কোরবানির ঈদ পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় চামড়ার বাজারে চরম দরপতন দেখা দিয়েছে। সরকার নির্ধারিত মূল্য থাকলেও মাঠপর্যায়ে সেই দামে চামড়া বিক্রি না হওয়ায় বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ী ও খুচরা সংগ্রহকারীরা। অনেক এলাকায় শত শত চামড়া সড়কের পাশে ফেলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ৩০০ টাকায় চামড়া কিনে তা আড়তে বিক্রি করেছে মাত্র ১০০ টাকায়। এতে লাভ তো দুরের কথা গাড়ি ভাড়াও তুলতে পারছেন না তারা। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন এসব ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে চামড়া না কিনে সিন্ডিকেট করে নিজেদের ইচ্ছেমতো চামড়া কিনছেন আড়ৎদাররা।
জানা গেছে, এবার বাজারে প্রতিটি গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২০০ থেকে ৪০০ টাকায়। ছাগলের চামড়া কেনার আগ্রহ নেই ব্যবসায়ীদের। সাধারণত ১২ থেকে ১৬ বর্গফুটের চামড়াকে ছোট আকার হিসেবে ধরা হয়। ১৭ থেকে ২২ বর্গফুট মাঝারি এবং ২৩ বর্গফুটের বেশি হলে সেটিকে বড় চামড়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
দেশের বিভিন্ন জেলায় চামড়ার দাম কমে প্রতি পিস ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় নেমে এসেছে। পাঁচ বছর আগে যেখানে একই চামড়া ৮০০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হতো, সেখানে এবারের বাজার পরিস্থিতিতে ব্যাপক হতাশা দেখা দিয়েছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবার ঢাকার বাইরে লবণযুক্ত খাসির চামড়ার দাম ২০ থেকে ২৫ টাকা এবং গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৫২ থেকে ৫৬ টাকা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে সেই দামে বিক্রি হচ্ছে না বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।
শরীয়তপুর পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় চামড়া সংগ্রহ ও লবণজাতকরণের কাজ চলছে। তবে দাম না পাওয়ায় চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, চামড়া সংগ্রহ, পরিবহন ও সংরক্ষণে অতিরিক্ত খরচ হলেও বাজারে ন্যায্য মূল্য মিলছে না।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল মালেক বলেন, চামড়া কিনে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করেও লোকসান গুনতে হচ্ছে। বাজারে দাম না থাকায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
শুক্রবার (২৯ মে) ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পুরাতন কাচারি মোড় ও টি.এ. রোড এলাকায় গরু, মহিষ ও ছাগলের শত শত চামড়া সড়কের পাশে ফেলে রাখতে দেখা যায়। এতে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পথচারীদের ভোগান্তি বাড়ে।
স্থানীয়রা জানান, ৫০০ টাকায় কেনা চামড়া ২০০ টাকাতেও বিক্রি করা সম্ভব হয়নি। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক ব্যবসায়ী চামড়া রাস্তায় ফেলে চলে যান।
মৌসুমি ব্যবসায়ী আলম বলেন, বড় আড়তদাররা চামড়া কিনতে না আসায় দাম আরও কমে গেছে। ফলে লোকসান ঠেকানো সম্ভব হয়নি।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া এবং সিন্ডিকেটের কারণে চামড়ার দাম পড়ে গেছে। অনেকে বলছেন, সীমান্তে কড়াকড়ি ও রপ্তানি সীমাবদ্ধতার কারণেও বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।
আরেক ব্যবসায়ী রফিক বলেন, দিন যত যাচ্ছে চামড়ার বাজার ততই খারাপ হচ্ছে। এবার ক্রেতার সংকট সবচেয়ে বেশি।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, রাস্তায় ফেলে যাওয়া চামড়া সংগ্রহ করে প্রয়োজন হলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হবে।
চামড়া ফেলে যাওয়ার বিষয়টি জানা গেছে। মালিক না থাকায় পৌরসভাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, চামড়াগুলো মাদ্রাসা ও আগ্রহী প্রতিষ্ঠানে বিতরণ করতে।
ব্যবসায়ীরা আরও জানান, ট্যানারি মালিকদের কাছে কোটি কোটি টাকা বকেয়া থাকায় তারা নতুন করে চামড়া কিনতে পারছেন না। ফলে বাজারে চাহিদা কমে গিয়ে দাম আরও পড়ে গেছে।
জয়পুরহাটের ব্যবসায়ী বলেন, এবার চামড়া প্রায় পানির দরে বিক্রি করতে হয়েছে। আগে যে চামড়া হাজার টাকার ওপরে বিক্রি হতো, এখন তা কয়েকশ টাকায় নেমে এসেছে।
চামড়ার বাজারে এই অস্থিরতা ও দরপতনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে সরকারের কার্যকর নজরদারি ও বাজার স্থিতিশীলতা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকাটাইমস