের নিত্যসঙ্গী। খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাসস্থান এই পাঁচটি মৌলিক মানবাধিকার থেকে তারা সম্পূর্ণ বঞ্চিত। এ ব্যাপারে রাখাইন ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মি. উসিথ মং বলেন, রাখাইনরা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী হিসেবে এই অঞ্চলে আদিম অধিবাসী। প্রায় ৩৩ শতাংশ রাখাইন এখন ভূমিহীন আর গত ৩৫ বছরে পটুয়াখালীতে প্রায় ৯০ শতাংশ রাখাইনকে নিজভূমি থেকে উচ্ছেদ হতে হয়েছে। আদমশুমারি ১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংখ্যা ১০ লাখ ৫ হাজার ৩৬২ জন। তবে বর্তমানে তা ১৬ লাখের কাছাকাছি পৌঁছেছে। অধিকাংশ চাকমা ও মারমা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, টিপরা অধিবাসীরা হিন্দুধর্মের আর মিজো বম ও থেয়াং খ্রিস্টান। কিছু কিছু গোত্র আত্মা, প্রাণী ও উদ্ভিদের পূজারী। (বাংলাপিডিয়া, ৫/৩৭১,২) সাধারণভাবে এসব ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী এবং বিশেষভাবে ‘পাহাড়িরা অত্যন্ত কষ্টে আছে’, ‘মানুষ করার জন্য নানামুখী সহযোগিতা প্রয়োজন’, তাদের পৃথক সত্তা ও নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষা নিশ্চিত করতে হবে ইত্যাদি বক্তব্য দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও প্রচুর শোনা যায়। এর সূত্র ধরে বিদেশি ফান্ড দ্বারা পরিপুষ্ট ঝাঁকে ঝাঁকে এনজিও এখন তিন পার্বত্য জেলায় সক্রিয় রয়েছে। কিন্তু এতদিনে পরিষ্কার হয়ে গেছে, আর্তমানবতার সেবার আড়ালে এসব এনজিওর বেশিরভাগই আসলে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে ধর্মান্তরিত করার কাজে আদাজল খেয়ে নেমেছে। সরকারি হিসাব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২০ বছরে সেখান ১২ হাজার ২শ উপজাতি পরিবার খ্রিস্টান হয়েছে। বিভিন্ন গোয়েন্দাসংস্থার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তৈরি করা প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা থেকে তৈরি করা এ প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়েছে, স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এনজিওগুলোর কর্মকা- তদারকি করা প্রয়োজন, যাতে এনজিওগুলো মানুষের আর্তসামাজিক দুরবস্থার সুযোগে ধর্মান্তরের কাজ চালাতে না পারে। ধর্মান্তরিত হওয়ার বিষয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে খ্রিস্টধর্মের দ্রুত বিকাশ ঘটায় এখানে উপজাতিদের সংস্কৃতি, সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি এবং ঐতিহ্য ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছে। প্রতিবেদনে সেবার নামে উপজাতিদের খ্রিস্টান বানানোর অপতৎপরতায় লিপ্ত এনজিওগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের বিষয়ে ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। খ্রিস্টান বানাতে তৎপর বিভিন্ন এনজিও তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটিতে বর্তমানে ১৯৪টি গির্জা উপজাতিদের ধর্মান্তরিত করে খ্রিস্টান বানানোর ক্ষেত্র মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। এ গির্জাগুলোকে কেন্দ্র করে দেশি বিদেশি এনজিও এবং অন্যান্য সংস্থা তাদের সব তৎপরতা চালায়। এনজিওগুলোর মাঝে খাগড়াছড়িতে রয়েছে ক্রিশ্চিয়ান ফ্যামিলি ডেভেলপমেন্ট অব