রেল যোগাযোগের সার্বিক উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতের সম্প্রসারণ চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে একসময় যেসব জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল, তার একটি বড় অংশে এখন গড়ে উঠছে মার্কেট, বহুতল ভবনসহ নানা বাণিজ্যিক স্থাপনা। কোথাও গুরুত্বপূর্ণ নগর পরিবহনকেন্দ্র নির্মাণের মহাপরিকল্পনা, কোথাও সম্ভাব্য রেলপথ সম্প্রসারণের সুযোগ, কিংবা কোথাও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণের তাগিদ—এসব মৌলিক বিবেচনাকে উপেক্ষা করেই জমি বাণিজ্যিক ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, যা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে (কর্মচারী) কল্যাণ ট্রাস্টের নাম। রেলওয়ের জমি ব্যবহারের বিধান সংশোধনের পর ট্রাস্টের অবকাঠামো নির্মাণের সুযোগ তৈরি হয়। এরপর বিভিন্ন এলাকায় রেলভূমিতে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ সামনে আসে। এতে সরকারি সম্পত্তির দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা, ভবিষ্যৎ রেল উন্নয়ন এবং নগর পরিকল্পনার সঙ্গে জমি ব্যবহারের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিধান সংশোধনের পর বাণিজ্যিক স্থাপনার সুযোগ: ২০২১ সালের ২ নভেম্বর রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ভূমি শাখা বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রকৌশল কোড-১৯৬২-এর ৮১৩(এ) ধারায় দুটি উপধারা যুক্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। সংশোধিত বিধানে নির্দিষ্ট শর্তে কল্যাণ ট্রাস্টকে লিজ নেওয়া জমিতে অবকাঠামো নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর ২০২২ সালের ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশ রেলওয়ে ভূ-ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২০ সংশোধন করা হয়। সংশোধনের মাধ্যমে ৩৮(ক) উপ-অনুচ্ছেদে একসনা লাইসেন্সের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি লাইসেন্সের বিধান যুক্ত হয়। এই পরিবর্তনের ফলে রেলওয়ের ভূমিতে ট্রাস্টের অবকাঠামো নির্মাণের সুযোগ সম্প্রসারিত হয়। কিন্তু সরকারি প্রয়োজনে অধিগ্রহণ করা জমিতে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ ব্যবহার কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সে প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন। কারণ, কোনো জমি বর্তমানে অব্যবহৃত থাকলেও ভবিষ্যতে সেটি রেললাইন, স্টেশন, ইয়ার্ড কিংবা যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের অবকাঠামো নির্মাণে প্রয়োজন হতে পারে। সেখানে স্থায়ী স্থাপনা গড়ে উঠলে জমি পুনরুদ্ধার, স্থাপনা অপসারণ এবং নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
পরিবহন হাবের জমিতে বিপণিবিতান: নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশনের পশ্চিম পাশের জমিটি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই জমিতে মাল্টিমোডাল পরিবহন হাব নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ড্যাপ এবং আরএসটিপি ২০২২-২০৩৫-এ রেল, সড়ক ও নৌপথের যাতায়াত সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এমন একটি সম্ভাবনাময় স্থানে কল্যাণ ট্রাস্টের উদ্যোগে বিপণিবিতান নির্মাণ শুরু হয়, যা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রায় তিনতলা পর্যন্ত নির্মাণের পর বর্তমানে বিপণিবিতানের কাজ বন্ধ রয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কদমরসুল সেতু প্রকল্পের বিষয়টিও। শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সড়ক প্রশস্ত করতে রেলওয়ের জমির একটি অংশ প্রয়োজন হতে পারে। ফলে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের সিদ্ধান্ত বৃহত্তর যোগাযোগ পরিকল্পনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
খিলক্ষেতে হোটেল, জলাধার নিয়ে উদ্বেগ: রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায় রেলওয়ের জমিতে পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণের অনুমোদন নিয়েও আপত্তি রয়েছে। এর আগে কুড়িল এলাকায় পাঁচ একর জমিতে হোটেল নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের জন্য সেই উদ্যোগ থেকে সরে এসে পরে খিলক্ষেতের একটি জলাধার এলাকায় এক একর জমি বরাদ্দ দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
স্থানীয় নাগরিক সমাজ ও সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধিদের আশঙ্কা, জলাধার এলাকায় হোটেল নির্মাণ হলে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে জমির মালিকানা রেলওয়ের হলেও প্রকল্পের প্রভাব শুধু রেলওয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; আশপাশের পরিবেশ ও নগর ব্যবস্থাপনাও এর সঙ্গে জড়িত।
খিলক্ষেতের বাসিন্দা আব্দুল হালিম সরকার বলেন, রেললাইনের প্রয়োজনে তার পূর্বসূরিদের কাছ থেকে জমি নেওয়া হয়েছিল। রেলের প্রয়োজন না থাকলে জমি ফেরত দেওয়া বা সরকারি মালিকানায় রাখার ব্যবস্থা করা উচিত। লিজের মাধ্যমে অন্য কাউকে জমির দখল দেওয়া অনুচিত।
