Image description

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শহীদুল্লাহ হল শাখার সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মেহেরুল হাসান শামীমের পুরো আওয়ামী লীগ আমলটায় বাপেক্সে ছিল একচেটিয়া দাপট। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে বারবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাপেক্স কর্মকর্তাদের সভাপতি পদ দখল করে নিজের ক্ষমতাকে সুসংহত করেন। যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম একপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি বাপেক্সের মেধা তালিকার সিনিয়র কর্মকর্তাদের পেছনে ফেলে মহাব্যবস্থাপক (জিএম) পদে বাগিয়ে নেন অবৈধ পদোন্নতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ড. মো. হোসেন মুনসুর পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান থাকাকালে মেহেরুলের পৃষ্ঠপোষকতায় হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের পরিচালক পদ লাভ করেন। প্রকল্প পরিচালকের পদে থেকে লাগামহীন দুর্নীতি-লুটপাট করেন। সংস্থার নিজস্ব তদন্তেই মেহেরুলের বিরুদ্ধে পদে পদে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে দুদক তার বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করেছে, যা এখনও বিচারাধীন। ধরে নেওয়া হয়েছিল যে, ৫ আগস্ট, ২০২৪ ফ্যাসিস্ট, লুটেরা আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শীর্ষ দুর্নীতিবাজ এই কর্মকর্তার শাস্তি হবে। অথচ গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথমে কিছুদিন গা-ঢাকা দিয়ে থাকলেও অত্যন্ত কম সময়ে আবারও তিনি লাইমলাইটে চলে আসেন মন্ত্রণালয় এবং এনসিপি নেতাদের ম্যানেজ করে। অবাক করা ব্যাপার হলো, এই বিএনপি সরকারের আমলেও দুর্নীতিবাজ বাপেক্স কর্মকর্তা, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মেহেরুল হাসান শামীম রয়ে যাচ্ছেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। এমনকি এখন তাকে সংস্থাটির গুরুত্বপূর্ণ জিএম, পরিকল্পনা পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাকে অকল্পনীয়ই বলা চলে।
শুধু তাই নয়, এই মেহেরুল হক শামীম ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে যোগসাজশে অঘোষিতভাবে বাপেক্সে ঠিকাদারি ব্যবসাও চালিয়ে যাচ্ছেন। যা ইতিপূর্বে তার মামা শ্বশুর, আওয়ামী লীগ নেতা এসপি মাহবুব চালাতেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে এসপি মাহবুব বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার পর আনঅফিসিয়ালি এই ব্যবসা চালাচ্ছেন মেহেরুল হাসান শামীম। মেহেরুলের এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডে জ¦ালানি বিভাগের সচিবেরও নেপথ্য সমর্থন রয়েছে বলে অভিযোগ আছে। তিনিই মেহেরুলকে সংস্থাটির পরিকল্পনা বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের দায়িত্ব দিয়েছেন।

জাল সার্টিফিকেটে চাকরি, শুরু থেকেই অপকর্ম
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেহেরুল হাসান শামীম চাকরিতে প্রবেশ করেন ২০০০ সালে। মেহেরুলের বাবা মুক্তিযুদ্ধে যাননি, মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। তারপরও ছাত্রলীগ নেতা- এই প্রভাব খাটিয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ আমলে ‘ভুয়া’ মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটে পেট্রোবাংলার অধীন বাপেক্সে চাকরিতে প্রবেশ করেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রাতারাতি আবার ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন তিনি। বিশেষ করে ২০০৯ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ড. মো. হোসেন মুনসুর পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান থাকাকালে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় একচ্ছত্র ক্ষমতাবান হয়ে উঠেন। পাশাপাশি লাগামহীন দুর্নীতিতেও জড়িয়ে পড়েন। বাগিয়ে নেন বাপেক্সের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের পরিচালক পদ। টেন্ডার ছাড়াই পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেন। কাজ না করেই কাগজপত্রে ভুয়া হিসাব-নিকাশ দেখিয়ে প্রকল্পের টাকা আত্মসাত করেন। বাপেক্সের তদন্তেই তার এসব দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে আসে। পরবর্তীতে দুদকের তদন্তেও প্রমাণিত হয়। দুদক তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে (স্মারক নং: ০০.০১.০০০০.৫০৩.২৬.১২২.১৯-১৩৪২১, তারিখ: ০৪/০৪/২০১৯), যা এখনও বিচারাধীন।

আড়াইশ’ কোটি টাকার দূর্নীতি
স্থলভাগে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান প্রকল্পে প্রায় আড়াইশ’ কোটি টাকার অনিয়ম-দুর্নীতি ধরা পড়ে খোদ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম একপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি- বাপেক্সের নিজস্ব তদন্তে। তদন্তে থ্রি-ডি সাইসমিক প্রজেক্ট অফ বাপেক্স প্রকল্পে ত্রি-মাত্রিক জরিপের মান ও ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করা হয়। এই প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন মেহেরুল হাসান শামীম। প্রকল্প পরিচালক মেহেরুল হাসান টেন্ডার ছাড়াই আর্নিব এন্টারপ্রাইজকে বিপুল অঙ্কের টাকার কাজ পাইয়ে দিয়েছেন এবং কাজে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে বলে তদন্তে উঠে আসে।

