আগামী কয়েক মিলিয়ন বছরের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে সাব-সাহারান আফ্রিকা। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, হয়তো এই বিশাল ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পর্যায়ের সাক্ষী হচ্ছেন তারা।
এই বিভাজন ঘটতে পারে কাফু রিফট বরাবর। এটি তানজানিয়া থেকে নামিবিয়া পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৫০০ মাইল বা ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রিফট লাইনের অংশ। রিফট হলো পৃথিবীর ভূত্বকে সৃষ্ট ফাটল। এটি ভূপৃষ্ঠে অস্থিরতা তৈরি করে এবং ভূমিধস কিংবা ভূমিকম্পের কারণ হতে পারে। এমন হাজার হাজার রিফট রয়েছে পৃথিবীতে। এর অধিকাংশই বর্তমানে নিষ্ক্রিয় বা মৃত। তবে কোনো কোনোটি সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে আবার।
ভূতত্ত্ববিদরা এতদিন মনে করতেন, কাফু রিফট বহু আগেই নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। তবে গত কয়েক দশকে এতে নতুন সক্রিয়তার লক্ষণ দেখা গেছে বলে দাবি করছেন কিছু বিশেষজ্ঞ। দিন দিন বাড়তে থাকা প্রমাণ ইঙ্গিত দিচ্ছে, এটি হয়তো নতুন একটি মহাদেশীয় রিফটে রূপ নিচ্ছে। ভবিষ্যতে তৈরি করতে পারে নতুন টেকটোনিক প্লেট সীমারেখা। এর ফলেই একসময় সৃষ্টি হতে পারে একেবারে নতুন সমুদ্র।
আগের গবেষণায়ও এমন কিছু ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। মানুষের অনুভবের বাইরে থাকা ক্ষুদ্র ভূমিকম্প, ভূগর্ভস্থ তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং স্যাটেলাইটের মাধ্যমে শনাক্ত হওয়া ভূমির সূক্ষ্ম উচ্চতা পরিবর্তন দেখিয়েছে, এলাকাটি সম্ভবত টেকটোনিকভাবে সক্রিয়।
প্লেটগুলোর সীমারেখার অধিকাংশই মহাসাগরের নিচে অবস্থিত। এগুলো কখনো একে অপরের পাশ ঘেঁষে সরে যায়, কখনো সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, আবার কখনো দূরে সরে যায়। আর এসব সীমান্ত এলাকাতেই সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ দেখা যায়
এবার ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন আর্থ সায়েন্স’ সাময়িকীতে সোমবার প্রকাশিত নতুন এক গবেষণা আরও এক ধাপ এগিয়েছে। গবেষণার প্রধান লেখক রুতা কারোলাইতে বলেছেন, ‘এই অঞ্চল থেকে আমরা প্রথমবারের মতো ভূ-রাসায়নিক তথ্য পেয়েছি। এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের প্রমাণ, যা রিফট সক্রিয় থাকার ধারণাকে আরও জোরালো করে।’
রুতা কারোলাইতে গবেষণাটি পরিচালনা করেছিলেন ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্টডক্টরাল গবেষক থাকাকালে। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রাকৃতিক হাইড্রোজেন অনুসন্ধান প্রতিষ্ঠান স্নোফক্স ডিসকভারিতে প্রধান পণ্যবিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত।
বিজ্ঞানীদের মতে, নতুন একটি মহাদেশীয় রিফট নিয়ে গবেষণা টেকটোনিক বিজ্ঞানের অন্যতম মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সহায়তা করবে। নতুন প্লেট সীমারেখা কীভাবে তৈরি হয়?
