Image description

মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ হরমুজ প্রণালিতে মাইন বসাতে শুরু করেছে ইরান। অন্যদিকে তেহরানসহ অন্যান্য শহরে হামলা  বৃদ্ধির জেরে বুধবার তেলের দাম আরও বাড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছে তেহরান। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করেছে দেশটি। এদিকে হরমুজ প্রণালিতে মাইন বসানোর খবরে বেশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। বলেছেন, যদি সেখানে মাইন বসানো হয় তাহলে নজিরবিহীন ফল ভোগ করবে ইরান। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তেল অর্থনীতির বিশেষ এই জলপথই এখন যুদ্ধের কেন্দ্রে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সঙ্গে পরিচিত দুইজন সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানায়, (গতরাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত) মাইন বসানো তেমন বিস্তৃত করতে পারেনি ইরান। তবে দেশটির ছোট নৌযান ও মাইন বসাতে সক্ষম জাহাজের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ এখনো তাদের হাতে রয়েছে। ফলে প্রয়োজনে তারা এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে যেকোনো সময় শত শত মাইন বসাতে সক্ষম।

বর্তমানে হরমুজ প্রণালি ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ও দেশটির নিয়মিত নৌবাহিনীর হাতে রয়েছে। তারা ছড়িয়ে থাকা মাইন বসানোর নৌযান, বিস্ফোরক বোঝাই বোট এবং উপকূলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারির সমন্বয়ে একটি ‘মরণ ফাঁদ’ তৈরি করার সক্ষমতা রাখে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক পোস্টে বলেন, যদি ইরান হরমুজ প্রণালিতে কোনো মাইন পেতে থাকে, তাহলে আমরা চাই সেগুলো অবিলম্বে সরিয়ে ফেলা হোক। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, যদি মাইন বসানো হয়ে থাকে এবং তা সরানো না হয়, তাহলে ইরানকে নজিরবিহীন পরিণতি ভোগ করতে হবে। তবে তেহরান যদি মাইন সরিয়ে নেয়, তাহলে সেটি সঠিক পথে একটি বড় পদক্ষেপ হবে বলেও মন্তব্য করেন ট্রাম্প।

ট্রাম্পের এই পোস্টের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, ট্রাম্পের নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড হরমুজ প্রণালিতে মাইন বসানোর জাহাজগুলো ধ্বংস করছে। তিনি বলেন, আমরা সেগুলোকে নির্মম নির্ভুলতায় ধ্বংস করছি। ইরান যেন হরমুজ প্রণালিকে জিম্মি করতে না পারে, তা আমরা নিশ্চিত করবো। পরে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড সামাজিক মাধ্যমে জানায়, হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানের একাধিক নৌযান ধ্বংস করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৬টি মাইন বসানোর জাহাজও রয়েছে।

এর আগে আইআরজিসি সতর্ক করেছিল, প্রণালির মধ্যদিয়ে যাওয়া যেকোনো জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই কার্যত এই জলপথটি বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতির ঝুঁকি এতটাই বেশি যে, এটিকে ‘ডেথ ভ্যালি’ বা মৃত্যুফাঁদ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। মঙ্গলবার মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার জন্য সামরিক নিরাপত্তা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যায়নি। তবে এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, তার প্রশাসন এমন বিকল্প নিয়ে ভাবছে। এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প আরও বলেন, হরমুজ প্রণালি নিরাপদ থাকবে। সেখানে আমাদের অনেক নৌযান রয়েছে। মাইন শনাক্ত করার জন্য বিশ্বের সেরা সরঞ্জাম আমাদের হাতে আছে।

সিএনএন জানিয়েছে, বর্তমানে পারস্য উপসাগরে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন এবং আরও প্রায় ৪৫ লাখ ব্যারেল পরিশোধিত জ্বালানি কার্যত আটকে রয়েছে। ইরাক ও কুয়েতের মতো তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য হরমুজ প্রণালি ছাড়া অন্য কোনো রপ্তানি পথ নেই। বড় অর্থনীতির দেশগুলোর জোট গ্রুপ অব সেভেন বা জি-৭ ইঙ্গিত দিয়েছে, তেলের ঘাটতি মোকাবিলায় তারা মজুতকৃত তেল বাজারে ছাড়ার উদ্যোগ নিতে পারে।

এর আগে সপ্তাহের শুরুতে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলেও পরে কিছুটা কমে আসে এবং শেয়ারবাজারও ঘুরে দাঁড়ায়। বিনিয়োগকারীরা আপাতত ধারণা করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ইসরাইলের সঙ্গে শুরু করা এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার পথ খুঁজে পেতে পারেন। তবে বাস্তবে যুদ্ধক্ষেত্রে এখনো কোনো শান্তির ইঙ্গিত নেই। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়েও এখনো নিরাপদে জাহাজ চলাচলের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। বর্তমানে ইরানের উপকূলসংলগ্ন অবরুদ্ধ এই পথটি ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের পর সবচেয়ে বড় জ্বালানি সরবরাহ ব্যাঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইরানের কাছে প্রায় ৬ হাজার নৌ-মাইন থাকার দাবি যুক্তরাষ্ট্রের: মার্কিন কংগ্রেসের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের কাছে আনুমানিক ৫ থেকে ৬ হাজার নৌ বা সামুদ্রিক মাইন রয়েছে। গত বছর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় ২০২৫ সালে ইরান-ইসরাইল সংঘাতের পর। যেখানে ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ১২ দিনের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তেল ও গ্যাস বাজারে সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব কী হতে পারে, সেটিও প্রতিবেদনে আলোচনায় আসে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালেই ধারণা করা হয়েছিল যে তেহরানের কাছে ৫ হাজারের বেশি নৌ-মাইন রয়েছে। ২০২৫ সালের নতুন হিসাব অনুযায়ী সেই সংখ্যা কিছুটা বেড়ে প্রায় ৬ হাজারে পৌঁছেছে।

হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা: বুধবার হরমুজ প্রণালির জলসীমায় দু’টি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা হয়েছে বলে দাবি করেছে আইআরসিজি। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, থাইল্যান্ডের পতাকাবাহী বাল্ক ক্যারিয়ার মায়ুরি নায়েরের ওপর গুলি চালানো হয়, কারণ জাহাজটি সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে অবৈধভাবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করছিল। এ ছাড়া লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী এক্সপ্রেস রোম নামের একটি জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইরান। জাহাজটিতে ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রজেকটাইল নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে দাবি করেছে আইআরজিসি। জাহাজ চলাচল বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান মেরিন ট্রাফিক-এর তথ্য অনুযায়ী, আজকের আগে উভয় জাহাজই হরমুজ প্রণালি এলাকায় অবস্থান করছিল।

তেলের দাম অস্বাভাবিক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার হুমকি ইরানের: তেহরান সতর্ক করে বলেছে, বিশ্বকে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত বাড়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। ইরানের সামরিক কমান্ডের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফোকারি বুধবার যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তেলের দাম ২০০ ডলার ব্যারেল হতে পারে- এর জন্য প্রস্তুত থাকুন। কারণ তেলের দাম নির্ভর করে আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর, আর সেই নিরাপত্তা আপনারাই অস্থিতিশীল করেছেন। এদিন ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় ইরান। এর মাধ্যমে তেহরান দেখাতে চেয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সবচেয়ে তীব্র হামলার মধ্যেও তারা পাল্টা আঘাত হানতে এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করতে সক্ষম।

ব্যাংক লক্ষ্য করে হামলার হুমকি: তেহরানে একটি ব্যাংকের অফিসে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ব্যবসা করে এমন ব্যাংকগুলোতে হামলার হুমকি দিয়েছে ইরান। জোলফোকারি মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষকে ব্যাংক থেকে অন্তত এক হাজার মিটার দূরে থাকার পরামর্শ দেন।

যুদ্ধ থামার কোনো ইঙ্গিত নেই: একজন জ্যেষ্ঠ ইসরাইলি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ইসরাইলের নেতারা এখন ব্যক্তিগতভাবে মনে করছেন যে, ইরানের শাসনব্যবস্থা এই যুদ্ধ টিকে থাকতে পারে। আরও দুইজন কর্মকর্তা জানান, ওয়াশিংটন এখনো এই সামরিক অভিযান বন্ধের কাছাকাছি পৌঁছায়নি। যুদ্ধের শুরুতেই আহত হন মোজতবা খামেনি: একজন ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, যুদ্ধের শুরুতে বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার সময় তার ছেলে মোজতবা খামেনি সামান্য আহত হন। বর্তমানে তিনি সুস্থ এবং নিরাপদ আছেন বলে জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ছেলে ইউসেফ পেজেশকিয়ান। ওই হামলায় মোজতবার মা, স্ত্রী এবং এক ছেলে নিহত হন বলেও দাবি করা হয়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তিনি জনসমক্ষে আসেননি বা কোনো বক্তব্য দেননি। একটি সূত্র জানায়, ইসরাইলও মনে করে তিনি সামান্য আহত হয়েছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা: ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, মঙ্গলবার তারা উত্তর ইরাকে একটি মার্কিন ঘাঁটি, বাহরাইনে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সদর দপ্তর এবং মধ্য ইসরাইলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। বাহরাইনে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়, আর দুবাইয়ে বিমানবন্দরের কাছে দু’টি ড্রোন বিধ্বস্ত হয়ে চারজন আহত হন। তেহরানের বাসিন্দারা জানান, প্রতিদিন রাতের বিমান হামলায় এখন তারা অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এসব হামলায় কয়েক লাখ মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামাঞ্চলে চলে গেছে এবং তেলের ধোঁয়ায় শহরের আকাশ কালো হয়ে গেছে। ৫২ বছর বয়সী তেহরানবাসী ফরশিদ রয়টার্সকে ফোনে বলেন, গত রাতেও বোমা পড়েছে, কিন্তু আগের মতো ভয় পাইনি। জীবন চলতেই থাকে।

যুদ্ধে হতাহত বাড়ছে: জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাইদ ইরাভানি জানান, ২৮শে ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিমান হামলায় এখন পর্যন্ত ইরানে ১৩০০-এর বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। একই সময়ে লেবাননে ইসরাইলের হামলায়ও বহু মানুষ নিহত হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের হামলায় ইসরাইলে অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছে এবং লেবাননে দুইজন ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, এই সংঘাতে তাদের সাতজন সেনা নিহত এবং প্রায় ১৪০ জন আহত হয়েছে।