ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সুরির মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনাটি নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য ও পরিস্থিতি বিবেচনায় ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড—এ বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনসহ তদন্তের ফলাফল জানা জরুরি। যদি এটি হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এর পেছনে সম্ভাব্য মোটিভ কী? কারা তাঁকে হত্যা করতে চাইতে পারে? এমন আরও অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
ইতালীয় মাফিয়াদের অপরাধজগতের একটি বহুল আলোচিত কৌশল ছিল—কোনো ব্যক্তি তাদের স্বার্থবিরোধী তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার আশঙ্কা থাকলে তাকে হত্যা করা হতো। তবে তার আগেই তথ্য ফাঁস হয়ে গেলে তারা প্রতিশোধ নেওয়ার পরিবর্তে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া বা ড্যামেজ কন্ট্রোলে মনোযোগ দিত। কারণ, প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নিজেদের ব্যবসা ও নেটওয়ার্ককে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অধিকতর ঝুঁকির মুখে ফেলার কোনো অর্থ হয় না। গোয়েন্দা ও গুপ্তচরবৃত্তির জগতেও এ ধরনের প্রবণতা দেখা যায়।
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফের একটি পডকাস্ট এবং কয়েকটি সূত্র থেকে জানতে পেরেছি, তাঁর কাছে এমন কিছু তথ্য ছিল, যা প্রকাশিত হলে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিপাকে পড়তে পারে।
শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও প্রকাশের ঘটনার সঙ্গে তাহসিফের নাম জড়িত ছিল। ধারণা করা হয়, এ ঘটনার জেরেই তাঁকে বিমানবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়ে থাকতে পারে।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, সে সময় আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘বিমান বাহিনীতে র-এর নেটওয়ার্ক ফাঁস’। ওই প্রতিবেদনে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফের ছবিও প্রকাশিত হয়েছিল, যদিও তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। এই প্রতিবেদন ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়ে থাকলেও, শুধু এ ঘটনা থেকে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ ছিল না শুধু সন্দেহের বশে তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে বলে আমার মনে হয়।
কেউ কেউ ঘটনাটিকে হানিট্র্যাপ কিংবা প্রতিশোধের ফল হিসেবে দেখছেন। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, যদি এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকে, তাহলে তাহসিফের জানা কোনো সংবেদনশীল তথ্যের প্রকাশ ঠেকানো এর সম্ভাব্য মোটিভগুলোর একটি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমার সন্দেহের কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র (RAW)।
তবে আমার ধারণা, এটি নিছক প্রতিশোধের ঘটনা নয়। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিশোধ নিতে গিয়ে একজন অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্টকে হত্যা করে আন্তর্জাতিক বা দেশীয় গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা তাদের স্বার্থের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হওয়ার কথা নয়। এর সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফের কাছে থাকা তথ্যের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি ছিল। সেই তথ্য প্রকাশিত হলে বাংলাদেশে তাদের চলমান কার্যক্রম ও স্বার্থ আরও সংকটের মুখে পড়তে পারত—এমন আশঙ্কা থেকেই তাঁকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
আমি জানি না, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ কোনো রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন কি না। তবে অবসর-পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যমে তাঁর উপস্থিতি এবং তাঁর কোর্সমেট ও বন্ধুদের বক্তব্য থেকে তাঁর দেশপ্রেমিক পরিচয়ের কথাই সামনে এসেছে। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, তাঁর জীবনের ওপর যে হুমকি ছিল, তা সে হয়তো উপলব্ধি করতে পারেননি। অথবা বাংলাদেশে অবস্থানকালে কোনো বিদেশি শক্তির পক্ষ থেকে এমন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন—এমনটি হয়তো তিনি কল্পনাও করেননি।
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, সম্ভাব্য মোটিভ এবং এর পেছনে কারও সংশ্লিষ্টতা থাকলে সেই পরিচয়—সবকিছুই নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে উদ্ঘাটিত হওয়া উচিত।
আল্লাহ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফকে ক্ষমা করুন, তাঁর ভুলত্রুটি মার্জনা করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।
পুনশ্চ: একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার বক্তব্য থেকে বিষয়টি নিয়ে আরও কিছু উদ্বেগের কথা জানতে পেরেছি। তাঁর ভাষ্যমতে—
“আওয়ামী লীগের আমলে আমরা জানতাম, কোন ভারতীয় নাগরিক র-এর সঙ্গে যুক্ত এবং কোন বাংলাদেশি নাগরিক তাদের দালাল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এ ধরনের তৎপরতা অনেক কমে গিয়েছিল, কিন্তু গত চার-পাঁচ মাসে আবার বেড়েছে। নতুন সেটআপটি এখনো আমাদের চোখের আড়ালে রয়েছে, তবে তাদের অবস্থান টের পাচ্ছি। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভেতরে র-এর স্লিপার এজেন্টরা এখনো রয়ে গেছে। তোমার জন্য উপদেশ হচ্ছে, এখনো বাংলাদেশে আসার পরিকল্পনা কোরো না। বিএনপি সরকার তোমার জন্য হুমকি নয়, তবে র এখনো তোমার জন্য হুমকি।”
আমার প্রত্যাশা, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় সব সম্ভাব্য দিক বিবেচনায় নিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত করে প্রকৃত সত্য জাতির সামনে তুলে ধরা হবে।