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ডেভিসের আর্থ অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক এসটেলা আটেকওয়ানা বলেছেন, ‘পরিপক্ব প্লেট সীমারেখা সহজে শনাক্ত করা যায়। কিন্তু এর প্রাথমিক ধাপগুলো অনেক সূক্ষ্ম ও জটিল।’
তার মতে, যদি কাফু রিফট সত্যিই নতুন প্লেট সীমারেখার অংশ হয়ে থাকে, তবে এটি হবে এক বিরল সুযোগ। যেখানে বিজ্ঞানীরা আগ্নেয়গিরি, বড় ভূমিকম্প বা ব্যাপক ভূমি বিকৃতির আগেই পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন প্লেট সীমারেখার জন্ম প্রক্রিয়া।
গবেষকরা এই গবেষণার জন্য জাম্বিয়ার গুইশো এলাকার একটি উষ্ণ প্রস্রবণ থেকে গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করেন
গবেষণার অংশ হিসেবে কারোলাইতে ও তার সহকর্মীরা জাম্বিয়ার সন্দেহভাজন রিফটের ওপরে থাকা উষ্ণ প্রস্রবণ ও ভূ-তাপীয় কূপ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন। তিনি বলেছেন, ‘সেখানে গরম পানি বুদবুদ আকারে ওপরে উঠছিল। আর আমরা সেই গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করেছি।’
গবেষকরা বিশেষভাবে হিলিয়াম-৩ ও হিলিয়াম-৪ নামের দুই ধরনের হিলিয়ামের অনুপাত পরীক্ষা করেন। তাদের লক্ষ্য ছিল এই গ্যাসের উৎস পৃথিবীর ম্যান্টল কিনা তা নির্ধারণ করা। ম্যান্টল হলো পৃথিবীর ভূত্বক ও কেন্দ্রের মাঝের শত শত মাইল পুরু স্তর।
কারোলাইতে বলেছেন, ‘আমরা সাধারণ ভূত্বকে যতটা হিলিয়াম-৩ পাওয়া যায় তার চেয়ে বেশি পরিমাণে পেয়েছি। এটি সাধারণত ইঙ্গিত দেয় ম্যান্টল থেকে তরল পদার্থ ওপরে উঠে আসার।’
গবেষণার জন্য জাম্বিয়ার গুইশো এলাকা থেকে গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
তবে গবেষকরা বলছেন, এই ফলাফল এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের। কারণ নমুনা নেওয়া হয়েছে মাত্র ছয়টি স্থান থেকে। সেগুলোও ছিল ছোট একটি এলাকায়। তবুও তারা রিফট থেকে প্রায় ৯৫ কিলোমিটার দূরের আরও দুটি উষ্ণ প্রস্রবণ পরীক্ষা করে সেখানে একই ধরনের হিলিয়াম-৩ বৃদ্ধির প্রমাণ পাননি।
টেকটোনিক প্লেট প্রসারিত হয়ে আলাদা হতে শুরু করলে ম্যান্টলের উপাদান ভূপৃষ্ঠে উঠে আসতে পারে। তাই গবেষক দলের ধারণা, এই নতুন ভূ-রাসায়নিক তথ্য হয়তো নতুন প্লেট সীমারেখা গঠনের প্রাথমিক সংকেত।
দক্ষিণ আফ্রিকার অংশ আলাদা হয়ে যেতে পারে। তবে তার আগে আরও বেশি ভূমিকম্প হবে। দেখা দেবে লাভাসহ আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ। গভীর রিফট তৈরি হবে। সেখানে পানি জমে হ্রদের সৃষ্টি হবে, যেমনটি আজ ইস্ট আফ্রিকায় দেখা যায়। শেষ পর্যন্ত সেখানে তৈরি হতে পারে সমুদ্রও
টেকটোনিক প্লেট হলো বিশাল কঠিন শিলাস্তর। যার আকার কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার মাইল পর্যন্ত হতে পারে। এর পুরুত্ব প্রায় ১৯০ কিলোমিটার পর্যন্ত হয়। পৃথিবীর ইতিহাসের শুরু থেকেই এসব প্লেট ম্যান্টলের ওপর ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। যার গতি মানুষের নখ বাড়ার গতির মতো।
প্রায় ২০ কোটি বছর আগে এসব প্লেটের সঞ্চালনের ফলে প্যাঞ্জিয়া নামের বিশাল ভূখণ্ড ভেঙে আজকের মহাদেশগুলো তৈরি হয়। এখনো প্লেটগুলো চলমান রয়েছে। এই গতিশীলতাই ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির মতো ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়াকে চালিত করে।
