নতুন পে-স্কেলে শুধু কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নয়, অবসরভোগীদের পেনশনেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। কম পেনশন পাওয়া অবসরভোগীদের জন্য বৃদ্ধির হার রাখা হয়েছে তুলনামূলক বেশি। নতুন ব্যবস্থায় পেনশনযোগ্য চাকরিকাল পাঁচ বছর থেকে শুরু করে ২৫ বছর বা তার বেশি সময় পর্যন্ত ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, সর্বশেষ আহরিত মূল বেতনের ওপর ভিত্তি করে পেনশনের হার নির্ধারণ করা হবে। পাঁচ বছর চাকরি হলে পেনশনের হার হবে মূল বেতনের ২১ শতাংশ। এরপর প্রতি বছর চাকরিকালের সঙ্গে পেনশনের হার বাড়বে। ১০ বছর চাকরিতে হার ৩৬ শতাংশ, ১৫ বছরে ৫৪ শতাংশ এবং ২০ বছরে ৭২ শতাংশ। এছাড়া ২১ বছরে ৭৫ শতাংশ, ২২ বছরে ৭৯ শতাংশ, ২৩ বছরে ৮৩ শতাংশ ও ২৪ বছরে ৮৭ শতাংশ পেনশন পাওয়া যাবে। ২৫ বছর বা তার বেশি চাকরিকালে পেনশনের হার হবে ৯০ শতাংশ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ রোববার এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে পেনশনযোগ্য চাকরিকাল, নিট পেনশন, আনুতোষিক, পারিবারিক পেনশন ও ছুটি নগদায়নের নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে, যেগুলো গত ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে।
প্রজ্ঞাপনে সরকারি কর্মচারীদের পেনশন ও অবসরকালীন সুবিধায় নতুন হিসাব নির্ধারণ করেছে সরকার। এতে বলা হয়, ৯ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশনে ১০০ শতাংশ, ৯ হাজার ১ থেকে ২০ হাজার টাকায় ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ থেকে ৩০ হাজার টাকায় ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ থেকে ৪০ হাজার টাকায় ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশনে ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধির বিধান করা হয়েছে। তবে সর্বোচ্চ নিট পেনশন নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০ হাজার ২০০ টাকা। অর্থাৎ যাদের পেনশন তুলনামূলক কম, তাদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার বেশি। অন্যদিকে বেশি পেনশন পাওয়া অবসরভোগীদের ক্ষেত্রে শতাংশের হার কম হলেও নির্ধারিত সীমার মধ্যে তাদের নিট পেনশন বাড়বে। অর্থ বিভাগের ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’-এ অবসরভোগীদের জন্য এসব বিধান রাখা হয়েছে। আদেশটি ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে পাওয়া নিট পেনশনকে ভিত্তি ধরে বৃদ্ধির হিসাব করা হবে। এ হিসাবে ৯ হাজার টাকা নিট পেনশন পাওয়া কেউ নতুন কাঠামোয় ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত পেতে পারেন। আবার ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন পাওয়া অবসরভোগীদের জন্য সর্বোচ্চ সীমা ৭০ হাজার ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে কেউ এই সীমার বেশি নিট পেনশন পেয়ে থাকলে ১ জুলাই ২০২৭ পর্যন্ত তার বিদ্যমান নিট পেনশন বহাল থাকবে।
বিধবা স্ত্রী বা বিপত্নীক স্বামী ফের বিয়ে না করার শর্তে আজীবন পেনশন পাবেন : মৃত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিধবা স্ত্রী বা বিপত্নীক স্বামী পুনর্বিবাহ না করার শর্তে আজীবন পারিবারিক পেনশন পাবেন। এ জন্য বছরে একবার পুনর্বিবাহ না করার অঙ্গীকারনামা বা প্রত্যয়নপত্র হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে দাখিল করতে হবে। তবে ৫০ বছরের বেশি বয়সী বিধবার ক্ষেত্রে এ অঙ্গীকারনামা বা প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার শর্ত প্রযোজ্য হবে না।
আনুতোষিকের হার বদলায়নি : নতুন প্রজ্ঞাপনে আনুতোষিকের হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। পাঁচ বছর বা তার বেশি কিন্তু ১০ বছরের কম চাকরির ক্ষেত্রে প্রতি টাকায় আনুতোষিক হবে ২৬৫ টাকা। ১০ বছর বা তার বেশি কিন্তু ১৫ বছরের কম চাকরিতে প্রতি টাকায় ২৬০ টাকা। ১৫ বছর বা তার বেশি কিন্তু ২০ বছরের কম চাকরিতে প্রতি টাকায় ২৪৫ টাকা এবং ২০ বছর বা তার বেশি চাকরিতে প্রতি টাকায় ২৩০ টাকা আনুতোষিক পাওয়া যাবে।
অবসরে ১৮ মাসের ছুটি নগদায়ন : অবসর গ্রহণের সময় সর্বোচ্চ ১৮ মাসের ছুটি নগদায়ন করা যাবে। অর্থাৎ ১৮ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ পাওয়ার সুযোগ থাকবে। অবসর-উত্তর ছুটি বা পিআরএল এবং ছুটি নগদায়নের ক্ষেত্রে দুই দিনের অর্জিত ছুটিকে এক দিনের গড় বেতনের ছুটিতে রূপান্তর করা যাবে। পিআরএল ভোগ না করলেও নির্ধারিত শর্তে এ সুবিধা পাওয়া যাবে। চাকরির মেয়াদ পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে কোনো কর্মচারী স্বাস্থ্যগত কারণে অক্ষম হয়ে পড়লে বা মারা গেলে নির্ধারিত শর্তে এককালীন বিশেষ আর্থিক সহায়তার বিধানও রাখা হয়েছে।
একবারে মিলবে না পুরো বাড়তি পেনশন : নতুন পেনশন নির্ধারণ হলেও বাড়তি অর্থ একবারে পুরোটা দেওয়া হচ্ছে না। প্রজ্ঞাপনে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি বিদ্যমান নিট পেনশনের ক্ষেত্রে নতুন ও পুরোনো পেনশনের পার্থক্যের ৪০ শতাংশ এবং ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশনের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ দেওয়া হবে। এরপর ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়তি অংশের যথাক্রমে ৭০ ও ৭৫ শতাংশ পাওয়া যাবে। আর ১ জুলাই ২০২৭ থেকে নির্ধারিত নতুন নিট পেনশনের শতভাগ কার্যকর হবে। একই সঙ্গে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে প্রজ্ঞাপন জারির সময় পর্যন্ত প্রাপ্য বর্ধিত পেনশনের বকেয়া পাওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে।
পাঁচ বছরের আগেই মৃত্যু বা অক্ষমতায় বিশেষ সহায়তা : নতুন আদেশে চাকরির পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই কোনো সরকারি কর্মচারী স্বাস্থ্যগত কারণে স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে পড়লে অথবা মারা গেলে এককালীন বিশেষ আর্থিক সহায়তার বিধানও রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে চাকরির মেয়াদের প্রতি বছর বা তার অংশবিশেষের জন্য শেষ আহরিত তিনটি মূল বেতনের সমপরিমাণ হারে কর্মচারী নিজে অথবা তার পরিবার এককালীন বিশেষ আর্থিক সহায়তা পাবেন। দীর্ঘদিনের পুরোনো একটি বিধানকে নতুন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করে এ সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে।