সারাদেশের অলি-গলি থেকে রাজপথ কিংবা মহাসড়ক–সবখানেই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার নির্বিঘ্ন যাতায়াত। দেশের আইনে এই যান তৈরি, বিক্রি ও চালানো অপরাধ। তবে আইনের কথা কেবল কাগজে। গত তিনটি সরকার এই বাহন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি।
ঢাকা শহরে দ্রুত গতির ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কারণে নানা দুর্ঘটনাও নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারাদেশেই এখন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের ব্যবহার ও বিক্রি বেড়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে বিভিন্ন অলিগলিতে চললেও ঢাকা শহরে দিনের বেলা অটোরিকশা চালানো নিয়ন্ত্রণ করা হতো। তখন ঢাকার প্রধান সড়কগুলোতে অটোরিকশা চলত রাত ১১টার পর থেকে ভোর পর্যন্ত। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিংবা বর্তমানে ক্ষমতাসীন সরকার–কেউই অটোরিকশা সেভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। ঢাকার প্রায় সব রাস্তাতেই যেকোনো সময় দেখা যায় অটোরিকশা।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, এত অটোরিকশার চালক কোথা থেকে এল? অটোরিকশা চালানোর আগে তারা কী করতেন?
খাটনি কম, আয় বেশির আশায় ঢাকামুখী মানুষ
জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের তথ্য বলছে, জীবিকার তাগিদ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছর সারা দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ মানুষ ঢাকা আসছে। বৈশ্বিক সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা জেলার জনসংখ্যা ৩ কোটি ৬৬ লাখ। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সাল থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতি বছর ঢাকা মহানগরের জনসংখ্যা ৫ শতাংশ করে বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ, ২০৫০ সালের মধ্যে ঢাকা শহরের জনসংখ্যা পৌঁছাবে প্রায় সাড়ে ৫ কোটিতে।
যদিও ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, প্রশাসনিক হিসাবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ এবং পুরো ঢাকা জেলার জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৪৭ লাখ।
গ্রাম থেকে ঢাকামুখী মানুষের ঢলের কারণে বিভিন্ন ফসল তোলার মৌসুমে শ্রমিক পাওয়া যায় না বলে অনেকের অভিযোগ। কয়েক মাস আগেই বোরো ধানের মৌসুম ছিল। তখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শ্রমিকের অভাবে বিপাকে পড়েন কৃষকরা। কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আগে দৈনিক ৫০০-৭০০ টাকায় একজন শ্রমিক কাজ করত। এখন দৈনিক ১০০০-১২০০ টাকা মজুরি দিতে হয়। যেখানে এক মণ ধান বিক্রি হয় ৯০০ থেকে ১৩০০ টাকায়, সেখানে একজন শ্রমিকের জন্য ১২০০ টাকা খরচ করা অনেকের কাছে কষ্টকর। কৃষি শ্রমিক সংকটের বড় কারণ–শ্রমিকরা ঢাকায় এসে এর থেকে কম পরিশ্রম করে আরও আয় করতে পারছে।
নেত্রকোণা থেকে দুই বছর আগে ঢাকায় অটোরিকশা চালাতে আসা গনি মিয়া চরচাকে বলেন, “দ্যাশে থাকতে কামলা দিতাম। রোজ ১ হাজার দিত, আর দুই বেলার খানা। সারা দিন অনেক খাটনি। এখন ঢাকা আইসা অটো চালাই। রোজ ১৫০০ থেকে ১৮০০ টাকা আসে। জমা ৪৫০ টাকা। বাকি টাকা আমার। খাটনি কম হয়, আলহামদুলিল্লাহ ভালা আছি।”
গণি মিয়ার মতো এমন আরও অনেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকা এসেছেন গত দুই বছরে। তাদের প্রায় সবাই অটোরিকশা চালান।
