ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রকে সামনে রেখে প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মহাকাশ, সাইবার যুদ্ধ এবং ইলেকট্রনিক স্পেকট্রাম সক্ষমতা জোরদারে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। আইডিএফের প্রযুক্তি ও ডিজিটাল প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়েল গ্রসম্যান দ্য জেরুজালেম পোস্টকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে বলেছেন, নতুন বাস্তবতায় শুধু অতীতের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নয়, আগামী দিনের সংঘাতের জন্যও বাহিনীকে পুনর্গঠন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, একটি তথ্য বিপ্লব চলছে। আইডিএফের প্রয়োজনীয় তথ্য ও সক্ষমতা আমাদের সর্বত্র নিয়ে যেতে হবে। শুধু আগের যুদ্ধের জন্য নয়, আসন্ন যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে। তাই আমাদের সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে সংগঠিত হতে হবে।
গ্রসম্যান বলেন, ইসরায়েল এখন উপলব্ধি করছে যে শক্তিশালী মহাকাশ কৌশল ছাড়া ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব নয়। কারণ, আধুনিক যুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে ডেটা এবং নজরদারি।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, আইডিএফ চিফ অব স্টাফ ইয়াল জামির চলতি বছরের জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ঘোষিত পাঁচ বছর মেয়াদি সামরিক পরিকল্পনায় মহাকাশকে অগ্রাধিকারের তালিকায় রেখেছেন।
গ্রসম্যান বলেন, আইডিএফ প্রধান স্পষ্ট বলেছেন, আমরা মহাকাশকে উপেক্ষা করতে পারি না। এরপর থেকেই মহাকাশ-সংশ্লিষ্ট উদ্যোগে আমাদের বিপুল শক্তি ও সম্পদ বরাদ্দ করা হয়েছে।
তার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪৫ বছর আগে ইসরায়েল মহাকাশ কর্মসূচি শুরু করলেও বর্তমানে দেশটি স্যাটেলাইট যোগাযোগ ও স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারিতে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জুনে পরিচালিত ১২ দিনের অভিযানে ইরানের ১২ হাজারের বেশি ছবি সংগ্রহ করা হয়। পরে ২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধ চলাকালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ হাজারেরও বেশি।
গ্রসম্যান জানান, ইসরায়েলের সীমান্ত থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে বিমানবাহিনীর অভিযান পরিচালনার অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে নতুন স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা।
তার মতে, ভবিষ্যতে আরও বেশি ডেটা স্থানান্তর এবং মহাকাশভিত্তিক নতুন সক্ষমতা তৈরির জন্য একাধিক পেলোডসহ নতুন স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করতে হবে এবং সেই সক্ষমতা ইসরায়েল অর্জন করছে।
রাশিয়া, চীন ও ইরানের মহাকাশে স্যাটেলাইট ধ্বংস কিংবা কক্ষপথ থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রযুক্তি উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মহাকাশ থেকেও হুমকি রয়েছে। আমরা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বৃহত্তর প্রতিরক্ষা কাঠামোর বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করছি।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো আলাদা স্পেস কমান্ড গঠনের বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইসরায়েলের পুরো মহাকাশ ইকোসিস্টেমকে একই কাঠামোর আওতায় আনা।
