মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ঘিরে বিশ্বজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকট ও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, যার প্রভাব থেকে রেহাই পায়নি বাংলাদেশও। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে দেশের শিল্প খাতে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের সংকটে উৎপাদনব্যবস্থা বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। সংকটময় এ পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনে মুখ্য ভূমিকায় থাকা রপ্তানি খাত প্রতি মাসেই প্রবৃদ্ধি অর্জনে হোঁচট খাচ্ছে। গত আগস্ট মাস থেকে টানা আট মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে কমছে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি, যা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি সংকটে উৎপাদন কমে যাওয়া, ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং সময়মতো শিপমেন্ট দিতে না পারায় বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারাচ্ছে বাংলাদেশ। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে শিল্প খাতে আরো বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত মার্চ মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি আয় কমেছে ১৮ শতাংশের বেশি। ওই মাসে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩৪৮ কোটি ডলার। ২০২৫ সালের একই মাসে রপ্তানি আয় এসেছিল ৪২৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ রপ্তানি কমেছে ৭৭ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসের মধ্যে শুধু জুলাইয়ে রপ্তানি বেশি হয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বিদেশি ক্রেতারা ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ প্রতিযোগী বাজারের দিকে ঝুঁকছেন। জুলাই-আগস্ট মৌসুমের সম্ভাব্য অনেক আগাম ক্রয়াদেশ ইতোমধ্যে স্থগিত হয়েছে।
ইপিবির তথ্যমতে, তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানিপণ্য। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। চলতি অর্থবছরে এসে পোশাক রপ্তানিতে ধারাবাহিক ধস চলছেই। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৮৫৮ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ কম। গত বছরের একই সময়ে ছিল তিন হাজার ২৫ কোটি ডলার।
বর্তমানে তৈরি পোশাকের বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশকে টপকে দ্বিতীয় স্থান দখল করে নিয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভিয়েতনাম। বাংলাদেশের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও ভিয়েতনামের জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ বৈশ্বিক বাজারে তিন হাজার ৮৮২ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে। একই সময়ে ভিয়েতনাম রপ্তানি করে তিন হাজার ৯৬৪ কোটি ডলারের পোশাক। ফলে বাংলাদেশ তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ৮২ কোটি ডলার কম আয় করে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের সংকটে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জের বহু কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে জ্বালানিশূন্য হবে বাংলাদেশ—এমন আশঙ্কায় ক্রয়াদেশ ভারতসহ অন্য দেশে চলে যাচ্ছে। এতে গভীর সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে দেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাত। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান আমার দেশকে বলেন, মোট পণ্য রপ্তানি হিসাবে ভিয়েতনাম আমাদের থেকে এগিয়ে গেছে। ভিয়েতনাম চীন থেকে প্রায় এক সপ্তাহেই প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ করতে সক্ষম, যেখানে বাংলাদেশের একই প্রক্রিয়ায় প্রায় এক মাস পর্যন্ত সময় লাগে। ফলে লিড টাইম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বর্তমান বাস্তবতায় রপ্তানি খাতে ইতিবাচক প্রবণতা কবে ফিরবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন বলে।
জ্বালানি সংকটে ছোট ও মাঝারি টেক্সটাইল কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে আছে। গাজীপুরে জেনারেটর চালাতে গিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি ব্যয় তিনগুণ পর্যন্ত বেড়েছে। পল্লী বিদ্যুৎনির্ভর এলাকায় দিনে চার থেকে ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন পরিকল্পনা ভেস্তে যাচ্ছে। এসব এলাকার প্রায় দুই হাজার বস্ত্র ও পোশাক কারখানায় উৎপাদন অনেক ক্ষেত্রে অর্ধেকে নেমেছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমার দেশকে বলেন, চলমান পরিস্থিতিতে দেশের রপ্তানি কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। রপ্তানি আদেশে ব্যাপকভাবে ভাটা পড়েছে। আমাদের কাছে জুন পর্যন্ত রপ্তানি আদেশ আছে। এরপর জুলাই থেকে নতুন আদেশ সংগ্রহের কাজ করছি। সামগ্রিকভাবে রপ্তানি আদেশ ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
তিনি বলেন, শিল্প এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে অনেক কারখানাকে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। কিন্তু জেনারেটর চালাতে প্রয়োজনীয় ডিজেলও সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি অচল হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি পণ্য পরিবহন বিঘ্নিত হয়েছে। ফলে বর্তমানে সারা বিশ্বেই রপ্তানি বাণিজ্যে একটি বড় ধাক্কা লেগেছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দ্রুত নিরসন না হলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে থাকবে। আকাশ ও সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ক্ষতির ঝুঁকি থেকেই যাবে।