দেশে এমনিতেই গ্যাস সংকট চলছে। চাহিদা মোতাবেক কখনো গ্যাস সরবরাহ ঠিক থাকছে না। তারমধ্যে এখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে। দেশের চাহিদা মেটাতে এলএনজি বা রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করতে হয় বিদেশ থেকে। এলএনজি বাজারে কাতার বড় সরবরাহকারী দেশ। বৈশ্বিক রপ্তানি বাজারের প্রায় ২০ শতাংশ তারাই সরবরাহ করে। ইরানের ড্রোন হামলার পর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন স্থগিত করেছে কাতার এনার্জি। ফলে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলো এই পরিস্থিতির বড় ভুক্তভোগী হতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী বিডি রহমতউল্লাহ এই বিষয়ে মানবজমিনকে বলেন, যুদ্ধ অবশ্যই সংকট বাড়াবে। এই যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হলে এলএনজি বা রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারে দাম বাড়বে। নতুন স্পট মার্কেটে দাম বাড়বে। সরবরাহে ঠিক না থাকলে গ্যাসে আরও ভোগান্তি বাড়বে গ্রাহকদের।
সূত্র মতে, দেশে দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এখন সরবরাহ করা হচ্ছে ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে বিদেশ থেকে এলএনজি থেকে আসছে ৯৫ কোটি ঘনফুট। গ্রীষ্ম মৌসুম সামনে রেখে আমদানি বাড়িয়ে ১০৫ কোটি ঘনফুট করার কথা রয়েছে। আমদানি বাড়ানো না গেলে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো যাবে না। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে লোডশেডিং তৈরি হতে পারে। পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমবে। এতে রান্নায়ও ভোগান্তি হতে পারে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) বলছে, এ বছর ১১৫টি কার্গো (জাহাজ) এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে ৪০টি ও ওমান থেকে ১৬টি কার্গো আসার কথা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রায় এক দশক ধরে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বছরে প্রায় ৫ শতাংশ হারে কমছে এবং এখন তা জাতীয় চাহিদার অর্ধেকও মেটাতে পারছে না। প্রতিদিনের ঘাটতি ১ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটেরও বেশি। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ১০৯টি এলএনজি চালান কিনেছে, এতে খরচ হয়েছে ৩৮৮ কোটি ডলার। তেল আমদানির বার্ষিক বিল দাঁড়িয়েছে ৬১০ কোটি ডলারে। এলপিজি আমদানিতে আরও ১২০-১৪০ কোটি ডলার খরচ হয়। মোট বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের প্রায় ১০ শতাংশ এখন জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হচ্ছে।
একইসঙ্গে আমদানির উৎস এবং বাণিজ্যপথও ঝুঁকিপূর্ণ। কাতারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বছরে ৪০ কার্গো এলএনজি আসে, যার পুরোটাই হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশে আসে। একই পথ দিয়ে সৌদি আরামকো ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের এডিএনওসি থেকে অপরিশোধিত তেল আসে। ওমানের ওকিউ ট্রেডিং উপসাগরীয় বন্দর থেকে এলএনজি ও অপরিশোধিত তেলজাতীয় পণ্য সরবরাহ করছে। বাংলাদেশ উপসাগরীয় উৎপাদকদের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসায়িক অংশীদারদের কাছ থেকে স্পট মার্কেটেও এলএনজি কেনে। হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন ঘটলে শুধু দামই বাড়ে না, চালানও বন্ধ হয়ে যায়।
দেশের বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের চাহিদা প্রতিদিন ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট, কিন্তু সরবরাহ সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিদিন মাত্র ৮৫০-৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এ হারে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে উৎপাদনে ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি দেখা দিতে পারে। আপৎকালীন জ্বালানি মজুত সক্ষমতা সীমিত হওয়ার কারণে যেকোনো বাহ্যিক ধাক্কাই সরাসরি বিদ্যুৎ ঘাটতি তৈরি করে জ্বালানি নিরাপত্তা বিপন্ন করতে পারে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, আমাদের মার্চ মাস পর্যন্ত এলএনজিতে কোনো সমস্যা নেই। এখন আমরা এপ্রিল নিয়ে পরিকল্পনা করছি। তিনি বলেন, এ মাসে ৯টি জাহাজ আসার কথা রয়েছে। ইতিমধ্যে ৫টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। বাকি ৪টি জাহাজ অন্য দেশ থেকে আসবে। এরমধ্যে অস্ট্রেলিয়া ও অ্যাংগুলা থেকে আসবে। তিনি বলেন, এরমধ্যে ২টি জাহাজ স্পট মার্কেট থেকে কিনা হয়েছে। তিনি বলেন, এখন দৈনিক চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বিপরীতে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই পরিচালক আরও জানান, যুদ্ধের কারণে বাজারে তো প্রভাব পড়বেই। তবে দামের প্রভাব ভোক্তার ওপর পড়বে না বলে জানান তিনি। কারণ সরকার দাম বাড়াবে না। তিনি বলেন, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সরবরাহে বিঘ্নের আশঙ্কা রয়েছে।