বাংলাদেশ (সিএফডিবি), বাংলাদেশ ব্যাপ্টিস্ট চার্চ ফেলোশিপ, খাগড়াছড়ি জেলা ব্যাপ্টিস্ট চার্চ ফেলোশিপ, ক্রিশ্চিয়ান সম্মেলনকেন্দ্র খাগড়াছড়ি, সাধু মোহনের পল্লী, বাংলাদেশ ইউনাইটেড ক্রিশ্চিয়ান অ্যাসোসিয়েশন, ক্রাউন ব্যাপ্টিস্ট চার্চ ইত্যাদি। খাগড়াছড়ি জেলায় গির্জা রয়েছে ৭৩টি। ১৯৯২ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এ জেলায় ৪ হাজার ৩১টি পরিবার খ্রিস্টান হয়েছে। সরকারি একটি প্রতিবেদনে বান্দরবান জেলা বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, জেলায় ১১৭টি গির্জা রয়েছে। এখানে খ্রিস্টধর্ম বিস্তারে কাজ করছে ক্রিশ্চিয়ান কমিশন ফর ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ (সিসিডিবি), গ্রাম উন্নয়ন সংগঠন (গ্রাউস), কারিতাস বাংলাদেশ, অ্যাডভেন্টিস চার্চ অব বাংলাদেশ, ইভেনজেলিক্যাল ক্রিশ্চিয়ান চার্চ ইত্যাদি। ১৯৯২ সাল থেকে ২০১০ পর্যন্ত এ সংগঠনগুলো বান্দরবানে ৬ হাজার ৪৮০টি উপজাতি পরিবারকে খ্রিস্টান পরিবারে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে। রাঙামাটিতে ক্যাথলিক মিশন চার্চ, রাঙামাটি হোমল্যান্ড ব্যাপ্টিস্ট চার্চ ও রাঙামাটি ব্যাপ্টিস্ট চার্চ প্রায় ১ হাজার ৬৯০ উপজাতি পরিবারকে খ্রিস্টান পরিবারে পরিণত করেছে। এগুলো তুলনামূলকভাবে হাল আমলের হিসাব। পাহাড়ি যেসব জনগোষ্ঠীর লোকসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম, তাদের প্রায় শতভাগ খ্রিস্টান হয়ে গেছে অনেক আগেই। বাংলার বুকে একখ- ইউরোপ পাহাড়িদের সংস্কৃতি অটুট রাখার জন্য কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জনকারী পশ্চিমাগোষ্ঠীর মদদে ধর্মান্তরকরণে উপজাতিদের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ বিপন্ন। সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়ে যাচ্ছে। এভাবে স্পর্শকাতর এলাকায় ডেমোগ্রাফির নাটকীয় পরিবর্তন মেনে নেয়া যায় না। ব্রিটিশ রাজশক্তি পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে বিভাজন রেখা টেনে দিয়েছিল, যাতে পরস্পরে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। মিশনারিরা চন্দ্রঘোনা, মালুমঘাট, ময়মনসিংহ, রংপুর ও রাজশাহীসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে হাসপাতাল ও মাতৃসদন প্রতিষ্ঠা করে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে খ্রিস্টধর্ম ও তাদের সংস্কৃতির প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে। বাংলাদেশে কর্মতৎপর এনজিওর সংখ্যা ৩০ হাজার। বহুজাতিক কোম্পানির আর্তরাজনৈতিক স্বার্থে এবং অসহায়, নিঃস্ব, নিরক্ষর মানুষকে সেবা করার আড়ালে ইউরোপীয় সংস্কৃতি ও খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করার তৎপরতায় বহু এনজিও ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। এদের বাজেটের ৯০ শতাংশ অর্থ খ্রিস্টানদের বা খ্রিস্টান হওয়ার সম্ভাবনাময় ব্যক্তিদের স্বার্থে, নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিদেশি কনসালটেন্টের পেছনে ব্যয় হয়। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার সাজেক ইউনিয়নটি সীমান্তবর্তী ও দুর্গম, যা বাংলাদেশের কোনো কোনো জেলার সমান। নৈসর্গিক সৌন্দর্যম-িত এই উপত্যকায় পৌঁছতে খাগড়াছড়ি বা রাঙামাটি শহর থেকে দুদিন লাগে। এই ইউনিয়নের বিশটি গ্রামে খেয়াং, বম, পাংখু, লুসাই উপজাতির ১০ হাজার মানুষের বাস। ২০ বছর আগেও এখানে খ্রিস্টধর্মের নামগন্ধ ছিল না। উপজাতিদের ভাষা, সংস্কৃতি সবই ছিল। আজ তার কিছুই নেই। শুধু ইংরেজিতে কথা বলাই নয়, সেখানকার অধিবাসীরা গিটার বাজিয়ে ইংরেজি গান করে। মেয়েরা পরে প্যান্ট-শার্ট স্কার্ট। তাদের দেখে মনে হয় ‘বাংলার বুকে একখ- ইউরোপ’। কারণ এখন তারা সবাই খ্রিস্টান। দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় খ্রিস্টানরা অনেক কৌশল ও টাকা ব্যয়ে ধর্মান্তরিত করে চলেছে। পাংখু উপজাতি পুরোপুরি খ্রিস্টান হয়ে গেছে। বদলে গেছে তাদের ভাষা, এমনকি বর্ণও ইংরেজি। এনজিওর নাম ধারণ করে খ্রিস্টানরা এই দুর্গম এলাকায় হাসপাতাল, বিনোদনকেন্দ্র, গির্জা ইত্যাদি গড়ে তুলেছে। বাইবেল ও গির্জা বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির অরণ্যে বসবাসরত চাকমা, মারমা, মুরুং, টিপরা, খাসিয়া, মনিপুরী, লুসাই, মগ, গারো প্রভৃতি উপজাতির মধ্যে খ্রিস্টসংস্কৃতি ও ধর্মের অনুপ্রবেশ জীবনধারায় এনেছে আমূল পরিবর্তন। ‘প্রতিটি মানুষের জন্য একটি বাইবেল এবং প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর জন্য একটি গির্জা’ এ স্লোগানকে সামনে রেখে তারা লক্ষ্যপানে ছুটে চলেছে। ১৯৩৯ সালে বাংলাদেশে খ্রিস্টান ছিল ৫০ হাজার। ১৯৯২ সালে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০ লাখে, ২০১২ সালে দাঁড়ানোর কথা এক কোটিতে। ১৮৮১ সনে বাংলাদেশে প্রতি ৬০০০ মানুষে একজন খ্রিস্টান ছিল। ১৯০১ সালে ১০০০ মানুষে একজন, ১৯৮২ সালে ৩২৬ জনে একজন, ১৯৯০ সালে ২৯ জনে একজন, ১৯৯২ সালে ২২ জনে একজন, ২০০০ সালে তা এসে দাঁড়ায় ১১ জনে একজন। ২০১৫তে তাদের লক্ষ্য হলো প্রতি ৩ জনে একজন। সেভেন সিস্টার নামে খ্যাত মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, হিমাচল, অরুণাচল প্রভৃতি ভারতীয় রাজ্যের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এখন ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান। ওইসব পাহাড়ি অঞ্চলসংলগ্ন বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকায় উল্লেখযোগ্য হারে খ্রিস্টানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, খ্রিস্টান অধ্যুষিত ইউরোপীয় দাতাগোষ্ঠী ও এনজিওরা পার্বত্য চট্টগ্রামকে টার্গেট করে এগোচ্ছে। প্রায় দুবছর স্থগিত থাকার পর ইউএনডিপি এই বছর রাঙামাটি, বিলাইছড়ি, বান্দরবান ও থানচিতে ২০ লাখ মার্কিন ডলারের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা উন্নয়নের নামে দেদারসে বৈদশিক অর্থের দ্বারা নবদীক্ষিত খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসনের কাজে লিপ্ত। যেভাবে ধর্মান্তরিত করা হয় ধর্মান্তরিতকরণে তাদের পলিসি বড়ই ন্যাক্কারজনক। ১৯৬৫ সালে কক্সবাজার জেলায় মালুমঘাটে মিশনারিরা খ্রিস্টান মেমোরিয়াল হাসপাতাল স্থাপন করে। সে সময়কার সরকার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে মিশনারি কাজে অংশ না নেয়ার ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রধান উৎ. ঠরমড় ই. অষংবহ এ কথায় কর্ণপাত না করে মিশনারি কাজ চালাতে থাকে। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর তাদের কার্যক্রম আরো বাড়িয়ে দেয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এক রিপোর্টে বলা হয়, এই হাসপাতাল ১০ হাজার যুবককে (শিশু ও পোষ্যসহ মোট ৪০ হাজার) খ্রিস্টান বানিয়েছে। পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব নব্যখ্রিস্টানদের চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন স্থানে সংস্থাপন করা হয়। দৈনিক ইনকিলাব মার্চ ১৩, ১৯৯৩ স্থানীয় লোকদের বাধা ও সমালোচনা এড়ানোর জন্য নব্যখ্রিস্টানদের এভাবে বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দেয়া হয়। মালুমঘাট হাসপাতালে যে জঘন্য উপায়ে অসহায় জনগণকে খ্রিস্টান বানানো হয়, তার বিবরণ নিম্নরূপ। ১. প্রথমে রোগীকে খুব নিম্নমানের অষুধ দিয়ে মুহাম্মদের নাম নিয়ে খেতে বলা হয় (হিন্দুদের ক্ষেত্রে রামকৃঞ্চের নাম)। এতে যখন রোগ নিরাময় না হয়, তখন উচ্চমানের অষুধ দিয়ে মূর্খরোগীদের যিশুর নামে অষুধ খেতে বলা হয়। সঠিক অষুধ সেবনের ফলে রোগ যখন ভালো হয়ে যায়, তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দেয়, যিশুই তাকে রোগমুক্তি দান করেছেন। ২. যিশু যেহেতু রোগমুক্তি দান করেছেন, সেহেতু তিনিই তোমাদের বেহেশত দিতে সক্ষম, কাজেই তার ওপর বিশ্বাসস্থাপনপূর্বক তার ধর্মকেও গ্রহণ করো। ৩. মুহাম্মদ খুব দুর্ভাগা এবং তার অনুসারীরাও খুব গরিব। ধনী হতে চাইলে খ্রিস্টান হও, যিশু তোমাকে ধনী বানিয়ে দিবে। ৪. ‘মরণে নেহি ভয়’ বইয়ে বলা হয়েছে, বাইবেলের তুলনায় কুরআন অতি নিকৃষ্ট। মুহাম্মদের শিক্ষায় জীবনের জন্য কিছুই নেই। তার অনুসারীরা চোর, বাটপার ও বদমায়েশ। ৫. তারা নার্স, বাগান পরিচর্যাকারী প্রভৃতি লোকদের খ্রিস্টান হওয়ার ব্যাপারে চাপ প্রয়োগ করে। অনিচ্ছুক লোকদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। ৬. নগদ টাকা, ফ্রি অষুধ, চাকরি প্রভৃতির প্রলোভন দেখিয়ে তারা খ্রিস্টান বানায়। মাওলানা রহিমুল্লাহ, বান্দরবানের স্থানীয় বাসিন্দা ও একটি মসজিদের ইমাম। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ধর্মান্তর করা হয় কীভাবে? তিনি জানালেন, পার্বত্য অঞ্চলে বিভিন্ন মিশনারি দল পাঠিয়ে, বইপত্র, আর্টিকেল ছাপিয়ে যেগুলো ইসলাম সম্পর্কে বিভ্রান্তি ও সন্দেহ ছড়ায়, ইসলামকে বিশ্ববাসীর সম্মুখে হেয়-প্রতিপন্ন করে, চিকিৎসা, স্কুল, কলেজ ও ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে (ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো এ ব্যাপারে অনেক ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে), নাস্তিকতা ছড়ানো এবং মিডিয়ার মাধ্যমে ধর্মান্তরিত করা হয়। তিনি নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এভাবে, আমার এক সাথী রফিক, প্রাইমারিতে একসাথে পড়েছি। এরপর সে খ্রিস্টান মিশনারিদের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি হয়। ৫-৬ বছর পর তার সাথে দেখা, তখন জানলাম, তার নাম এখন হোয়াইট। অর্থাৎ সে খ্রিস্টান হয়ে গেছে। এভাবে আমাদের বাড়ির এক রাখাল ছিল মারমা। সে খ্রিস্টান মিশনারিদের একটি হাসপাতালে সেবক হিসেবে যোগ দেয় । ২-৩ বছর পর দেখি, সেও খ্রিস্টান হয়ে গেছে। এভাবে অনেক মুসলমান এবং উপজাতি খ্রিস্টানদের প্ররোচনায় পড়ে খ্রিস্টান হয়ে যাচ্ছে। তিনি আরো জানান, আমার এক বন্ধু মিজান, সে চাকমা থেকে মুসলমান হয়ে গেলে তার ওপর এনজিওরা পাগলা কুকুরের মত ক্ষেপে যায় এবং তাকে অনেক হুমকি ধমকি দেয়। শেষপর্যন্ত সে