চট্টগ্রামে রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণ পরিকল্পনার প্রশ্ন: চট্টগ্রামের হালিশহর সিএসডি গোডাউনসংলগ্ন ৫ দশমিক ৩৭ একর জমি কল্যাণ ট্রাস্টের নামে লিজ নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, জমিটি বহিরাগতদের ভাড়া দেওয়ার ফলে সেখানে বস্তির মতো পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সেখানে কৃষি লাইসেন্স নিয়ে দোকান নির্মাণ করে বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে রেল যোগাযোগ এবং ভারতের আসাম ও আগরতলা অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের সম্ভাবনা বিবেচনায় সিজিপিওয়াই ইয়ার্ড সম্প্রসারণে জমিটি কাজে লাগানো যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের মত। সে ক্ষেত্রে জমিটির বর্তমান ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ রেল পরিকল্পনা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম রেলস্টেশনসংলগ্ন জমি নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। ২০০১ সালে তৎকালীন যোগাযোগ সচিব সৈয়দ রেজাউল হায়াতের পরিদর্শন প্রতিবেদনে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। সে ক্ষেত্রে স্টেশনটিকে হাব হিসেবে গড়ে তুলতে আশপাশের জমি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে। এরপরও স্টেশনের পে অ্যান্ড ক্যাশ অফিসের পূর্ব পাশে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের অনুমোদন প্রায় চূড়ান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এসব স্থাপনা ভবিষ্যতে স্টেশন সম্প্রসারণ এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-ঘুমধুম রেলপথের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। চকরিয়া, মহেশখালী ও মাতারবাড়ী পর্যন্ত রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
রেলভূমিতে স্থাপনা, বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র: লালমনিরহাটের গোশালা বাজারে রেলের জমিতে তিনতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। রাজশাহী রেলস্টেশন থেকে নওহাটা রেলগেট পর্যন্ত এলাকায় রয়েছে দ্বিতল ভবন। খুলনা, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, ভৈরব বাজার ও চট্টগ্রাম স্টেশনসংলগ্ন জমিতেও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের তথ্য রয়েছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের পেছনে একটি মানবাধিকার সংস্থার দখলে থাকা জমি লিজ নিয়ে অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগের কথাও জানা গেছে। সচিবালয়ের কাছাকাছি এ জমির ভবিষ্যৎ সরকারি ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও কল্যাণ ট্রাস্টকে লিজ দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানের তথ্য পাওয়া গেছে।
রেলওয়ের কয়েকজন কর্মচারীর অভিযোগ, সেমিপাকা বা টিনশেড স্থাপনার শর্তে একসনা লাইসেন্স দেওয়া হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থায়ী বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। তাদের দাবি, এসব জমির ব্যবহার ও লাইসেন্সের শর্ত যাচাই করে দেখা প্রয়োজন। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প ও জমির নথি ধরে পৃথকভাবে যাচাই জরুরি।
৬১ হাজার একর সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা: রেলওয়ের হিসাব অনুযায়ী, সংস্থাটির মোট সম্পত্তি ৬১ হাজার ৪৫১ একর। এর মধ্যে ২৫ হাজার ৮৩ একর জমি লিজ দেওয়া হয়েছে। অব্যবহৃত রয়েছে ৮ হাজার ৬৬১ একর এবং অবৈধ দখলে রয়েছে ৩ হাজার ২৫ একর। তবে কল্যাণ ট্রাস্টের নামে মোট কত একর জমি লিজ দেওয়া হয়েছে, তার নির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের আইন ও ভূমি অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মো. শহিদুল ইসলাম ভূঞা কালবেলাকে বলেন, বিধান সংশোধনের সময় তারা দায়িত্বে ছিলেন না। তাই সংশোধনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তার পক্ষে বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়। তবে অন্তর্বর্তী ও বর্তমান সরকারের সময়ে কল্যাণ ট্রাস্টকে নতুন করে জমি লিজ দেওয়া হয়নি বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, অতীতের বকেয়া পরিশোধ না করায় ট্রাস্ট নিয়ম অনুযায়ী নতুন করে লিজ পাওয়ার যোগ্য হয়নি।
বিতর্কিত বিধান পুনর্বিবেচনার বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে। উপজেলা পর্যায়ে মডেল মসজিদ নির্মাণের জন্য জমি পাওয়া যাচ্ছিল না বলে কোড সংশোধন করা হয়েছিল। সেই সংশোধনের মধ্যেই কল্যাণ ট্রাস্টের অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়টি যুক্ত হয়।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমেদ কালবেলাকে বলেন, কোনো সংস্থার জমির প্রয়োজন না থাকলে জেলা প্রশাসক তা পুনরায় গ্রহণ করতে পারেন। রেলওয়ে পৃথক মন্ত্রণালয়ের অধীন হওয়ায় তাদের নিজস্ব বিধিবিধান থাকতে পারে। তবে নীতিমালা সংশোধনের আগে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল কি না, তা তিনি জানেন না।
রেলওয়ে কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ও রেলওয়ের মহাপরিচালক প্রকৌশলী আফজাল হোসেন এবং ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও রেলওয়ের যুগ্ম মহাপরিচালক সাদরুল হক এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) মো. সুবক্তগীন বলেন, আমি নতুন দায়িত্বে এসেছি। এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।
রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, রেলওয়ের দখল হওয়া জায়গা চিহ্নিত করে দখলমুক্ত করা হবে। গত মঙ্গলবার সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা পরিদর্শন শেষে তিনি জানান, রেলের জমি প্রথমে রেলের প্রয়োজনে, পরে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে ব্যবহার করা হবে। এ সময় কারখানায় কোচ মেরামতের মান বাড়ানো, দক্ষ কারিগর নিয়োগ, পুরোনো যন্ত্রাংশ উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করা এবং রেলওয়ে হাসপাতালগুলো যৌথ ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।