Image description

নির্মাণশ্রমিকের কাজ করেন বদরুল আমীন ও তার স্ত্রী হাবিজা বেগম। রোববার (৩ মে) সকালে কাজে যাচ্ছিলেন দুজন। পথে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের তেতলি এলাকায় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে তাদের গাড়ি। মা-বাবার দুর্ঘটনার খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে এসেছে চার শিশুসন্তান। সবার বড় তামিম, বয়স মাত্র আট বছর। ছোটদের মধ্যে জুবায়ের ছয়, তানিয়া তিন বছর ছয় মাস বয়সি এবং সবার ছোট তাকরিমের বয়স মাত্র তিন বছর। তাদের পরিবারে আর কেউ নেই।

 

সিলেট ওসমানী হাসপাতালে অসহায় হয়ে ঘুরছে তামিম-তাকরিমরা। চোখে-মুখে বিষাদের ছাপ। কেউ জিজ্ঞেস করলেও তেমন কিছু বলতে পারছে না। চোখ ছলছল করে চেয়ে থাকছে। কথা বলে জানা গেছে, তামিম পড়াশোনা ছেড়ে দোকানের কর্মচারীর কাজ করে। বেতনের তিন হাজার টাকা জোগান দেয় পরিবারে।

 

তামিম এশিয়া পোস্টকে জানায়, প্রতিদিনের মতো তারা ঘুমে থাকা অবস্থায় মা-বাবা কাজে বের হন। সকাল ১০টার দিকে প্রতিবেশীরা জানান, হাসপাতালে যেতে হবে। সে বলে ‘এখানে এসে শুনি দুর্ঘটনা হয়েছে। মাকে পেয়েছি। বাবাকে এখনও দেখতে পাইনি।’

 

হাসপাতালের মর্গের সামনে প্রতিবেশী আকবর আলীর সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল তামিমসহ চার ভাইবোন। আকবর আলী জানান, নিহত বদরুল আমীনের বাড়ি সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদ উপজেলার লালারগাঁও এলাকায়। সিলেট শহরের এসে দিনমজুরের কাজ করেন। স্ত্রী হাবিজা বেগমও নির্মাণশ্রমিকের কাজ করেন। এভাবেই চলে তাদের সংসার।

 

 

প্রতিদিনের মতো রোববার ভোরে কাজের সন্ধানে বের হন বদরুল-হাবিজা। সিলেটের দক্ষিণ সুরমার তেলিবাজারে যাওয়ার পথে তেতলি এলাকায় দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান বদরুল। হাবিজাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতালের ক্যাজুলিটি বিভাগে চিকিৎসাধীন রয়েছেন হাবিজা। মাথায় বেন্ডেজ, বুকে আঘাতপ্রাপ্ত। কথা বলতে পারছেন না। ছোট ছেলে তাকরিমকে কাছে পেয়ে হাত বুলিয়ে প্রশান্তি খোঁজার চেষ্টা করেন। চার শিশুসন্তানকে কাছে পেয়ে দু-চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল তার। স্বামী হারানোর বেদনা, শরীরে আঘাতে যন্ত্রণা নিয়ে কাতরাচ্ছেন।

 

দুর্ঘটনায় আহত হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের আলমগীর এশিয়া পোস্টকে জানান, তারা লালাবাজারে একটি ভবনের ঢালাইয়ের কাজে যাচ্ছিলেন। একই পিকআপভ্যানে ২০-২২ জন শ্রমিক ছিলেন। তেতলি এলাকায় সুনামগঞ্জ বাইপাসের আগে বিপরীত থেকে আসা কাঠালবোঝাই একটি ট্রাক পিকআপভ্যানে ধাক্কা দেয়। এরপর তারা আর কিছু বুঝতে পারেননি। জ্ঞান ফেরার পর দেখতে পান কেউ হাত-পা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতপ্রাপ্ত, কেউ ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন।

 

পুলিশ জানিয়েছে, রোববার সকাল ৬টা ২৫ মিনিটের দিকে শ্রমিকবাহী পিকআপ ও চট্টগ্রাম থেকে আসা কাঠালাবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে এই ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলে চারজন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও চারজনের মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ১০ জন।

 

নিহতদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন, সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামের মৃত খরম আলীর ছেলে মো. সুরুজ আলী, একই উপজেলার শেষস্তি গ্রামের আব্দুল বাসিরের মেয়ে মোছা. মুন্নি, দিরাই উপজেলার নুরনগর এলাকার মৃত নূর সালামের ছেলে মো. ফরিদুল, ধর্মপাশা উপজেলার সাবিরা গ্রামের ইদ্রিসের স্ত্রী নার্গিস, সিলেটের জালালাবাদ থানার লালারগাঁও এলাকার সুজাত আলীর ছেলে মো. বদরুল এবং কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার শিবপুর গ্রামের কুঠির বিশ্বাসের ছেলে পান্ডব বিশ্বাস। অন্য দুইজনের পরিচয় এখনও শনাক্ত করা যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।

 

আহতদের মধ্যে কয়েকজনের নাম পাওয়া গেছে। তারা হলেন, হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার আমকান্দি গ্রামের রফিক মিয়ার ছেলে মো. আলমগীর, সিলেট নগরের কালিবাড়ি এলাকার মৃত শুকুর উল্লাহর ছেলে তোরাব উল্লাহ, আম্বরখানার লোহারপাড়ার মৃত আলিম উদ্দিনের ছেলে রামিন ও একই এলাকার মল্লিক মিয়ার ছেলে আফরোজ মিয়া, সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার গাছতলা গ্রামের খোকন মিয়ার মেয়ে রাভু আক্তার, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পাউমারা গ্রামের বদরুজ্জামানের মেয়ে হাফিজা বেগম এবং দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়ার জফুর আলীর ছেলে রাজা মিয়া।

 

আহতদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা সিলেট নগরের আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে একটি ডিআই পিকআপভ্যানে করে নির্মাণ কাজের উদ্দেশ্যে সিলেটের তেলিবাজার এলাকায় যাচ্ছিলেন। বিপরীত দিক থেকে আসা কাঠালাবোঝাই একটি ট্রাক ওভারটেক করে এসে তাদের গাড়িটি চাপা দেয়। এতে সবাই রাস্তায় ছিটকে পড়েন। পরে স্থানীয় মানুষ ও পুলিশের সহায়তায় তাদেরকে উদ্ধার করে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

 

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মো. রিয়াজুল কবির জানান, হতাহতদের হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। কয়েকজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে।

 

তিনি জানান, দুর্ঘটনার পর থেকেই পিকআপ ও ট্রাকউভয় চালক পলাতক রয়েছে। তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। পাশাপাশি দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।