Image description
ইরানের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা । ইরানে ৬৬৬৮টি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত : রেড ক্রিসেন্ট । মধ্যপ্রাচ্যে তৃতীয় বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র । অস্ত্র উৎপাদন ৪ গুণ বাড়াতে রাজি মার্কিন কোম্পানি ।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলার অষ্টম দিনেও তেহরানজুড়ে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। ইরান শনিবারের এ হামলার পালটা জবাব দিতে ইসরাইল ও উপসাগরীয় আরব দেশের মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।

ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ছোবল থেকে রক্ষা পেতে লাখ লাখ ইসরাইলি মাটির নিচের বাংকারে আশ্রয় নিয়েছে। শত চেষ্টায় ইরানকে দমাতে না পেরে এ অবস্থায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শনিবার রাতেই ‘কঠোর হামলা’ করার হুমকি দিয়েছেন। তার এ হুমকির পর ইরানও হামলার জন্য নতুন মার্কিন স্থাপনার সন্ধান করছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তেহরানের বিমানবাহিনীর হামলায় এরই মধ্যে ২০০ জনের বেশি মার্কিন সেনা হতাহত হয়েছেন বলে ইরানের মুখপাত্র দাবি করেছেন। উত্তপ্ত এ পরিস্থিতির মধ্যে এক অভাবনীয় ও নাটকীয়ভাবে ইরানের প্রেসিডেন্ট প্রতিবেশী আর কোনো দেশে হামলা না চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন। খবর বিবিসি, আলজাজিরা, এএফপি, স্কাই নিউজ, সিএনএনের।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলায় শনিবার ভোরে তেহরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মেহরাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও ধোঁয়া দেখা গেছে। বার্তা সংস্থা এএফপির ছবিতে বিমানবন্দরের ভেতর দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। শনিবার থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে শনিবার পর্যন্ত সবচেয়ে বড় হামলাগুলো চালিয়েছে ইসরাইল। তাদের দাবি-একটি সামরিক একাডেমি, একটি আন্ডারগ্রাউন্ড কমান্ড সেন্টার এবং একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ভান্ডারে আঘাত হানা হয়েছে।

টানা বিমান হামলার শিকার হলেও ইরান এখনো পালটা আক্রমণের সক্ষমতা ধরে রেখেছে। শনিবার দুবাই, মানামা এবং রিয়াদের কাছে বিমান হামলার সাইরেন ও বিস্ফোরণ শোনা গেছে। সৌদি আরব রিয়াদের কাছে একটি মার্কিন সেনা ঘাঁটি লক্ষ্য করে ছোড়া ব্যালিস্টিক মিসাইল ধ্বংস করার দাবি করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তারা ১৫টি মিসাইল ও ১১৯টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিওতে দেখা গেছে, বিশ্বের ব্যস্ততম দুবাই বিমানবন্দরে একটি প্রজেক্টাইল আঘাত হেনেছে। বিমানবন্দরের ভবন ও পার্ক করা বিমানের পাশে ট্রেনের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় একটি বিস্ফোরণের দৃশ্য এএফপি যাচাই করেছে। এছাড়া জর্ডানও দাবি করেছে, গত এক সপ্তাহে ইরান তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে ১১৯টি মিসাইল ও ড্রোন ছুড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের অব্যাহত হামলার জবাব দিতে ইরান নতুন দফার হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে বলে জানিয়েছে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)। শনিবার ২৫তম দফার হামলায় এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বলে আইআরজিসির সংক্ষিপ্ত এক বিবৃতির বরাত দিয়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। এতে বলা হয়, আইআরজিসি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং সামরিক সহায়তা কেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে। এই অভিযানে হাইপারসনিক ফাতাহ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ব্যালিস্টিক এমাদ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। উল্লেখ্য, হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের গতির চেয়ে পাঁচগুণ বেশি গতিতে ছুটতে পারে। ঘণ্টায় এর গতি ৬ হাজার ১৭৪ কিলোমিটার বা ৩ হাজার ৮৩৬ মাইল।

