Image description
গ্যাস লিকেজে বিষক্রিয়ায় ৯ জনের প্রাণহানি, গ্যাস ফ্রি না করেই কাটা হচ্ছিল এলএনজি জাহাজ

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জাহাজ ভাঙা কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় গ্যাস লিকেজ হয়ে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় অন্তত আরও ১০ জন আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। শুক্রবার সকালে উপজেলার ভাটিয়ারী স্টেশন রোড সংলগ্ন সাগর উপকূলে মোহাম্মদ লোকমানের মালিকানাধীন ফেরদৌস স্টিল নামের জাহাজ ভাঙা কারখানায় এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে ৭ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন- নাসির উদ্দীন (৩৮), মোহাম্মদ সুজন (৩৫), মুনসুর আলী (৪০), হাবিবুর রহমান (৫০), সানি জলদাস (২২), পলাশ জলদাস (২৭) ও মোহাম্মদ রানা (২৭)। নিহতরা সবাই স্থানীয় এলাকার বাসিন্দা। এদের মধ্যে নাসির ইয়ার্ড ইনচার্জ, সুজন সেফটি ইনচার্জ, মুনসুর ফোরম্যান ছিলেন। বাকিরা শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। আহতদের মধ্যে মো. সেলিম নামের একজন চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।


প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকালে শ্রমিকরা কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার কাজ করছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই দুইজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। পরে আহত শ্রমিকদের চমেকসহ চট্টগ্রাম নগরের কয়েকটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ছয়জনের মৃত্যু হয়। এখনো আহত বেশকয়েকজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, হঠাৎ কারখানার ভেতর থেকে মানুষের চিৎকার শুনতে পান তারা। পরে কয়েকজন কারখানা এলাকায় গিয়ে দেখেন, অসুস্থ কিছু লোককে গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এরপর জাহাজের ভেতরে কয়েকজনের মরদেহ পড়ে থাকার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়রা গিয়ে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। স্থানীয় জেলেরা জানান, কারখানার ভেতর থেকে বের হওয়া গ্যাসের গন্ধের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে সাগরে ইলিশ ধরতে যাওয়া জেলেরা কারখানাটির পাশের খালে প্রবেশ করতে পারেননি। গ্যাসের তীব্র গন্ধের কারণে তাদের অন্তত আধা কিলোমিটার দূরে গিয়ে নৌকা ভেড়াতে হয়েছে।News

ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে কুমিরা ফায়ার স্টেশনে দুর্ঘটনার খবর আসে। খবর পেয়ে দু’টি ইউনিট, রেসকিউ ভ্যান ও এম্বুলেন্স ঘটনাস্থলে যায়। উদ্ধারকারীরা প্রথমে তিনটি মরদেহ ও দু’জন আহত শ্রমিককে উদ্ধার করে বিএসবিএ হাসপাতালে পাঠায়। পরে মুমূর্ষু অবস্থায় এক ফোরম্যানকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। ঘটনাস্থলে গ্যাস বা রাসায়নিকের তীব্র দুর্গন্ধ পাওয়া গিয়েছিল। জোয়ারের পানি ঢোকার পর দুর্গন্ধ কিছুটা কমে যায়। ভাটা এলে সর্বশেষ তল্লাশি চালানো হবে। ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে কার্বন মনোক্সাইড বা কার্বনজাত উপজাত গ্যাস থেকে দুর্ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যে জাহাজটি কাটার কাজ চলছিল সেটি একটি পুরনো এলএনজিবাহী জাহাজ। ২০ থেকে ২৫ বছরের পুরনো এ ধরনের জাহাজ স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করা হয়। জাহাজ কাটার আগে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গ্যাস ও রাসায়নিকমুক্ত করার কথা থাকলেও তা যথাযথভাবে করা হয়েছিল কিনা, সেটি তদন্তের বিষয়।


এদিকে দুর্ঘটনার পর নিহতদের স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। পরে স্থানীয় শতাধিক বিক্ষুব্ধ মানুষ ইয়ার্ডে গিয়ে ভাঙচুর চালান বলে জানিয়েছেন ইয়ার্ড কর্মকর্তারা। এ সময় ইয়ার্ডের বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জাহাজের ভেতরে জমে থাকা তরল বর্জ্য বা গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা না করেই শ্রমিকদের সেখানে প্রবেশের সুযোগ দেয়া হয়েছিল। তাদের দাবি, এটি মালিকপক্ষের গাফিলতি। বন্ধের দিনেও সেখানে কাজ চলছিল। বিষয়গুলো তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক শ্রমিকের নিকটাত্মীয় মানবজমিনকে বলেন, এলএনজি শিপ কাটার সময় সবকিছু ফ্রি করে রাখতে হয়। বিশেষজ্ঞ টিম দিয়ে সবকিছু রেকি করতে হয়। কিন্তু আজকের এই ঘটনার সময় মালিকপক্ষ এসব বিষয়ে নজর দেননি। ফলে এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান বলেন, জাহাজে বিষাক্ত গ্যাস নির্গমনের ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।

গ্যাস নির্গমনের কারণ এবং ইয়ার্ডে শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কিনা, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এদিকে শুক্রবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিহতদের স্বজনদের সান্ত্বনা ও আহত শ্রমিকের চিকিৎসার খোঁজ নিতে আসেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ সময় তিনি বলেন, এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেয়া হবে। মন্ত্রী আরও বলেন, দুর্ঘটনাস্থলে এখনো গ্যাসের লিকেজ রয়েছে। সেটি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনীর সদস্যরা কাজ করছেন। সেনাবাহিনীর এক্সপ্লোসিভ টিমও ঘটনাস্থলে গেছে। মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে দেয়া হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকেও সাহায্যে করা হবে।