অটোরিকশার গ্যারেজ আর চালকদের সাথে কথা বলে জানা যায় দৈনিক একটি অটোরিকশা নিয়ে চালানোর পর গ্যারেজে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দেওয়া লাগে। দিনে দুইবার চার্জ দিলে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা চালানো যায়। অন্যদিকে প্যাডেল রিকশাচালকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন ১০০ থেকে ২০০ টাকা জমা দিয়ে সারা দিনের জন্য রিকশা নেওয়া যায়। আর দিন শেষে ১ হাজার থেকে ১২০০ টাকা আয় হয়।
প্যাডেলচালিত রিকশার চেয়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ব্যবহার বৃদ্ধির মূল কারণ দুটি। প্রথমটি হলো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার গতি বেশি। অল্প সময়ে বেশি ট্রিপ দিয়ে বেশি আয় করা যায়। দ্বিতীয়ত, অটোরিকশা চালাতে পরিশ্রম কম হয়। প্যাডেল রিকশা চালানোয় কায়িক শ্রম অনেক বেশি।

আসছে শিক্ষিত, বেকার যুবকরাও
দেশে জ্বালানি সংকটের কারণে কিছুদিন পরপরই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কলকারখানা। ফলে বাড়ছে বেকার মানুষের সংখ্যা। বাংলাদেশ প্রায় সাড়ে ৭ কোটি মানুষের বিশাল শ্রমবাজার। এর মধ্যে ৭ কোটি ২০ লাখ মানুষ সরকারি-বেসরকারি নানা ধরনের কাজে নিয়োজিত। সরকারি হিসাবে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা প্রায় ৩৫ লাখ। আর বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে নতুন করে প্রায় ছয় লাখ মানুষের চাকরি হারানোর আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। এমন হলে দেশে মোট বেকারের সংখ্যা ৪০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। ফলে সামগ্রিক বেকারত্বের হার বেড়ে ৫ শতাংশের ওপরে চলে যেতে পারে।
এ অবস্থায় অটোরিকশা চালানোর দিকে ঝুঁকে পড়ছে শিক্ষিত বেকার যুবকরাও। ঢাকার কয়েকটি রিকশার গ্যারেজ ঘুরে দেখা গেছে এসএসসি, এইচএসসি, এমনকি স্নাতক পাস করা বেকার যুবকরাও আসছেন এ পেশায়। অটোরিকশা চালানোর জন্য বিশেষ কোনো দক্ষতা বা শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রয়োজন হয় না। গ্যারেজ মালিকের সাথে সম্পর্ক কিংবা পরিচিত কোনো অটোরিকশা চালক থাকলে, তার মাধ্যমে ঢুকে পড়া যায় এ পেশায়। কয়েকটি গ্যারেজে জামানত হিসেবে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) ফটোকপি রাখতে হয় শুধু।
কুমিল্লার নিমসার ডিগ্রি কলেজ থেকে পড়াশোনা করে চার বছর বিভিন্ন চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়ে ঢাকা এসেছেন সাজিদ আহমেদ (ছদ্মনাম)। ঢাকাতে বিভিন্ন দোকানে বিক্রয়কর্মীর কাজ করে সুবিধা করতে পারেননি তিনি। পরে উপায় না পেয়ে পরিচিত একজনের মাধ্যমে একটি অটোরিকশা গ্যারেজে যোগাযোগ করেন সাজিদ।
গত দুই বছর ধরে ঢাকায় অটোরিকশা চালাচ্ছে তিনি। চরচাকে সাজিদ বলেন, “চাকরি না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। পরে দোকানে চাকরি নিয়ে দেখি মালিকরা অপমান করে। কাস্টমারদের ধমকও শোনা লাগে। নিজের মতো আয় করার জন্য অটো চালানোর পেশা বেছে নিই। এটায় অসম্মানের কিছু নাই। কোনো কাজই ছোট না। আমার মতো অনেকেই আছে, যারা চাকরি না পেয়ে অটো চালায়। প্যাডেল রিকশা চালালে গতর খাটানো লাগে। অটোতে সে সমস্যা নেই।”
অটো চালিয়ে প্রতি মাসে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা আয় হয় সাজিদের। তিনি বলেন, “একটা দোকানে বসলে ১৫-২০ হাজার টাকার বেশি আয় নাই। এখানে আমি মাসে এর প্রায় দ্বিগুণ কামাই করি। যতক্ষণ মন চায় কাজ করি। ব্যাটারি শেষ হলে রিকশা গ্যারেজে জমা দিয়ে দেই।”
রাজনৈতিক কর্মীরাও চালক!
