চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল দেশিবিদেশি বিনিয়োগকারীদের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে। নতুন নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি এখানে বিনিয়োগের গতি বাড়ছে। এখন পর্যন্ত ৬২ দেশিবিদেশি প্রতিষ্ঠান এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য ইজারা চুক্তি সম্পন্ন করেছে বলে জানিয়েছে বেপজা। বেপজা থেকে প্রাপ্ত দলিল অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগে চুক্তি করেছে চীন। একক ও যৌথ মিলিয়ে চীনের ৪২ প্রতিষ্ঠান চুক্তি করেছে। সর্বশেষ ১৬ জুলাই চীনের হুয়ারুন টেক্স কোম্পানি লিমিটেড বেপজার সঙ্গে জমি ইজারা চুক্তি সই করেছে।
প্রতিষ্ঠানটি এখানে একটি আধুনিক টেক্সটাইল প্ল্যান্ট স্থাপনে ৩০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। এরপর হংকং ৮, সিঙ্গাপুর ৬, দক্ষিণ কোরিয়া ৪, ভারত ২, সংযুক্ত আরব আমিরাত ৩, আয়ারল্যান্ড ২, শ্রীলঙ্কা, কানাডা, নেদারল্যান্ডস, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়ার একটি করে প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ১ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বেপজার তথ্যানুযায়ী, ইতোমধ্যে ১২ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম শুরু করেছে। আরও তিনটি প্রতিষ্ঠান পরীক্ষামূলক উৎপাদনে রয়েছে।
এ প্রতিষ্ঠানগুলো শিগগিরই পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যাবে। এখন পর্যন্ত এ অঞ্চল থেকে ৫২ দশমিক ৮২ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি এবং ৫ হাজার ৭৪ জন বাংলাদেশি নাগরিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। বেপজা সূত্র জানান, এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে শুধু তৈরি পোশাকশিল্প নয়, জুতা, টেক্সটাইল, ড্রোন, ওষুধশিল্পের কাঁচামাল (এপিআই), ব্যাটারি উপাদানসহ বিভিন্ন উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পেও বিনিয়োগ বাড়ছে।
চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং, শ্রীলঙ্কা ও যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক প্রতিষ্ঠান বড় অঙ্কের বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে এসেছে। ফলে মিরসরাই ধীরে ধীরে বহুমুখী শিল্পোৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। গ্যাসসংযোগের অভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। পাশাপাশি কাস্টমস-সংক্রান্ত কিছু সেবা অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভিতরে না থাকায় ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে এসব সমস্যা দ্রুত সমাধান করা গেলে বিনিয়োগের গতি আরও বাড়বে।
জানতে চাইলে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলের নির্বাহী পরিচালক এ এস এম আনোয়ার পারভেজ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, মিরসরাইয়ের বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল দেশিবিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য সাড়া পাচ্ছে। প্রকল্পের নির্মাণকাজ চলমান থাকতেই ১৫ শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন শুরু করেছে। পাশাপাশি আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অল্প সময়ের মধ্যেই উৎপাদনে যাবে। আনোয়ার পারভেজ জানান, এখন পর্যন্ত ৬২ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জমি ইজারা চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে।
এসব প্রতিষ্ঠানে প্রচলিত তৈরি পোশাকের পাশাপাশি জুতা ও জুতার সরঞ্জাম, উন্নত ফার্মাসিউটিক্যালস পণ্য, টোব্যাকো মেশিন, ব্যাটারি প্লেট, ক্যাম্পিং ফার্নিচার, কাটলারি, গ্রিনহাউস হাইড্রোপনিকস টেন্ট ও ড্রোনের মতো উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আরও কয়েকটি দেশিবিদেশি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে এবং তাদের কয়েকটির সঙ্গে শিগগিরই চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এ ছাড়া ৩৫ থেকে ৪০টি প্রতিষ্ঠান বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করে যোগাযোগ করছে।
তাদের সঙ্গে বেপজার বিনিয়োগ উন্নয়ন বিভাগ নিয়মিত যোগাযোগ, তথ্যবিনিময় এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করছে। বেপজার প্রত্যাশা, অর্থনৈতিক অঞ্চলটি পুরোপুরি চালু হলে এখানে প্রায় ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আসবে। তখন প্রতি বছর ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় এবং প্রায় ৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যা দেশের শিল্পায়ন ও রপ্তানি খাতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।