এদিকে ইসরাইলকে সমুচিত শিক্ষা দিতে শুক্রবার মধ্যরাত থেকে এ পর্যন্ত ইরান ইসরাইলের দিকে অন্তত পাঁচটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে বলে জানিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। এ হামলার জেরে সারা রাত লাখ লাখ ইসরাইলিকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে (বাংকারে) অবস্থান করতে হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের ওপর চাপ বৃদ্ধি করতে ইরান এমন কৌশল নিয়েছে; যাতে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ইসরাইলিদের দীর্ঘ সময় আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতে বাধ্য করা যায়। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দেশবাসীকে জানানো হয়েছে, নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ধারণা করছিল হামলার প্রথম সপ্তাহেই ইরান থেকে অন্তত ১০০০ ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হতে পারে। তবে এ পর্যন্ত ২০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। ইসরাইলিদের দাবি, এটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ক্ষেত্রে ইরানের দুর্বল সক্ষমতাকে ফুটিয়ে তুলছে।

এদিকে শত চেষ্টার পরও ইরানকে দমাতে না পেরে সেখানে চলমান বিমান হামলাকে আরও ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি এই হুমকি দেন। ট্রাম্প তার পোস্টে লিখেছেন, ‘আজ (শনিবার) রাতে ইরানে ভয়াবহ হামলা চালানো হবে!’ তিনি আরও বলেন, ‘ইরানের খারাপ আচরণের কারণে এমন কিছু এলাকা এবং জনসমষ্টিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস ও নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে, যা এর আগে লক্ষ্যবস্তু হিসাবে ভাবা হয়নি।’ ট্রাম্প বলেন, ইরান মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিবেশীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে এবং ‘আত্মসমর্পণ’ করেছে। ‘আর তাদের দিকে হামলা চালাবে না’ বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বিরামহীনভাবে হামলা চালিয়ে যাওয়ায় এই প্রতিশ্রুতি এসেছে।

এর আগে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ফক্স নিউজকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, শনিবার রাতে ইরানের ওপর ‘আমাদের বৃহত্তম বোমাবর্ষণ কর্মসূচি’ পরিচালিত হবে। তিনি জানান, মার্কিন এ হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানাগুলোর ‘সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হবে’। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে অকার্যকর করে দিচ্ছি।’ এর আগে শুক্রবার ট্রাম্প ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’র দাবি তুলেছিলেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হুমকির পর ইরানও হামলা চালানোর জন্য নতুন মার্কিন স্থাপনা খুঁজছে বলে জানিয়েছেন ইরানের একজন কর্মকর্তা। সিএনএনকে ইরানের এক কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিস্তৃতি এবং সরাসরি তাদের হত্যা করার হুমকি দিয়েছে। তিনি বলেন, এ কারণে ইরান এখন আমেরিকান অঞ্চল, বাহিনী এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে পর্যালোচনা করবে। যেগুলো এখনো ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর লক্ষ্যবস্তু তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি, সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করে হামলা চালানো হবে।

এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান শনিবার রাষ্ট্রীয় টিভিতে সম্প্রচারিত ভাষণে বলেন, ‘যারা ভাবে ইরানি জনগণের নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করবে, তাদের সেই আশা নিয়ে কবরে যেতে হবে।’ প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর অনিচ্ছাকৃত হামলার জন্য রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত এক ভিডিও বার্তায় ক্ষমা চান ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত নমনীয় সুরে বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশগুলো, যারা আমাদের হামলার শিকার হয়েছে, তাদের কাছে আমি ক্ষমা চাওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। আমাদের কোনো প্রতিবেশী দেশ দখলের বিন্দুমাত্র অভিপ্রায় নেই।’ আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে ইরানি প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘এখন থেকে সশস্ত্র বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনো প্রতিবেশী দেশের ওপর হামলা চালাবে না।’ তবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যারা এই পরিস্থিতিকে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে চায়, তারা যেন ‘সাম্রাজ্যবাদের পুতুল’ না হয়। ইসরাইল বা যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন করা কোনো সম্মানের পথ নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের বিবৃতির পর এবার ইসলামিক রেভল্যুশানির গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) নিশ্চিত করল, তারা প্রতিবেশী দেশে আর হামলা করবে না। আইআরজিসি বলেছে, ‘আমরা প্রতিবেশীদের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করি, তবে যদি আক্রমণ অব্যাহত থাকে তবে সব মার্কিন-ইসরাইল ঘাঁটি এবং স্বার্থ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।’ প্রেসিডেন্টের ভিডিও বার্তা প্রকাশের পর আইআরজিসির খাতাম আল-আম্বিয়া সদর দপ্তর থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরানের অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব পরিষদ প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর আক্রমণ বন্ধ করার অনুমোদন দিয়েছে। যদি সেসব দেশ থেকে ইরানের ওপর আক্রমণ না আসে তাহলে সেখানে কোনো হামলা হবে না।

যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে মানবিক সংকটও চরম আকার ধারণ করেছে। ইরানি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, শুক্রবার পর্যন্ত ৯২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং প্রায় ৬ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। তবে ইরানিয়ান রেড ক্রিসেন্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শনিবার থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি হামলায় এখন পর্যন্ত ইরানে কমপক্ষে ১ হাজার ৩৩২ জন নিহত হয়েছেন।

জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ কোটি ডলারের রাডার ধ্বংস : একজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ৩০ কোটি ডলারের একটি রাডার ব্যবস্থা ইরান ধ্বংস করেছে, যা ভবিষ্যতে হামলা প্রতিহত করার আঞ্চলিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। ব্লুমবার্গ জানায়, সিএনএনের বিশ্লেষিত স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে যে যুদ্ধের শুরুর দিকেই জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত আরটিএক্স করপোরেশনের এএন/টিপিওয়াই-২ রাডার ও ব্যাটারিসহ সহায়ক সরঞ্জাম ধ্বংস হয়ে গেছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা পরে এই সরঞ্জাম ধ্বংস হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ব্লুমবার্গ আরও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বজুড়ে মোট আটটি থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, যার মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া ও গুয়ামও অন্তর্ভুক্ত।

ইরানে হামলায় ৬৬৬৮টি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত : ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে অন্তত ৬ হাজার ৬৬৮টি বেসামরিক স্থাপনাকে হামলার লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য জানা গেছে। ক্ষয়ক্ষতির তালিকার মধ্যে রয়েছে-৫৫৩৫টি আবাসিক ভবন বা ইউনিট, ১০৪১টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, ১৪টি চিকিৎসাকেন্দ্র, ৬৫টি বিদ্যালয়, ১৩টি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র।

ইরানে এক সপ্তাহে ৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা : যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে, এক সপ্তাহে ইরানে ৩ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক হালনাগাদ তথ্যে সেন্টকম আরও জানায়, এই সময়ের মধ্যে তারা ইরানের ৪৩টি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে তৃতীয় বিমানবাহী রণতরি পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র : যুদ্ধের উত্তাপের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করতে তৃতীয় বিমানবাহী রণতরি মোতায়েন করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ফক্স নিউজের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনী জানিয়েছে, ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ বৃহস্পতিবার মোতায়েন-পূর্ব প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। ফক্স নিউজ বলছে, এই ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপটি খুব শিগগিরই মোতায়েন করা হবে এবং এটি পূর্ব ভূমধ্যসাগরের দিকে রওয়ানা দেবে। সেখানে সম্প্রতি বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড অবস্থান করছিল। এদিকে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড বৃহস্পতিবার সুয়েজ খাল অতিক্রম করেছে এবং বর্তমানে এটি লোহিত সাগরে অবস্থান করছে। অন্যদিকে, ইরানের ওপর হামলা অব্যাহত রাখতে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন আগে থেকেই আরব সাগরে মোতায়েন রয়েছে।

যুক্তরাজ্যের বিমানঘাঁটিতে মার্কিন বোমারু বিমান বি-১ : যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্স (আরএএফ) ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিতে মার্কিন বিমানবাহিনীর একটি বি-১ ল্যান্সার বোমারু বিমান পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের সংবাদ সংস্থা প্রেস অ্যাসোসিয়েশন। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার চলতি সপ্তাহের শুরুতে ব্রিটিশ ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের অনুমতি দিতে সম্মত হন। এর আগে অসম্মতি জানালেও এখন তিনি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাতে প্রতিরক্ষামূলক হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে এই অনুমতি দিলেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক অ্যারোস্পেস ও প্রতিরক্ষা কোম্পানি বোয়িংয়ের তথ্য অনুযায়ী, ‘দ্য বোন’ ডাকনামের এই বি-১ বোমারু বিমানটি একটি দূরপাল্লার সুপারসনিক যুদ্ধবিমান। এটি মার্কিন বিমানবাহিনীর দ্রুততম বোমারু বিমান হিসাবে পরিচিত।

