চাঁদা না পেয়ে আবাসন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে প্রায় এক কোটি টাকার মালামাল লুটের অভিযোগ উঠেছে। ঢাকার কেরানীগঞ্জের আরশিনগরে আফসানা হাউজিংয়ের কার্যালয়ে গত রবিবার (৪ অক্টোবর) এ ঘটনা ঘটে।
প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার ও মালিকের অভিযোগ, ৪০ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় ভাঙচুর করে ট্রাকে করে আসবাবপত্র ও বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় থানায় মামলা করেছেন প্রতিষ্ঠানের মালিক।
শুধু কেরানীগঞ্জ নয়, রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর এলাকাতেও জমি ও ভবন নির্মাণকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। সেখানে চাঁদা না দেওয়ায় নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন একাধিক প্লট ও ভবনমালিক। তাদের অভিযোগ, বারবার হুমকি ও হামলার শিকার হলেও কার্যকর প্রতিকার মিলছে না।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি, জমি দখল ও ভাঙচুরের একের পর এক ঘটনা সামনে আসায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এসব ঘটনায় সরকারি দল বিএনপির কোনো কোনো নেতাকর্মীর নাম জড়ানোয় সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, চাঁদাবাজি ও দখল ঠেকাতে সরকার কেন কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না?
চাঁদা না দেওয়ায় ট্রাক এনে লুটপাট
ঢাকার কেরানীগঞ্জের আরশিনগরে আফসানা হাউজিংয়ের কার্যালয়ে গত রোববার বেলা ১১টা ২৬ মিনিটে একটি খালি ছোট ট্রাক এসে থামে। এরই মধ্যে প্রায় ৩০ জন যুবক কার্যালয়ে ঢুকে বিভিন্ন কক্ষের দরজা ভাঙচুর করেন। কার্যালয়টি তখন ফাঁকা ছিল।
প্রতিষ্ঠানটির সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, রামদা ও লাঠিসোঁটা নিয়ে একদল যুবক কার্যালয়ে ঢুকে ভাঙচুর করছেন। পরে ভেতরে থাকা সোফাসেট, এয়ারকন্ডিশনার, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র বের করে বাইরে রাখা পিকআপ ভ্যানে তোলা হয়। এরপর তারা ভ্যানটি নিয়ে চলে যান।
ঘটনার কয়েক দিন পর গত বুধবার কার্যালয়টিতে গিয়ে ভাঙচুরের চিহ্ন দেখা যায়।
প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার মো. নাসির বলেন, ‘এই রুমে এসি ছিল। সেটা খুলে নিয়ে গেছে। এটার আউটডোরও খুলে নিয়ে গেছে। দামি সোফা ছিল, টেবিল, ক্যাশটাকা সব নিয়ে গেছে। টিভি-গিজারও নিয়ে গেছে। লুট হওয়া মালামালের মূল্য প্রায় এক কোটি টাকা। এর মূল কারণ ছিল চাঁদার দাবি পূরণ না করা। ওরা চল্লিশ লাখ টাকা চাঁদা চেয়েছিল। বলেছিল এখানে ব্যবসা করতে হলে চাঁদা দিতে হবে। আমরা রাজি হই নাই। তারপর এই হামলা। প্রায় এক কোটি টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে।’
প্রতিষ্ঠানটির মালিক সজীব ব্যাপারীও একই অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, চাঁদা না দেওয়ায় ভাড়াটে সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে।
সজীব ব্যাপারী বলেন, ‘ওরা সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাং ভাড়া করে এই হামলাটা করেছে। কারণ আমি ৪০ লাখ টাকা চাঁদা দেই নাই। আমি বলছি যে, আমি চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করবো না। এখন আমি তো ভয়-আতঙ্ক নিয়ে আছি। কাজ বন্ধ।’
ঘটনার পরদিন ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় মামলা করেন তিনি।
চাঁদাবাজদের জন্য বাড়ি তুলতে পারছি না
কেরানীগঞ্জের ঘটনার বাইরে রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর এলাকাতেও জমি ও ভবন নির্মাণকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রূপনগর এলাকায় চার কাঠার একটি প্লট কিনেছিলেন ব্যবসায়ী মোদাচ্ছের হোসেন। অংশীদার হিসেবে নিয়েছিলেন আরেকজনকে। আশপাশের প্লটগুলোতে ভবন নির্মিত হলেও তাদের জমিটি দীর্ঘদিন ফাঁকা ছিল। চার মাস আগে সেখানে ভবন নির্মাণের জন্য পাইলিংয়ের কাজ শুরু করতে গেলে চাঁদার দাবিতে লোকজন আসতে শুরু করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মোদাচ্ছের হোসেন বলেন, ‘কাজ শুরু করতে না করতেই দফায় দফায় চাঁদার দাবিতে লোকজন আসতে শুরু করলো। একই গ্রুপ, কিন্তু একেকবার একেকজন আসে। আমি চারটা পাইলিং শুরু করে দিলাম। ওরা হুমকি দিলো যে, আগে পাঁচ লাখ টাকা দিতে হবে। নাহলে সব মালামাল নিয়ে যাবে।’
