Image description

ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্ত দিয়ে অবাধে ঢুকছে বিভিন্ন ধরনের মাদক। সীমান্তের ১০টি পয়েন্ট দিয়ে দেশে প্রবেশের পর এসব মাদক ছড়িয়ে পড়ছে শহর থেকে গ্রামে। বিজিবির পাহারা ও অভিযান চললেও থামছে না মাদকের চোরাচালান। মাঝেমধ্যে বাহকরা আটক হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে মূল কারবারিরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাঁটাতারবিহীন সীমান্ত, নজরদারির ঘাটতি ও প্রভাবশালীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে সক্রিয় রয়েছে মাদক পাচারের চক্র। ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন এবং বিভিন্ন ধরনের নেশাজাতীয় সিরাপ তরুণদের একটি অংশের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। মাদকাসক্তির কারণে পারিবারিক অশান্তি, পড়াশোনায় অনিয়ম এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, মহেশপুর উপজেলার ৭০ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকায় নেই কাঁটাতারের বেড়া। সীমান্তের এই অংশসহ বিভিন্ন পয়েন্ট ব্যবহার করে মাদক আনা হচ্ছে। মাটিলা, যাদবপুর, শ্যামকুড়, সামন্তা, বাঘাডাঙ্গা, পৈলানপুর, লড়াইঘাট, খোসালপুর, নতুনপাড়া ও বেনীপুর এলাকায় মাদক চোরাচালানের কথা জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয় বাসিন্দা সাজ্জাদ হোসেন ও রমজান শেখের ভাষায়, বাঘাডাঙ্গাসহ বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে মানুষ পারাপারের পাশাপাশি মাদকও আনা-নেওয়া হয়। তাদের দাবি, সীমান্তের দৈর্ঘ্যের তুলনায় বিজিবির সদস্যসংখ্যা কম হওয়ায় সব এলাকায় সমানভাবে নজরদারি করা কঠিন।

কাজীরবেড় ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার জহির উদ্দিনও মনে করেন, সীমান্তে বিজিবির জনবল বাড়ানো গেলে চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি সম্ভব।

বিজিবির তথ্য বলছে, গত এক বছরে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ৩৬ জনকে আটক করা হয়েছে। এ সময় জব্দ করা হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি টাকার মাদকদ্রব্য।

৫৮ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. রফিকুল আলমের ভাষ্য, সীমান্তে মাদক কারবারিদের আটক করা হচ্ছে। মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের ধরতে বিজিবি তৎপর রয়েছে। মাদক নিয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। গত এক বছরে প্রায় ১৫ কোটি টাকার মাদকদ্রব্যসহ ৩৬ জনকে আটক করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন জানিয়েছেন, সীমান্তের যেসব এলাকায় কাঁটাতার নেই, সেখানে বিজিবির সঙ্গে জেলা প্রশাসনও মনিটরিং করছে। মাদক প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়াতেও কাজ করছেন তারা। মাদকাসক্তির প্রভাব পড়ছে পরিবারেও। এক অভিভাবকের ভাষ্য, মাদকের টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সন্তান তাকে আঘাত করে। এ ঘটনায় তিনি একাধিকবার পুলিশের সহায়তা নিয়েছেন। তবে তাতেও পরিস্থিতির স্থায়ী পরিবর্তন হয়নি।

শিক্ষার্থী রাব্বি হোসেন ও বাপ্পী মজুমদারের আশঙ্কা, পরিবারের নজরদারির অভাব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়মিত উপস্থিতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ বন্ধুমহলে মেলামেশা কিছু তরুণকে মাদকের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাদের মতে, শুধু শাস্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

পুলিশের দাবি, মাদক নিয়ন্ত্রণে অভিযান ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাসানের ভাষায়, ঝিনাইদহ সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় প্রতিবেশী দেশ থেকে মাদক প্রবেশ ঠেকানো একটি চ্যালেঞ্জ। সীমান্তের কিছু এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া না থাকাও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ডোপ টেস্টের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৩০০ জনের পরীক্ষায় মাদক গ্রহণের প্রমাণ পাওয়ার পর তাদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।

জেলা পরিষদের প্রশাসক এম এ মজিদ সাহেদ আহমেদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, মাদক ব্যবসা বা সংশ্লিষ্ট অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান বা শাস্তি যথেষ্ট নয়। মাদকের উৎস ও সরবরাহ ব্যবস্থা শনাক্ত করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো, পরিবারকে সহায়তা দেওয়া এবং চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা জোরদার করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন চিকিৎসকরা।

ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন মো. কামরুজ্জামানের ভাষ্য, সীমান্তপথে ফেনসিডিলের পরিবর্তে বিভিন্ন ধরনের নিষিদ্ধ নেশাজাতীয় সিরাপ আসার অভিযোগ রয়েছে। মাদক গ্রহণের ফলে কিডনি, হৃদরোগ, রক্তস্বল্পতাসহ বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।