ওই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। উত্তরণ কোন পথে? আফসোসের সাথে বলতে হয়, এনজিওরা যেভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে ধর্মান্তকরণের কাজ চালাচ্ছে, বিভিন্ন সেবার আড়ালে খ্রিস্ট ধর্মের প্রচার চালাচ্ছে, সে হিসেবে বলতে গেলে মুসলিম এনজিও একেবারে পিছিয়ে। সাতসমুদ্র তেরো নদীর ওপার থেকে তারা এসে যদি আদিবাসীদের মাঝে খ্রিস্টানধর্ম ও সংস্কৃতি প্রচার করতে পারে, তাহলে এত কাছের হয়েও আমরা মুসলমানরা কেন ইসলামধর্ম ও সংস্কৃতি প্রচার না করে বসে আছেÑ এমন প্রশ্ন অনেকের মনেই। প্রায় ২২বছর পূর্বে আল জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়া চট্টগ্রামের সাবেক প্রধান পরিচালক আলহাজ মাওলানা ইউনুছ রহ. কাপ্তাইয়ের অদূরে সুখবিলাস ও বান্দরবান সদরে দুটি ১০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক দাতব্য হাসপাতাল ও বিভিন্ন ইসলামি মিশনারি সেন্টার প্রতিষ্ঠা করে পার্বত্য জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসা প্রদানের সূচনা করেছিলেন, তা যথেষ্ট ফল দিয়েছে। ভারতের প্রসিদ্ধ আলেম সাইয়েদ আসআদ মাদানি রহ. ১৯৯৬ সনে বাংলাদেশের আলেমদের খ্রিস্টান মিশনারিদের ব্যাপারে সতর্ক থাকার জোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের মিশনারির কর্মকা- সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশিষ্ট গবেষক ও অধ্যাপক ড. আফম খালেদ হোসেন বলেন, আসলে দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতার কারণেই পার্বত্য অঞ্চলে ধর্মান্তকরণ আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারা বিভিন্ন উপজাতিকে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করছে। সেবার আড়ালে তারা ধর্মপ্রচার করে বেড়াচ্ছে। এ জন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে। এ অঞ্চলে মুসলমানদের কার্যক্রম বাড়াতে হবে। তিনি আরো বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে হাসপাতাল, বিভিন্ন সেবামূলক মিশনারি গড়ে তোলার মাধ্যমে সেই ভয়ঙ্কর করাল থাবাকে থামাতে হবে, যা দিয়ে খ্রিস্টান মিশনারিগুলো এদেশের শিকড়ে আঁচড় দিতে চায়। দীর্ঘদিন ধরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে দাওয়াতের কাজ করে আসছেন ইসালামিক দাওয়াহ ইনসটিটিউটের পরিচালক মাওলানা যোবায়ের। তার কাছে পার্বত্য অঞ্চলে কাজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আসলে খ্রিস্টানরা বিভিন্ন লক্ষ্য উদ্দেশ্য সামনে রেখে তাদের মিশনারি কর্মকা- চালিয়ে যায়। যেমন খ্রিস্টধর্মালম্বীদের ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের মুসলিম হওয়া থেকে বিরত রাখা, মুসলিমদের ইসলামের গ-ি থেকে বের করে আনা, ইসলামের বিভিন্ন মৌলিক বিষয়ে সন্দেহর সৃষ্টি করা, মুসলমানদের ঐক্য বিনষ্ট করা, মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের বৃহদাংশে খ্রিস্টান বানানো, তাদের সেখানে অনুপ্রবেশ করানো, ইসলামের শিক্ষা দীক্ষার চেয়ে খ্রিস্টধর্মের শিক্ষা দীক্ষাকে প্রিয় করে তোলা এবং পশ্চিমের উন্নতি খ্রিস্টধর্মের কল্যাণেইÑ এ ধারণা বদ্ধমূল করা ইত্যাদি। তাদের ধর্ম ভ্রান্ত এবং অসার হওয়া সত্ত্বেও তারা কত উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে তাদের ধর্ম প্রচার-প্রসারে কাজ করে, সে তুলনায় আমরা