আরও দেখুন: মেধা তালিকায় ২য় হয়ে ছেড়েছেন চাকরি, বেকার অবস্থায় হতাশাগ্রস্থ প্রাথমিকের নিয়োগ বঞ্চিত ফয়জুল আলম
চাঁদার দাবিতে অতিষ্ঠ হয়ে একপর্যায়ে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন তিনি। কবে আবার কাজ শুরু করতে পারবেন, তা নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
মোদাচ্ছের হোসেন বলেন, ‘আমি গ্রাম থেকে জায়গা-জমি বেঁচে টাকা জোগাড় করে নিয়ে আসছি যে, বিল্ডিংটা বানাবো। নিজের বাসায় উঠবো। সেইটা আর হলো না। এখনো ভাড়া বাসাতেই আছি। চাঁদা দিয়ে কাজ করাইতে পারবো না।’
চাঁদার হুমকি পেলেও তিনি আইনের আশ্রয় নেননি। তার ভাষ্য, ‘লাভ হবে না। এখানে সবাই সব জানে। কিন্তু কেউ কিছু করবে না। চুপ থাকাই ভালো।’
অর্ধশত প্লট ও ভবনে চাঁদার হুমকির অভিযোগ
রূপনগরের সম্প্রসারিত আবাসিক এলাকায় ডেফোডিল হোমস কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নানও চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছেন। সেখানে তার একটি ১০ তলা ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। চারটি ফ্লোর নির্মাণের পর চাঁদার দাবিতে কাজ আর এগিয়ে নিতে পারছেন না বলে জানান তিনি।
আব্দুল মান্নান বলেন, ‘এখানে তো মাটি কাটার সময় থেকেই চান্দা শুরু হয়ে গেছে। আমি ওদের সঙ্গে অনেকবার বসছি। কিন্তু ওরা একেকবার একেকজন আসে। পরে আর চান্দা দেই নাই। পরে ওরা আমার লোকজনকে কয়েকবার মারধর করছে। মানে ওদেরকে টাকা দিলে আমাকে কাজ করতে দিবে। তখন আর ঝামেলা করবে না। তার কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা চাওয়া হয়েছিল। হুমকির কারণে অন্তত চারবার নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে হয়েছে। সর্বশেষ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে। এতে প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে। এটার কাজ তিন বছরের মধ্যেই শেষ করে ফ্ল্যাট হস্তান্তর করতে হবে এভাবেই চুক্তি করা আছে। নাহলে প্রতি মাসে জরিমানা দিতে হবে। কিন্তু এখন তো এটা তিন বছরে শেষ করা অসম্ভব।’
এ ঘটনায় মামলা করেও কার্যকর ফল পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ তার।
আব্দুল মান্নান বলেন, ‘মামলা একটা করেছি। কিন্তু কিছু তো হচ্ছে না। থানা যদি ওদেরকে সহযোগিতা না করে, তাহলে এটা একমাসের মধ্যেই কমে যাবে। আর দলীয় লোক যদি সহযোগিতা না করে তাহলেও এসব থাকবে না। অ্যাকচুয়ালি এরা থানারও সহযোগিতা পায়, দলীয় লোকদেরও সহযোগিতা পায়।’
সম্প্রসারিত রূপনগর আবাসিক এলাকার প্লট, ফ্ল্যাট ও বাড়ির মালিকদের কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকেও চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলা হয়েছে।
গত রবিবার ঢাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মালিক কল্যাণ সমিতির লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, জমি দখলের পাশাপাশি নতুন করে প্লটমালিকদের কাছে স্থাপনা নির্মাণের সময় চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে দলবল নিয়ে নির্মাণশ্রমিকদের হুমকি, মারধর এবং কাজ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগও করা হয়। রূপনগর থানার পুলিশ নিয়ে গেলেও পুলিশের উপস্থিতিতে সন্ত্রাসীরা নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়। থানা-পুলিশ এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
মালিকদের কল্যাণ সমিতির সহসভাপতি মো. তাওহীদুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ‘চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে তারা সংবাদ সম্মেলন করতে বাধ্য হয়েছেন। এটা চব্বিশের পটপরিবর্তনের পর থেকে দেখা যাচ্ছে। ইদানিং এই চাঁদাবাজি, দখলটা আরও বেশি বাড়ছে। ধরেন প্লট মিলিয়ে প্রায় পঞ্চাশটা এমন ভবনে চাঁদা চাওয়া হয়েছে।’
বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করেও রূপনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে রাজধানীতে চাঁদা দাবি, সন্ত্রাস ও দখলের ঘটনায় পুলিশের গাফিলতির অভিযোগ নাকচ করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ডিসি (মিডিয়া) আকতার হোসেন বলেন, ‘আমাদের এখানে কোনো ধরনের গাফিলতি নাই। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যদি গাফিলতি থাকে, সেই সুনির্দিষ্ট অভিযোগ যদি আমাদের কাছে আসে, আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেই। যেখানে অপরাধ সংঘটিত হয়, সেখানে তদন্ত করে মামলা নেওয়ার প্রয়োজন হলে আমরা মামলা নেই, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেফতার করে আমরা আইনের আওতায় নিয়ে আসি।’
চাঁদাবাজি-দখলের পেছনে রাজনৈতিক প্রশ্রয়?
চাঁদাবাজি ও দখলের বিভিন্ন ঘটনায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে সরকারি দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের নাম জড়ানোর পর সরকারের জবাবদিহি ও আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, ‘অপরাধের সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকলে সেগুলো নির্মূল করা কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদের এখানে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, তারা যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন নেতাকর্মীদের একটা অংশ মনে করেন, বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় তিনি যে হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন, আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন, ক্ষমতায় আসার পর সবগুলো তিনি সুদে-আসলে তুলে ফেলবেন। তো সেটা তুলতে গেলে তো আইন মেনে সেটা সম্ভব না। তখনই আসে শক্তিপ্রয়োগ করে অন্যেরটা দখল বা চাঁদাবাজির কৌশল।’
চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগে দলীয় নেতাদের নাম আসার পর বিএনপির পক্ষ থেকে বহিষ্কারের মতো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও এসব পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তৌহিদুল হক।
তিনি বলেন, ‘সাংগঠনিক ব্যবস্থা যেটা নেওয়া হচ্ছে, সেটা সমঝোতামূলক সাংগঠনিক ব্যবস্থা কি না সেটা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এই সাংগঠনিক ব্যবস্থা উদাহরণ তৈরি করতে পারছে না। এখানে আইনের প্রয়োগটাও কঠোর করা প্রয়াজন। যতগুলো ঘটনা ঘটছে, সকল ঘটনায় যখন যথাযথ আইনের প্রয়োগ হবে, তখন সেটা একটা বার্তা তৈরি করবে।’
সরকার কি অপরাধীদের প্রশ্রয় দিচ্ছে?
চাঁদাবাজি ও দখলের ঘটনায় সরকারি দলের নেতাকর্মীদের নাম আসার পর সরকার এসব অপরাধে প্রশ্রয় দিচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান অবশ্য সরকার প্রশ্রয় দিচ্ছে এমন অভিযোগ নাকচ করেছেন। তবে সরকারি দলের কেউ কেউ এসব অপরাধে জড়িত থাকতে পারেন বলে স্বীকার করেছেন তিনি।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘সরকার প্রশ্রয় দিচ্ছে না, প্রশ্রয় দেওয়ার কোনো কারণও নেই। তবে এই অভিযোগ আমি উড়িয়েও দিতে চাই না যে, সরকারি দলের কেউ না কেউ এটার সঙ্গে কোনোভাবে জড়িত নয়। জনগণ যদি কোনোভাবে সাফার করতে থাকে ক্রমাগত এবং সেটা যদি সরকারি দলের নামে হয়ে থাকে, তাতে যদি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সঠিক ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে তো সরকারকেই এটার মাশুল দিতে হবে। সরকার এটার ব্যাপারে সচেতন আছে।’
চাঁদাবাজি, দখল ও ভাঙচুরের এসব অভিযোগের মধ্যে একদিকে ভুক্তভোগীরা কার্যকর প্রতিকার না পাওয়ার কথা বলছেন, অন্যদিকে পুলিশ বলছে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক প্রভাব, অভিযোগের তদন্ত এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার বিষয়গুলোই এখন এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারের সক্ষমতা নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।