অস্ত্র উৎপাদন ৪ গুণ বাড়াতে রাজি মার্কিন কোম্পানি : শীর্ষস্থানীয় মার্কিন অস্ত্র নির্মাতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, তারা অত্যাধুনিক শ্রেণির সমরাস্ত্র উৎপাদন চারগুণ বাড়াতে সম্মত হয়েছে। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই তথ্য জানান। পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মাঝারি ও উচ্চ-মাঝারি মানের গোলাবারুদের কার্যত অন্তহীন সরবরাহ রয়েছে। উদাহরণ হিসাবে তিনি ইরান ও সম্প্রতি ভেনিজুয়েলায় এসব অস্ত্র ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও এসব অস্ত্রের ক্রয়াদেশ (অর্ডার) আরও বাড়ানো হয়েছে।

জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধাপরাধের’ অভিযোগ : জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির-সাঈদ ইরাভানি অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল অপরাধ করার ক্ষেত্রে কোনো চরমসীমা বা রেড লাইন মানছে না। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে স্থানীয় সময় শুক্রবার বিকালে দেওয়া এক বক্তব্যে ইরাভানি এ মন্তব্য করেন। ইরাভানি বলেন, এই দুই দেশ স্কুল, হাসপাতাল, বিনোদন ও ক্রীড়া কেন্দ্রসহ জনবহুল বেসামরিক এলাকা এবং অবকাঠামোতে হামলা চালাচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘এসব কর্মকাণ্ড স্পষ্টত যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শামিল।’ এদিকে ফিলিস্তিনের গাজায় বছরের পর বছর ধরে ‘গণহত্যা’ চালানো দখলদার ইসরাইলও এবার ইরানের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধাপরাধের’ অভিযোগ তুলছে। ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বলেছে, ক্লাস্টার বোমা ব্যবহারের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধ করছে ইরান। শুক্রবার এক ব্রিফিংয়ে আইডিএফের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাদাভ শোশানি এ অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ইরান ক্লাস্টার বোমা ব্যবহার করছে এবং ইসরাইলের সামরিক-বেসামরিক এলাকায় এ পর্যন্ত কয়েকবার এই বোমা ব্যবহার তারা করেছে। এটা যুদ্ধাপরাধ, কারণ আপনারা জানেন, বেসামরিক এলাকায় ক্লাস্টার বোমা ব্যবহার করা নিষিদ্ধ।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধে যোগ দেবে না জার্মানি : ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন জার্মানির ভাইস চ্যান্সেলর লার্স ক্লিংবেইল। তিনি এই যুদ্ধের আন্তর্জাতিক বৈধতা নিয়েও ‘সন্দেহ’ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, জার্মানি এই সংঘাতের অংশ হবে না। জার্মান সংবাদমাধ্যম আরএনডিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভাইস চ্যান্সেলর ক্লিংবেইল বলেন, ‘আমি পরিষ্কার করে বলছি-এটি আমাদের যুদ্ধ নয়। আমরা এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করব না। তবে ভাইস চ্যান্সেলরের এই অবস্থান জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্ৎসের অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত। চ্যান্সেলর এর আগে ঘোষণা করেছিলেন, সরকার ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে একমত। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, ইসরাইলের প্রতি তেহরানের হুমকি এবং প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদে সমর্থনের বিষয়ে মের্ৎস পশ্চিমা মিত্রদের পাশে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।

ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এ থাকছে না ইন্দোনেশিয়া : মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষিত উদ্যোগ ‘বোর্ড অব পিস’সংক্রান্ত সব ধরনের আলোচনা স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে ইন্দোনেশিয়া। ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুগিওনো বলেছেন, ওই অঞ্চলে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণে এই উদ্যোগে অংশগ্রহণ স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতি উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারকে সরাসরি প্রভাবিত করেছে বলে জানান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সঙ্গে যোগ দিলে ইউরোপীয় দেশগুলোও ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হবে : ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভানচি ইউরোপীয় দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেছেন, তারা যদি এই আগ্রাসী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের সঙ্গে যোগ দেয়, তবে তারাও ইরানের পালটা হামলার ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসাবে গণ্য হবে। ফ্রান্স ২৪-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাখত-রাভানচি বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানিয়েছি, তারা যেন এই আগ্রাসনের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত না হয়।’ তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘যদি কোনো দেশ ইরানের বিরুদ্ধে এই আগ্রাসনে অংশ নেয়, তবে নিশ্চিতভাবে তারা ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার শিকার হবে।’

পেজেশকিয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখবেন পুতিন : ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখবেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। রুশ প্রেসিডেন্টের দপ্তর ক্রেমলিন থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে এ তথ্য। বাংলাদেশ সময় শুক্রবার রাত ৩টার দিকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয় প্রেসিডেন্ট পুতিনের। এই ফোনালাপের কিছুক্ষণ পর একটি বিবৃতি দেয় ক্রেমলিন। মার্কিন গোয়েন্দাদের বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে, এ যুদ্ধে ইরানকে গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া। মধ্যপ্রাচ্যের কোথায় কোথায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আছে, সেসব ঘাঁটির সেনাসংখ্যা, অস্ত্র, যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো বিভিন্ন গোয়েন্দা চ্যানেলে তেহরানকে জানাচ্ছে মস্কো।

যুদ্ধের প্রথম ৪ দিনে ব্যয় ১১০০ কোটি ডলার : ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় হচ্ছে বলে উল্লেখ করেছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে স্বীকার করেছে যে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনের কেবল প্রথম চার দিনে খরচ হয়েছে ১১০০ কোটি ডলার। এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, মার্কিন যুদ্ধ-মন্ত্রণালয় পেন্টাগন ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র কিনতে বাজেট সরবরাহের বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য সংসদ বা কংগ্রেসের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

ইরানে ধর্মীয় নেতার শাসনে ‘আপত্তি’ নেই ট্রাম্পের : ইরানের পরবর্তী শাসক হিসাবে আবারও কোনো ধর্মীয় নেতা এলেও আপত্তি নেই বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ইরান গণতান্ত্রিক হবে কিনা, তা নিয়েও তার কোনো মাথাব্যথা নেই। সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, সেটি নির্ভর করছে ব্যক্তির ওপর। ধর্মীয় নেতাদের নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি অনেক ধর্মীয় নেতার সঙ্গে কাজ করি এবং তারা চমৎকার। ট্রাম্প মনে করেন, ইরানের জন্য গণতান্ত্রিক নেতার খুব একটা প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, আমি বলতে চাচ্ছি এমন একজন নেতা প্রয়োজন যিনি নিরপেক্ষ ও ন্যায়পরায়ণ হবেন। তিনি ভালো কাজ করবেন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখবেন। সেই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ, যারা আমাদের অংশীদার, তাদের সঙ্গেও ভালো আচরণ করবেন।

বিশাল তেল মজুতের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিতেই ইরানে হামলা : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের মধ্যে একটি বিতর্কিত মন্তব্য নতুন করে ভূ-রাজনৈতিক বিতর্ক উসকে দিয়েছে। হোয়াইট হাউজের এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেছেন, ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের একটি অংশ হলো ইরানের বিশাল তেল মজুতের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়া। এ জন্যই সেখানে হামলা করা হয়েছে। ওয়াশিংটন হেরাল্ডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউজের ন্যাশনাল এনার্জি ডমিনেন্স কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক জ্যারড অ্যাজেন এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো ইরানের বিশাল তেলের মজুত সন্ত্রাসীদের হাত থেকে কেড়ে নেওয়া। তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, এটি মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা শক্তিগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগকে আরও জোরালো করে যে-এই অঞ্চলে হস্তক্ষেপের পেছনে মূলত প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন জড়িত। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রমাণিত তেলের জোগানদাতা। ফলে দেশটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানের তেল রপ্তানি সীমিত করার চেষ্টা করেছে।