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। দলের শীর্ষ প্রায় সব নেতা নিরাপদে দেশ থেকে পালিয়ে যান। অনেকে এখন জেলবন্দী। সরকারের পতনে বিপাকে পড়েন বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা। অনেকের বাড়িতেই হামলা হয়। নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে ফেরারি হয়ে পড়েন অনেকে।
তাদের অনেকেই পরিচয় গোপন করে ঢাকায় এসে বিভিন্ন নিম্ন আয়ের পেশায় যোগ দিয়েছেন। এর মধ্যে একটা বড় অংশ আছেন অটোরিকশা চালক হিসেবে। এমন কয়েকজনের সাথে কথা বলে চরচা। রাজধানীর উত্তরায় অটোরিকশা চালান মোবারক হোসেন (ছদ্মনাম)। রাজশাহী বিভাগের একটি জেলার ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। দল ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও শেষ করতে পারেননি তিনি।
মোবারক চরচাকে বলেন, “দল ক্ষমতায় নাই বলে এখন এই দশা। বাড়ি থেকে পালায়ে আসছি। গত দুই বছরে বাবা-মা এর সাথে দেখা হয় নাই। আমার নামে নাকি ৩০-এর উপরে মামলা করা হয়েছে।”
মোবারকের মতো ঢাকা শহরে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী অটোরিকশা চালানোসহ আরও বিভিন্ন ধরনের কাজে জড়িত।
ময়মনসিংহ বিভাগের একটি জেলার আওয়ামী লীগ নেতা শরিফুল খান (ছদ্মনাম) নিজ এলাকা থেকে পালিয়ে ঢাকায় আসেন ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট। প্রথম কিছুদিন গুলিস্তানে ফেরি করে শসা ও গাজর বিক্রি করতেন। পরে কামরাঙ্গীরচরের একটি অটোরিকশার গ্যারেজের সন্ধান পান।
শরিফুল চরচাকে বলেন, “এভাবেই অটো চালায়ে বেঁচে আছি। আয় যা হয়, নিজে চলাই কষ্ট। কয়েক মাস পরপর বাসা বদলাতে হয়। এমন ভোগান্তিতে পড়তে হবে জানলে স্বেচ্ছায় জেলে যেতাম। সেখানে অন্তত থাকা-খাওয়ার চিন্তা করতে হয় না।”
শ্যামলীর একটি গ্যারেজ মালিকের সাথে কথা বলে জানা যায়, নতুন চালকদের পরিচয় যাচাইয়ের জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নেই। পুরনো চালকদের রেফারেন্সেই নতুন চালক নিয়োগ দেওয়া হয়। চালকদের রাজনৈতিক পরিচয় এখানে মুখ্য না।

নিরাপত্তার জন্য শুধু এনআইডির ফটোকপি রাখা হয়।
ঢাকা শহরে প্রতিদিন নতুন অটোরিকশা নামছে, আর তার চালক হিসেবে আসছে নতুন নতুন মানুষ। অটোরিকশা চালানো হয়ে পড়েছে সহজলভ্য এক পেশা। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে সরকার নতুন নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে। সেই উদ্যোগে লক্ষাধিক অটোরিকশা চালকদের জন্য কী ব্যবস্থা থাকবে–সেটাই এখন দেখার বিষয়।