তার ব্যাখ্যায়, এতে স্যাটেলাইট যোগাযোগ, নজরদারি, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক স্পেকট্রাম, স্যাটেলাইট প্রতিরক্ষা, স্যাটেলাইট আক্রমণ এবং নতুন প্রকৌশল সক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আইডিএফ তাদের সিফোরআই ও সাইবার প্রতিরক্ষা অধিদপ্তর পুনর্গঠন করে। এর আওতায় গঠন করা হয় নতুন এআই-কেন্দ্রিক ব্রিগেড স্ফেইরা এবং সম্প্রসারিত ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ইউনিট। এই ব্রিগেড ইলেকট্রোম্যাগনেটিক স্পেকট্রাম, এআই এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত পরিচালনা করছে।
আইডিএফের দাবি, ২০২৫ সালের জুনে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলের দিকে ছোড়া প্রায় ১ হাজার ১০০টি ড্রোনের মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ নিষ্ক্রিয় করে ৫১১৪তম স্পেকট্রাম ওয়ারফেয়ার ব্যাটালিয়ন।
সূত্রমতে, ইরান ও লেবাননে পরিচালিত স্পেকট্রাম-সম্পর্কিত অভিযান ছিল যুদ্ধের সবচেয়ে কম আলোচিত অথচ গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি।
গ্রসম্যান বলেন, ২৮শে ফেব্রুয়ারির আগের মাসগুলোতে, গ্রসম্যানের কমিউনিকেশনস কমান্ডের ক্ষেত্রে আইডিএফ প্রায় যুদ্ধকালীন প্রস্তুতির কাছাকাছি ছিল। অনেক দিক থেকেই, যদিও দুটি ঘটনার মধ্যে প্রায় আট মাস সময় কেটে যায়, অপারেশন রোয়ারিং লায়ন ছিল সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে জুন ২০২৫-এর যুদ্ধের একটি সম্প্রসারণ বা দ্বিতীয় পর্ব। অপারেশন রাইজিং লায়ন থেকে আমরা ইরানের সাথে যুদ্ধ করার বিষয়ে অনেক কিছু শিখেছি। আমরা সামরিক শক্তি ব্যবহারের একটি নতুন কৌশল শিখেছি, যা যুদ্ধ এবং তথ্যের কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের উপর আলোকপাত করে।
বিষয়টি তিনি ব্যাখ্যা করলেন এভাবে, এর ফলে আমরা যুদ্ধ-সম্পর্কিত কয়েক ডজন নতুন সমাধান অর্জন করতে পেরেছিলাম। তবে তিনি কিছু গোপনীয় শিক্ষা গোপন রাখেন।
আইডিএফের অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারা জেরুজালেম পোস্টকে জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের যুদ্ধের সময় বিমান বাহিনী ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পে ২,৬০০টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
বিমান বাহিনী যখন এত বিপুল সংখ্যক লক্ষ্যবস্তুর সন্ধান করত, তখন তারা গ্রসম্যানের ব্রিগেডের সরবরাহ করা একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করত।
গ্রসম্যান বলেন, আমরা আইডিএফ-এর তথ্য কারখানা নির্মাণ ও পরিচালনা করছি। কমিউনিকেশনস কমান্ডের আগে থেকেই একটি ডেটা সেন্টার এবং ডেটাবেস ছিল। এখন বিমান বাহিনী, সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ এবং স্থল বাহিনীর নিজস্ব ডেটাবেস রয়েছে যা নিয়মকানুনের অধীনে পরিচালিত হয় এবং তারা ডিজিটাল আর্কিটেকচার ব্যবহার করছে, যা আইডিএফ-এর কার্যকারিতা বৃদ্ধি করবে এবং তথ্যের আরও ভালো ব্যবহারে সহায়তা করবে।
অপারেশন রাইজিং লায়ন এবং রোয়ারিং লায়ন চলাকালীন, গ্রসম্যানের ব্রিগেড (যোগাযোগ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে) দীর্ঘ দূরত্বে বিপুল পরিমাণ ডেটা সংগ্রহ ও স্থানান্তর করতে সক্ষম হয়েছিল, যার ফলে ইসরায়েল দূরবর্তী দেশগুলোর তৃতীয় বৃত্তটিকে ইসরায়েলের সীমান্তবর্তী দেশগুলোর প্রথম বৃত্তের সমান করে ফেলে। এই অবকাঠামোর ফলে সীমান্তবর্তী দেশ এবং হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে কার্যত কোনো পার্থক্য থাকছে না।
তিনি বলেন, এতে কোনো জাদু নেই। যোগাযোগ স্থাপন, ছবি তোলা, হাজার হাজার কিলোমিটার জুড়ে তথ্য প্রেরণ এবং হাজার হাজার কিলোমিটারের ফুটেজ রেকর্ড করার জন্য স্যাটেলাইটের প্রয়োজন হয়।