এ সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্প পরিচালক মেহেরুল হাসান ও আর্নিব এন্টারপ্রাইজ মিলে ২৪৭ কোটি ৭০ লাখ টাকায় ৯টি স্থানে জরিপ করে। এ জায়গাগুলোর মধ্যে কোনোটি বড় আবার কোনোটি অনেক ছোট। জায়গা যাই হোক না কেন, প্রতিটির জন্য সমান যন্ত্রপাতি ও শ্রমিক দেখানো হয়েছে। ফলে ব্যয়ের হারও সমান হয়েছে। যাতে অনিয়মের ছাপ স্পষ্ট। আর্নিব এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মেহেরুল বাপেক্সে দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য গড়ে তুলেন। বিনা টেন্ডারে কাজ পাইয়ে দেওয়া, শ্রমিক নিয়োগ ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ের মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছে সরকারি অর্থ।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সারা বছর ৯টি স্থানে দৈনিক ১ হাজার ২০০ শ্রমিক কাজ করেছেন বলে দাবি প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের। এমনকি ৯টি জরিপেই সমপরিমাণ যানবাহনের ব্যবহার দেখিয়েছে তারা। কিন্তু এসব তথ্য বাস্তবসম্মত মনে করে না বাপেক্সের তদন্ত কমিটি। প্রতিবেদনে বলা হয়- শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা সার্বক্ষণিক কর্মরত জনবল ছিল ১২০০ জন। এতে জনবল বাবদ ব্যয় দেখানো হয়েছে ৮০ কোটি টাকা। আর যানবাহনের ব্যয় দেখিয়েছে ৮০ কোটি টাকা। তবে জরিপ এলাকাগুলোর মধ্যে ১৫০, ২০০, ৩০০ ও ৬০০ বর্গকিলোমিটার জায়গাও ছিল। সেখানেও একই শ্রমিক ও একই পরিমাণ যানবাহন দেখানো হয়েছে। প্রকল্পে নিয়ম না মেনে যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। প্রথম ধাপে ২ কোটি ৮০ লাখ ও দ্বিতীয় ধাপে ১৪ কোটি ৮ লাখ টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হলেও সেগুলো আসেনি। প্রকল্পের সার্ভে, ডিজাইন, উপাত্ত সংগ্রহ-প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে বৈদেশিক কেনাকাটা, পরামর্শক, লোকবল সাপ্লাইসহ সব কাজ একই প্রতিষ্ঠানের পাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রকল্প প্রধান মেহেরুল হাসানের সাথে যোগসাজশের কথা বলেছে তদন্ত কমিটি।

দুর্নীতি প্রমাণিত এবং দুদকের মামলার পরও পদোন্নতি!
থ্রি-ডি সাইসমিক প্রজেক্ট অফ বাপেক্স প্রকল্পে আড়াইশ’ কোটি টাকার দুর্নীতি ধরা পড়ে ২০২২ সালে। মেহেরুল হাসান শামীম তখন ছিলেন বাপেক্সের উপমহাব্যবস্থাপক পদে। দুর্নীতি হাতেনাতে প্রমাণিত হওয়ায় তাকে তখন পেট্রোবাংলায় রিজার্ভায়ার এন্ড ডাটা ম্যানেজমেন্ট বিভাগে উপমহাব্যবস্থাপক পদে প্রেষণে বদলি করা হয়। কিন্তু অবাক ব্যাপার হলো, বাপেক্সের তদন্তে দুর্নীতি প্রমাণিত এবং পরবর্তীতে দুদক তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দায়ের করলেও এ সবকিছুকে ধামাচাপা দিয়ে তিনি অবৈধভাবে মহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি বাগিয়ে নেন, তাও সিনিয়রদের ডিঙিয়ে। আর সেই মেহেরুলই এখন বাপেক্সের গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা বিভাগে পদায়ন পেয়েছেন।

এসপি মাহবুবের ঠিকাদারি ব্যবসা
মেহেরুল হাসান শামীম ছাত্রজীবনে সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি বাহাদুর বেপারী ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মামুন মোর্শেদ জয়ের (পরবর্তীতে শেখ হাসিনার পিএস) ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশ নিয়েছেন। বাপেক্স ও পেট্রোবাংলায় আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৬ বছর একচ্ছত্র প্রভাব ছিল মেহেরুলের। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, এই পরিচয় ছাড়াও শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এসপি মাহবুবের ভাগ্নির স্বামী হওয়ার সুবাদে তিনি অতিরিক্ত ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। এসপি মাহবুব (বর্তমানে কানাডায় পলাতক) বিদেশে বসে পেট্রোবাংলায় ব্যবসা-টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করলেও মেহেরুলের মাধ্যমেই মূলতঃ এ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

শীর্ষনিউজ