Image description

রাজধানীতে সিএনজিচালিত বাসেও ডিজেলচালিত বাসের সমান ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। জ্বালানি হিসেবে গ্যাস ব্যবহার করেও যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের ক্ষেত্রে ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে পরিবহনকর্মীদের বাগিবতণ্ডা হচ্ছে। যাত্রীদের প্রশ্ন, জ্বালানির খরচ কম হলে ভাড়ায় তার প্রতিফলন থাকবে না কেন?

যাত্রীদের অভিযোগ, বাসে কী ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করা হচ্ছে, তা বিবেচনায় না নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। প্রতিবাদ করেও অনেকে সময়ের তাগিদে শেষ পর্যন্ত দাবি করা ভাড়া দিতে বাধ্য হন।

সিএনজির বাসে ডিজেলের ভাড়া, ১০ টাকার যাত্রায় ১৫ টাকা :রাজধানীর নতুনবাজার থেকে রামপুরা ব্রিজ পর্যন্ত রাইদা এন্টারপ্রাইজের একটি বাসে যাতায়াত করেন বেসরকারি চাকরিজীবী আশরাফুল ইসলাম। তিনি জানান, আগে এ পথে ভাড়া ছিল ১০ টাকা। সম্প্রতি বাসের কন্ডাক্টর তার কাছ থেকে ১৫ টাকা নেন। পরে চালকের আসনের সামনে সিএনজির মিটার সক্রিয় অবস্থায় দেখতে পান তিনি। অর্থাত্, বাসটি গ্যাসে চললেও তার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে বাড়তি ভাড়া। আশরাফুলের অভিযোগ, কন্ডাক্টরকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি। 

তার ভাষ্য, জ্বালানির দাম বাড়লে বাসভাড়া বাড়ানোর অজুহাত দেওয়া হয়, কিন্তু কোন বাস কোন জ্বালানিতে চলছে, তা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না।

১২ টাকার ভাড়া ১৫ টাকা :সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জারি করা প্রজ্ঞাপনে ডিজেলচালিত বাস ও মিনিবাসের ভাড়া বাড়ানো হয়। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বড় বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। দূরপাল্লার বাসে ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা করা হয়েছে। মহানগরীর মিনিবাস এবং ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের আওতাধীন নির্দিষ্ট এলাকার বাস ও মিনিবাসের ভাড়াও সমন্বয় করা হয়েছে। তবে বর্ধিত ভাড়া গ্যাসচালিত বাস ও মিনিবাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অর্থাত্, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সিএনজিচালিত বাসে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অনুমোদন নেই।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, নতুনবাজার থেকে রামপুরা ব্রিজের দূরত্ব ৩ দশমিক ৬ কিলোমিটার। রামপুরা স্টপেজ পর্যন্ত দূরত্ব ৪ দশমিক ৬ কিলোমিটার। এ দূরত্বের জন্য নির্ধারিত ভাড়া সর্বোচ্চ ১২ টাকা হলেও আদায় করা হয়েছে ১৫ টাকা। ফলে যাত্রীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ৩ টাকা নেওয়া হয়েছে। একটি বাসে একই দূরত্বে ৩০ জন যাত্রীর প্রত্যেকের কাছ থেকে অতিরিক্ত ৩ টাকা নেওয়া হলে এক যাত্রায় বাড়তি আদায় দাঁড়ায় ৯০ টাকা। প্রতিদিন একাধিক যাত্রায় এমন ঘটনা ঘটলে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের পরিমাণ আরো বাড়তে পারে।

বিভিন্ন রুটে বাড়তি ভাড়ার অভিযোগ :শুধু রাইদা এন্টারপ্রাইজ নয়, রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাসের বিরুদ্ধেও বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করেছে যাত্রীরা। উত্তরার আজমপুরের বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম জানান, অফিসের কাজে উত্তরা থেকে নদ্দা ও নতুনবাজার এলাকায় যাতায়াত করতে হয় তাকে। তার অভিযোগ—রাইদা, ভিক্টর ক্ল্যাসিক ও অনাবিল পরিবহনে আগে উত্তরা থেকে নদ্দা কিংবা নতুনবাজার পর্যন্ত ২০ টাকা ভাড়া নেওয়া হলেও এখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। এছাড়া উত্তরা আজমপুর থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে আসাদগেট ও খামারবাড়ি রুটে চলাচলকারী ভিআইপি পরিবহনের ভাড়া ৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। উত্তরা থেকে শাহবাগগামী এয়ারপোর্ট স্পেশাল সার্ভিসের ভাড়াও ৪০ টাকা থেকে ৫০ টাকা হয়েছে বলে জানিয়েছে যাত্রীরা।

ফিলিং স্টেশন ও বাসের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীর কিছু বাস এখনো সিএনজিতে চলে। রাইদা এন্টারপ্রাইজ ও গ্রেট তুরাগের কয়েকটি বাস দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর সিফাত সিএনজি ফিলিং স্টেশন কোম্পানি লিমিটেড থেকে গ্যাস নেয় বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

বাড়তি ভাড়া আদায়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস :সিএনজিচালিত বাসে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম বলেন, যেসব রুটে গ্যাসচালিত বাস চলছে, সেসব রুটে ভাড়া বাড়ানো হয়নি। মালিক সমিতি কিংবা বিআরটিএ—কোনো পক্ষ থেকেই এসব বাসে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বাস পরিচালনার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার মতে—যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য খরচ বৃদ্ধির কারণে বর্তমান ভাড়ায় উন্নত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন। এজন্য ভাড়ার কাঠামো পুনর্বিবেচনা, যন্ত্রাংশ আমদানিতে কর কমানো এবং পরিবহন খাতে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।

রুটভিত্তিক ব্যবস্থাপনার পরামর্শ :যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, রাজধানীতে বাস পরিচালনায় শৃঙ্খলা আনতে রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। এ ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট রুটের বাস পরিচালনা ও তদারকি সমন্বিতভাবে করা সম্ভব হবে। ই-টিকিটিং চালু করা গেলে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের সুযোগও কমবে।