একেবারে পিছিয়ে। আমাদের স্বতন্ত্র কোনো দাওয়াতের গ্রুপ নেই, অর্থকড়ি নেই, অথচ খ্রিস্টানদের হাজার হাজার ধর্মজাযক বিশ্বের নানা প্রান্তে খ্রিস্টধর্মের প্রচারে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে মাওলানা যোবায়ের ওইসব অঞ্চলে দাওয়াতের ওপর বেশি গুরুত্বারোপ করেন। দাওয়াতের মাধ্যমে ইসলাম ধর্মের স্বরূপ জনসাধারণের সামনে তুলে ধরতে হবে। দলমত নির্বিশেষে পাহাড়ি অঞ্চলে কাজ করতে উদ্যোগী করতে হবে। কাপ্তাইয়ের অদূরে সুখবিলাসে হজরত হাজী ইউনুস রহ. প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক মিশনারি সেন্টারে (মারকাযুদ দাওয়াতুল ইসলামিয়া) দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত রয়েছেন মাওলানা নাসিরুদ্দিন। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, বাঙালি উপজাতিরা কেমন আছেন? তিনি বললেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রহমান এবং এরশাদের আমলে মোটামুটি ভাল ছিল। তবে বর্তমান মহাজোট সরকার আসার পর বাঙালিদের ব্যবসা-বাণিজ্য করতে একটি টিকেটের প্রয়োজন, যাতে দিতে হয় অনেক ট্যাক্স। সুখবিলাস হাসপাতালের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হাসপাতাল আর মিশনারি একই সাথে আছে। হাসপাতালের নাম শারজাহ হাসপাতাল-২ (শারজাহ হাসপাতাল-১ এর অবস্থান সম্ভবত সোমালিয়ায়)। এই হাসপাতালে আউটডোর এবং ইনডোর উভয় বিভাগ রয়েছে। আউটডোরে সাধারণ ও জটিল রোগীদের ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী প্রাথমিক চিকিৎসার পর ফ্রি অষুধপত্র দেয়া হয়। ইনডোরে পুরুষ ও মহিলা বেড উভয়টি রয়েছে। পুরুষদের জন্য ১২ বেড ও মহিলাদের জন্য ১২ বেড, সর্বমোট ২৪ বেড রয়েছে। এখানেও সম্পূর্ণ ফ্রি চিকিৎসা দেয়া হয়। সামগ্রিকভাবে শীতকালে রোগীর সংখ্যা কম থাকে এবং গ্রীষ্মকালে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। প্রতিদিন প্রায় ৭০-৮০ জন রোগী এখানে চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন। নিয়মিত ৪ জন ডাক্তার এখানে সেবা প্রদান করেন। শারজাহ হাসপাতাল থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে চন্দ্রঘোনায় খ্রিস্টান মিশনারিদের একটি হাসপাতাল রয়েছে। সেখানকার সেবা অবশ্যই আমাদের চেয়ে উন্নত। আমরাও চেষ্টা করি সর্বোচ্চ সেবা দিতে। ফ্রি সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে আয়ের উৎস কোথায়? জানতে চাইলে তিনি বলেন, নাম থেকেই অনুধাবন করা যায়, এটি আরব আমিরাতের দানশীল ভাইদের অর্থে পরিচালিত। আপনাদের মিশনারি সেন্টার কেমন চলছে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে জামাতে পাঞ্জুম পর্যন্ত (৫ম শ্রেণি) মাদরাসা আর ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষা দেয়া হয়। আরো বিভিন্ন মকতব প্রতিষ্ঠা এবং সেবামূলক কর্মসূচি আমরা হাতে নিয়েছি, যেগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে ইনশাআল্লাহ! ধর্মান্তর, খ্রিস্টান রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠাসহ অন্যান্য ভয়াবহ পরিস্থিতির এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জনসাধারণের বিশেষ করে মুসলমানদের দাওয়াতি ও সেবার ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে বাস্তব কর্মসূচি হাতে নেয়ার তাগিদ দেন পার্বত্য অঞ্চল বিশ্লেষকরা।