গ্রসম্যান উল্লেখ করেন, এর জন্য পদার্থবিদ্যা, বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সৃজনশীলতার প্রয়োজন, যাতে বিমান বাহিনীর কমান্ডার মাহা ইরানে এমনভাবে কাজ করতে পারেন যেন এটি একটি প্রথম সারির দেশ। আমরা নিশ্চিত করি যে আইডিএফের সমস্ত শাখা যখন এবং যেখানে চায়, পদক্ষেপ নিতে পারে।
তবে তিনি সতর্ক করে দেন যে, ইরানও পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছে এবং ক্রমাগত নিজস্ব পরিবর্তন আনছে।
গ্রসম্যান জানান, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শুধু ২০২৬ সালের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে নয়; বরং ২০৩৫ সালের সম্ভাব্য যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখে করা হচ্ছে।
কমিউনিকেশনস কমান্ডের মূল্যায়ন অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার প্রযুক্তি এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিং বিশ্বকে মৌলিক পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
যদিও বেসামরিক পর্যায়ে ইসরায়েলকে এআই ও ডেটা সেন্টার উন্নয়নে পিছিয়ে পড়ার সমালোচনা রয়েছে, আইডিএফের দাবি, সামরিক প্রেক্ষাপটে তাদের আলাদা সক্ষমত আছ্যাঃ।
নতুন এআই ব্রিগেড ডেটা সেন্টার, সফটওয়্যার, অপারেশনাল মডেল, ডেটা সায়েন্স এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিগত চাহিদা মূল্যায়নের কাজ করছে।
এই ব্রিগেডের নেতৃত্ব দিচ্ছেন পরিচয় গোপন রাখা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বি। বেসামরিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় প্রসঙ্গে কর্মকর্তারা বলেন, যেখানে যৌথভাবে কাজ করা সম্ভব, সেখানে তারা একসঙ্গে কাজ করেন; আর প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা দায়িত্বও পালন করেন।
গ্রসম্যানের মতে, সাইবার প্রতিরক্ষা শুধু নিজের নেটওয়ার্ক রক্ষা নয়; বরং শত্রুর ডিজিটাল অবকাঠামোতেই হুমকি মোকাবিলা করা বেশি কার্যকর। যোগাযোগ কমান্ড নিজের নেটওয়ার্কের বাইরেও কী ঘটছে তা পর্যবেক্ষণ করে আগাম প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
তার মতে, আইডিএফের বিশেষ প্রযুক্তিগত অবকাঠামো রাষ্ট্র-সমর্থিত হ্যাকারদের হাত থেকেও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম।
গাজায় মানবিক সহায়তা বিতরণে ব্যর্থতার প্রসঙ্গে আইডিএফের যোগাযোগ কমান্ড জানায়, তথ্য যতই নির্ভুল হোক, বাস্তব পরিস্থিতিতে সবসময় তা একইভাবে কার্যকর হয় না।
তাদের মতে, হামাস যদি সহায়তা দখল করতে চায়, তাহলে অ্যালগরিদম দিয়ে সেই বাস্তবতা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। কারণ খাদ্য সহায়তাসহ সব বিষয়ে সরকার যে নীতি নির্ধারণ করে, আইডিএফ সেটিই অনুসরণ করে।
আইডিএফ জানায়, সব সেন্সর থেকে সংগৃহীত তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডেটা প্ল্যাটফর্মে পাঠানো হয়। এই তথ্য বিশ্লেষণ করে এফপিভি ড্রোন এবং ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্র মোকাবিলায় নতুন কৌশল তৈরি করা হচ্ছে।
তবে সামরিক বাহিনী স্বীকার করেছে, এফপিভি ড্রোনের বিরুদ্ধে এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ সমাধান তাদের হাতে নেই এবং এটি তৈরি করতে আরও কয়েক মাস বা কয়েক বছর লাগতে পারে।
গ্রসম্যান বলেন, শত্রুর হুমকির ধরন ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণে এআইভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সংগৃহীত তথ্যই বহু সেনার জীবন রক্ষা করেছে।
আইডিএফের বহু প্রযুক্তি ইউনিটকে ধাপে ধাপে বেয়ারশেবা অঞ্চলের নতুন ক্যাম্পাসে স্থানান্তর করা হচ্ছে। ২০২০-এর দশকজুড়ে আইডিএফের বিভিন্ন ইউনিট এবং ইসরায়েল ন্যাশনাল সাইবার ডিরেক্টরেট সেখানে স্থানান্তরিত হয়েছে। খুব শিগগিরই আরও বড় পরিসরে এই স্থানান্তর সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।