Image description

চট্টগ্রাম বন্দরে টানা ৬ দিনের কর্মবিরতিতে সৃষ্ট অচলাবস্থা নিরসনে কথা বলতে এসে তোপের মুখে পড়েছেন নৌপরিবহণ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। বৃহস্পতিবার বন্দরের ৪ নম্বর ফটকের বাইরে এলে শ্রমিক-কর্মচারীরা তার গাড়ি ঘিরে স্লোগান দেন। এছাড়া বন্দর ভবনে প্রবেশের সময়ও তারা গাড়ি আটকে বিক্ষোভ করেন। সেই সঙ্গে তারা বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামানের অপসারণও দাবি করেন। এদিকে বিকালে আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসে উপদেষ্টা তাদের দাবির কথা শোনেন এবং এ বিষয়ে ঢাকায় ফিরে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্তের আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে তিনি কর্মবিরতি প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। এ পরিপ্রেক্ষিতে শুক্র ও শনিবার দুই দিন কর্মবিরতি স্থগিতের ঘোষণা দেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। শনিবারের মধ্যে ইতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত না পেলে রোববার থেকে আবারও তারা কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন।

চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম খোকন বৈঠক শেষে উপদেষ্টার অনুরোধ ও আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে শুক্র ও শনিবার কর্মবিরতি স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে বলে যুগান্তরকে জানান। এর আগে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের ভেতরে বেলা ১১টার দিকে উপদেষ্টা হেঁটে ঢোকার সময় ‘ডিপি ওয়ার্ল্ডের দালালেরা, হুঁশিয়ার সাবধান’, ‘গো ব্যাক অ্যাডভাইজার, গো ব্যাক’, ‘গো ব্যাক ডিপি ওয়ার্ল্ড’, ‘মা-মাটি-মোহনা, বিদেশিদের দেব না’-এ ধরনের স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় অনেকে উপদেষ্টার গাড়ির সামনে গিয়ে ভুয়া ভুয়া, দালাল দালাল বলেও স্লোগান দেন। নৌপরিবহণ উপদেষ্টা চট্টগ্রাম বন্দরে আসার খবর পেয়ে সকাল থেকেই আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীরা অবস্থান নেন। শত শত শ্রমিক-কর্মচারী চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের অদূরে ৪ নম্বর জেটি গেট থেকে কাস্টমস মোড়সহ আশপাশের এলাকায় অবস্থান নেন। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বন্দরের নিজস্ব নিরাপত্তারক্ষীরা সকাল থেকেই অন্যান্য দিনের চেয়ে কঠোর অবস্থানে ছিলেন। উপদেষ্টার গাড়িবহর কাস্টমস মোড়ে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীরা জড়ো হন।

তারা স্লোগান দিতে দিতে গাড়িবহর আটকে দেন। প্রায় ১৫ মিনিট আটকে থাকার পর পুলিশ চারপাশে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে গাড়িগুলোকে বন্দর ভবনের ভেতরে নিয়ে যায়। গাড়ি মূল ফটক দিয়ে বন্দর ভবনে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই নিরাপত্তারক্ষীরা সেটি বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু শতাধিক শ্রমিক-কর্মচারী স্লোগান দিতে দিতে ভেতরে ঢুকে পড়েন। পরে নৌ উপদেষ্টা গাড়ি থেকে নেমে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ও বন্দরের নৌ বিভাগের কর্মচারী মো. ইব্রাহিম খোকন উপদেষ্টার কাছে বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামানের অপসারণ দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘গত দেড় বছরে আমাদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে। দেখা করতে গেলে দেখা পাই না। এ চেয়ারম্যানকে আর আমরা চাই না।’ জবাবে উপদেষ্টা আন্দোলনকারীদের জানান, তিনি শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসবেন। সেই সঙ্গে চেয়ারম্যানের এ পদে থাকা-না-থাকার বিষয়টিও বিবেচনা করবেন বলেও আশ্বাস দেন। এরপর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কনফারেন্স রুমে তিনি জরুরি বৈঠকে যোগ দেন।

