রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি ও ব্যয়চাপ সামাল দিতে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। চলতি অর্থবছরের ১০ মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই সরকারের নিট ব্যাংকঋণ দাঁড়িয়েছে ৯৯ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকায়। এক বছর আগে একই সময়ে এ ঋণের পরিমাণ ছিল ৫০ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য থেকে বিষয়টি জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারকে ধারাবাহিকভাবে ব্যাংকব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের তুলনায় বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিচ্ছে। এতে বাজারে অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার ৮১ কোটি টাকা। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরের জন্য ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। তবে জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত নয় মাসেই সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ৮ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে ৭৮ হাজার ৪৯ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৩০ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা।
এপ্রিলজুড়ে সরকারের ব্যাংকঋণে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা গেছে। গত ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ১২ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা। পরে ২১ এপ্রিল তা কমে ৯৭ হাজার ২৮১ কোটি টাকায় নামে। ২২ এপ্রিল আরও কমে দাঁড়ায় ৯৩ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকায়। তবে মাসের শেষ দিকে আবার ঋণ বাড়তে শুরু করে। ২৮ এপ্রিল শেষে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়ায় ১ লাখ ২৮২ কোটি টাকা। পরদিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ কিছুটা কমে ২ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকায় নামলে মোট নিট ঋণ আবার লাখ কোটি টাকার নিচে নেমে আসে।
সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের ২৯ এপ্রিল শেষে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৫০ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের ৩০ জুন পর্যন্ত এ স্থিতি ছিল ৫ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা।
প্রতিবছরই বড় অঙ্কের ঘাটতি রেখে বাজেট পেশ করে সরকার। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। অনুদান বাদ দিলে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা।
সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়ার পেছনে বড় কারণ রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, বছর শেষে এ ঘাটতি আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে অ-ব্যাংকিং উৎস থেকেও প্রত্যাশিত ঋণ পায়নি সরকার। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে সঞ্চয়পত্র থেকে কোনো নিট ঋণ পাওয়া যায়নি। উল্টো সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর কারণে অতিরিক্ত ৫৫৫ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে।
এদিকে সরকার ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিলেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ স্থবির অবস্থায় রয়েছে। কয়েক মাস ধরে এ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের আশপাশে আটকে আছে। সর্বশেষ ফেব্রুয়ারিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, সরকার বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ পাওয়া আরও কঠিন হতে পারে। এতে বিনিয়োগ পরিস্থিতির ওপর চাপ বাড়বে। তাদের মতে, রাজস্ব আদায় বাড়ানো না গেলে আগামী মাসগুলোতে সরকারের ব্যাংকনির্ভরতা আরও বাড়তে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করবে।