Image description

জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি হচ্ছে জানিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, আগামী ২৮ এপ্রিলের দিকে এক হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ হলে বিদ্যুতের সংকট থেকে অনেকটা বের হওয়া সম্ভব হবে।    

বিদ্যুতের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সচিবালয়ে বিফ্রিংয়ে একথা জানান বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্মসচিব উম্মে রেহানা।

উম্মে রেহানা বলেন, গতকালকের (২২ এপ্রিল) বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াট। আমাদের কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা অনেক।

আমরা গ্যাসের স্বল্পতার কারণে এবং জ্বালানি স্বল্পতার কারণেই এটা করতে (উৎপাদন) পারছি না। আর তেলও আমাদের মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে।
জ্বালানি সংকটের কারণে মূলত আমরা এই বিভ্রাটের মধ্যে পড়েছি। গতকাল সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৬৮১ মেগাওয়াট।
তার মানে ২ হাজার ৮৬ মেগাওয়াটের মতো আমাদের লোডশেডিং হয়েছিল।

 

মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুতের ফোরকাস্টের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদের বিদ্যুতের আজকের চাহিদা প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াটের মতো। তার মানে গত বছরের তুলনায় এ বছরের চাহিদা কিন্তু অনেক বেশি। কনজাম্পশনে বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন বেড়েছে, গরম বেড়েছে, এসি ব্যবহার করছি বা বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ইকুইপমেন্ট ব্যবহার করছি। সার্বিক বিষয় নিয়ে আসলে বিদ্যুৎ চাহিদাটা অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু জ্বালানি সংকটটা অনেক বেশি অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে।

আজকের উৎপাদনে যে প্রজেকশন দেখানো হয়েছে, সেখানে প্রায় ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবো। তারপরে দেখা যাচ্ছে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি। এখন আপনাদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে এত বিদ্যুৎ ঘাটতি কেন হবে? এর কারণ হিসেবে আমরা কিছু ফাইন্ড আউট করেছি। সেটা হচ্ছে, আমাদের যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে, আমরা বলেছি আটটা। তার মধ্যে আদানি থেকে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন আমরা আমদানি করে থাকি, তার একটা ইউনিট কারিগরি কারণে সংকটে পড়েছে। তবে ২৬ তারিখে আদানির সেকেন্ড ইউনিটটা ঠিক হয়ে যাবে, আমরা বিদ্যুৎ সরবরাহ পেয়ে যাব। এছাড়া বাঁশখালীতে এসএস পাওয়ার এর একটা আইপিপি প্ল্যান্ট আছে, সেখান থেকেও একটা ইউনিটের বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে প্রায় ৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমরা কম পাচ্ছি। আশা করছি, ওটা পেয়ে যাব আমরা ২৮ তারিখের দিকে। সব মিলিয়ে ২৮ তারিখ পর্যন্ত আমরা বোধহয় প্রায় এক হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বাড়তি বিদ্যুৎ দিতে পারব। তার মানে আমরা কিছুটা সাশ্রয় করতে পারব এবং মানুষকে এই সংকট থেকে কিছুটা নিরসন করতে পারব।

উম্মে রেহানা বলেন, আরএনপিএল-এর একটা ইউনিট বন্ধ আছে। বিশেষ করে জ্বালানি সংকটের কারণে আমদানি করে আনতে হয় কয়লাটা। এটা ওরা নিয়ে আসবে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে আমরা আশা করছি। তার মানে সব মিলিয়ে আমরা এক হাজার ৯৮২ মেগাওয়াট বাড়তি বিদ্যুৎ দিতে পারব। তাতে মানুষের কিছুটা সংকট আমরা নিরসন করতে পারব বলে আশা করছি।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় প্রাকৃতিক গ্যাস, ফার্নেস ওয়েল, ডিজেল, কয়লা, হাইড্রো, সৌর শক্তি এবং বায়ু বিদ্যুতের মাধ্যমে। আর কিছু বিদ্যুৎ আমরা আমদানি করে থাকি। প্রাকৃতিক গ্যাসের মাধ্যমে সবচেয়ে কম পয়সায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারি হাইড্রোর মাধ্যমে, তবে আমাদের দেশে ভূ-প্রকৃতি অনুযায়ী আমরা হাইড্রো থেকে উৎপাদন করে থাকি মাত্র ২৩০ মেগাওয়াট, যেটা আমাদের মোট উৎপাদনের ১ শতাংশ মাত্র। এর পরেই হচ্ছে, প্রাকৃতিক গ্যাসের মাধ্যমে। তবে আমাদের দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত এত বেশি নেই। জ্বালানি সংকট রয়েছে এবং জ্বালানি বিভাগ থেকে এলএনজি আমদানি করে সেটাকে ফুয়েল মিক্স করে আমাদের এটা সরবরাহ করে থাকে। এই সরবরাহ করে আমাদের যত পাওয়ার প্লান্টস আছে, তার মধ্যে ৪৩ শতাংশ বিদ্যুৎ আমরা উৎপাদন করে থাকি প্রাকৃতিক গ্যাসের মাধ্যমে। এই ৪৩ শতাংশ বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা হচ্ছে ১২ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট। তবে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক গ্যাসের মাধ্যমে যদি আমরা উৎপাদন করতে যাই, সেখানে আমাদের দুই হাজার এমএমসিএফডি গ্যাসের প্রয়োজন হয়। কিন্তু এতটা গ্যাস জ্বালানি থেকে আমাদের সরবরাহ করতে পারছে না। কারণ আমাদের বিভিন্ন কোম্পানি রয়েছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে, শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাদেরও গ্যাসটা দিতে হচ্ছে এবং সার উৎপাদন করতে হয়, এটাও আমাদের কৃষির জন্য অত্যাবশ্যকীয়।

জ্বালানির এই সংকটের কারণে তারা যদি এক হাজার ২০০ এমএমসিএফডি গ্যাসও দিতে পারত, তাহলেও আমরা সাত হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারতাম অনেক কম পয়সায়। কিন্তু তারা আমাদের ৮৫০ থেকে ৯০০ এমএমসিএফডি গ্যাস দিতে পারছে।

যদি আমরা গতকালকের রিপোর্টটা দেখি, সেখানে গ্যাসের মাধ্যমে আমাদের পাঁচ হাজার ২৭৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে, যদিও আমাদের উৎপাদন ক্ষমতা হচ্ছে ১২ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট। তার মানে আমরা অর্ধেকেরও কম উৎপাদন করতে পারছি গ্যাসের স্বল্পতার কারণে।

এরপরে ফার্নেস ওয়েল, ডিজেল- এগুলো খুব কস্টলি। আমরা সেদিকে খুব কম উৎপাদন করি সাশ্রয়ের জন্য। আমরা কয়লার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে থাকি, আমাদের মোট আটটি কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্লান্টস আছে।

যুগ্মসচিব বলেন, সংকট আমাদের আছে। সংকট আমরা সবাই সম্মিলিতভাবেই প্রতিহত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। আমরা আশা করি, আমরা যে জ্বালানি সাশ্রয়ের কথা বলি, আপনারা সবাই এ বিষয়টা প্রচার করবেন। আমরা যখন এসি চালাব, তখন এসিটা যাতে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকে। আমরা দিনের বেলা কার্টেনগুলো, আমরা জানালা-পর্দাগুলো তুলে রাখব, যাতে আমাদের লাইট কম লাগে। আসলে আমরা যদি জাতি হিসেবে সাশ্রয়ী জাতি না হই, তাহলে এই সংকটটা থেকেই যাবে। আমরা সবাই মিলে এই সংকটকে উত্তরণ করব।