বৈঠক শেষে ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত বলেন, ‘এখানে যা ঘটছে, সব এখান থেকেই হচ্ছে, বিষয়টা এমন না। এখানে অনেকের ইন্ধন রয়েছে, আমি মনে করি। সব বিষয়ে ফিরে গিয়ে আলোচনা করব। আশা করি, কাল (আজ) সকালে যেভাবেই হোক পোর্ট সচল হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তিনটি মিটিং করেছি। এর মধ্যে দুটি জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও ইসলামিক শ্রমিক সংঘের সঙ্গে। তাদের কথা শুনেছি, আমার বক্তব্য দিয়েছি। যেগুলো আমার মধ্যে আছে বলেছি, যেগুলো আমার বাইরে, সেগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলব। এখনো মিটিং শেষ হয়নি, এখান থেকে ফিরে ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে কথা বলব।’

উপদেষ্টা বলেন, ‘সবাইকে অনুরোধ করেছি, আপনারা আন্দোলন করেন অসুবিধা নেই। কিন্তু রোজার আগে এ ধরনের আন্দোলন যেখানে পোর্ট বন্ধ করে রাখা, অত্যন্ত অমানবিক। এটা করা ঠিক হয়নি। আপনাদের যে বক্তব্য, সেটা পোর্ট বন্ধ না করেও হতে পারত।’

তিনি বলেন, ‘আমি তাদের বলেছি, আমি নোট করেছি, এটা আমার সিদ্ধান্ত না, আমি জানাব। এও বলেছি, আমি যতদূর দেখেছি, জাতীয় স্বার্থ বাদ দিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত এ সরকার নেবে না, ওতে আমার মত থাকবে না। কিন্তু পোর্ট বন্ধ রাখার এখতিয়ার কারও নেই। আজ এভিয়েশন ফুয়েল আটকে আছে, এতে এভিয়েশনে কী অবস্থা হচ্ছে ভাবুন। এখন ভাটার সময়, এখন অর্থাৎ তিনটার পর আর জাহাজ আনা যায় না। এরপরও আমরা চেষ্টা করছি, জাহাজ আনার। বলেছি, যদি কেউ বাধা দেয়, সরকার হার্ডলাইনে যেতে বাধ্য হবে। সেটা যেন না হয়, সে অনুরোধ করেছি।’

এদিকে কর্মবিরতির কারণে বৃহস্পতিবারও বন্দরের তিনটি প্রধান টার্মিনাল জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) এবং নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ ছিল। এদিন সকাল থেকে বন্দরের বিভিন্ন ফটকে অবস্থান নিয়ে কর্মকর্তাদের ভেতরে প্রবেশে বাধা দেন আন্দোলনকারীরা। ফলে অপারেশনাল কার্যক্রমে যুক্ত কর্মকর্তারাও টার্মিনালে ঢুকতে পারেননি। সকাল থেকে বন্দর দিয়ে কোনো কনটেইনার বন্দরে প্রবেশ করেনি, জাহাজীকরণও হয়নি, পণ্য ডেলিভারিও বরাবরের মতো বন্ধ ছিল। এতে পতেঙ্গায় বেসরকারি টার্মিনাল পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে।

আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এসসিটি ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ, আন্দোলন দমাতে হয়রানি, দমন-পীড়ন বন্ধের দাবিতে শনিবার থেকে টানা ৬ দিন এ আন্দোলন চলছে। প্রথম তিন দিন ৮ ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালনের পর মঙ্গলবার থেকে আন্দোলনকারীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি শুরু করেন। আন্দোলনের কারণে অন্তত ৮ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি পণ্য আটকা পড়েছে বেসরকারি আইসিডি বা অফডকগুলোয়।

সন্ধ্যা ৬টায় এই রিপোর্ট লেখার সময় উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনে উপায় বের করতে উপদেষ্টা বোট ক্লাবে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করছিলেন।