প্লেটগুলোর সীমারেখার অধিকাংশই মহাসাগরের নিচে অবস্থিত। এগুলো কখনো একে অপরের পাশ ঘেঁষে সরে যায়, কখনো সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, আবার কখনো দূরে সরে যায়। আর এসব সীমান্ত এলাকাতেই সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ দেখা যায়।
একটি সক্রিয় রিফট ভবিষ্যতে প্লেট সীমারেখায় পরিণত হতে পারে, তবে তা নিশ্চিত নয়। কারোলাইতে বলেছেন, ‘অনেক সময় এসব রিফট শুরু হয়, আবার থেমেও যায়। কখনো কিছুটা বিস্তার লাভ করে আবার বন্ধ হয়ে যায়। কী ঘটবে, তা আগাম বলা কঠিন।’
আফ্রিকায় এরইমধ্যে কয়েক কোটি বছর পুরোনো সুপরিচিত একটি রিফট রয়েছে। যার নাম ইস্ট আফ্রিকান রিফট। সেখানে একাধিক আগ্নেয়গিরি রয়েছে। আর এলাকাটি ভূমিকম্পপ্রবণ।
তবে নতুন এই রিফটকেও একই পর্যায়ে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগবে। গবেষণার সহলেখক ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং অধ্যাপক মাইক ডেইলি বলেছেন, ‘সবচেয়ে দ্রুত হলেও এটি ঘটতে কয়েক মিলিয়ন বছর লাগবে। আর ধীরগতিতে হলে ১ থেকে ২ কোটি বছরও লাগতে পারে।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকার অংশ আলাদা হয়ে যেতে পারে। তবে তার আগে আরও বেশি ভূমিকম্প হবে। দেখা দেবে লাভাসহ আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ। গভীর রিফট তৈরি হবে। সেখানে পানি জমে হ্রদের সৃষ্টি হবে, যেমনটি আজ ইস্ট আফ্রিকায় দেখা যায়। শেষ পর্যন্ত সেখানে তৈরি হতে পারে সমুদ্রও।’
আকাশপথে তোলা ছবিতে জাম্বিয়ার কাফু নদীর জলাভূমি দেখা যাচ্ছেতবে নিকট ভবিষ্যতে জাম্বিয়া এই অঞ্চল থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে। সেখানে ভূ-তাপীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে উঠছে। একই সঙ্গে উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন হিলিয়াম গ্যাস সংগ্রহের সম্ভাবনাও রয়েছে। এটি চিকিৎসা ও প্রযুক্তি শিল্পে বহুল ব্যবহৃত।
গবেষকরা এখন আরও বিস্তৃত এলাকায় নতুন করে গ্যাস সংগ্রহ করছেন। যাতে এই ফলাফল নিশ্চিত করা যায়।
এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফোলারিন কোলাওলে। তিনি বলেছেন, ‘এই গবেষণা অত্যন্ত নতুন। কারণ এটি শক্তভাবে প্রমাণ করে যে নতুন রিফট অঞ্চলের মাধ্যমে ম্যান্টল থেকে তরল পদার্থ সরাসরি ভূ-পৃষ্ঠে উঠে আসছে।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘এখন আফ্রিকার পূর্বাংশ থেকে বতসোয়ানা ও নামিবিয়া হয়ে আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্ত মহাদেশ ভেঙে যাওয়ার একটি সম্ভাব্য পথ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।’
অন্যদিকে এসটেলা আটেকওয়ানা বলেছেন, ‘নমুনার সংখ্যা সীমিত হলেও ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো কাফু রিফটের গভীরে সক্রিয়তার শক্তিশালী ভূ-রাসায়নিক প্রমাণ দিচ্ছে। যদিও এখনো ম্যাগমা ভূপৃষ্ঠে পৌঁছায়নি।’
তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, পুরো প্রস্তাবিত সীমারেখাজুড়ে আরও প্রমাণ প্রয়োজন। যাতে বোঝা যায় হিলিয়ামের সংকেতটি ধারাবাহিক নাকি স্থানীয় কোনো ঘটনা। এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর মানে এই নয় যে আফ্রিকা আগামীকালই ভেঙে যাচ্ছে। এ ধরনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে লাগে লাখো থেকে কোটি বছর। তবে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি হবে যেন একটি নতুন প্লেট সীমারেখার জন্মমুহূর্ত প্রত্যক্ষ করার মতো ঘটনা।