কোনো রাখঢাক নেই। রাজধানীর ঘাটে ঘাটে অনেকটা ওপেন সিক্রেট স্টাইলে চাঁদাবাজি চলছে। বাসটার্মিনাল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মার্কেট, ফুটপাত, কিংবা কাঁচা পণ্যের আড়ত-সবখানেই চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য। অন্তর্বর্তী সরকার থেকে শুরু করে বর্তমান বিএনপি সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও পুলিশ প্রশাসন বরাবরের মতোই মস্তান, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর প্রভাব পড়ছে না। সবকিছুই যেন চলছে আগের মতোই। ভোল পালটে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে মাঠে নেমেছেন ফ্যাসিস্টের সুবিধাভোগীরা।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা বরাবরের মতোই অভিযোগ করে যাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ-রোজার ঈদ উপলক্ষ্যে সালামি-বকশিশ এবং বছরের অন্য সময় মালিক-শ্রমিক-হকার সমিতির নামে চাঁদা তোলা হচ্ছে। এ অনিয়ম বন্ধে সরকারের প্রতিশ্রুত জিরো টলারেন্স নীতির প্রয়োগ দেখতে চান ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ভেঙে পড়া পুলিশবাহিনীও এখনো পুরোপুরি সক্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যও থামছে না। রাজধানীর বিভিন্ন স্পটে নানা ধরনের চাঁদাবাজির তথ্য উঠে এসেছে যুগান্তরের অনুসন্ধানে।
কাওরান বাজারে একাধিক চাঁদাবাজচক্র সক্রিয় : রাজধানীর অন্যতম প্রধান কাঁচাপণ্যের আড়ত কাওরান বাজার ঘিরে রীতিমতো চাঁদাবাজির স্বর্গরাজ্য গড়ে উঠেছে। বছরের পর বছর অনেকটা ফ্রি স্টাইলে চাঁদাবাজি হলেও এসব নিয়ে প্রশাসনের তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই। বরং উলটো স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া যায়।
সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আওয়ামীপন্থি চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট রাতারাতি উধাও হয়ে যায়। কিন্তু একদিনের জন্যও চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। বরং আওয়ামী লীগশূন্য ফাঁকা মাঠে সহজেই দখল প্রতিষ্ঠা করে বিএনপিপন্থি হিসাবে পরিচিত একশ্রেণির অসাধু রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং পেশাদার অপরাধীচক্র। এমনকি জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়ক এবং ছাত্রনেতা পরিচয়েও নতুন করে চাঁদাবাজি শুরু হয়। চাঁদাবাজির ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে ৭ জানুয়ারি স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা উত্তর সিটি ইউনিটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা স্থায়ীভাবে চাঁদাবাজি বন্ধ এবং অপরাধীদের গ্রেফতার দাবিতে মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করেন। কিন্তু অদ্যাবধি অবস্থার কোনো হেরফের হয়নি। বরং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী পরিচয়ে দুর্বৃত্তদের আনাগোনা এবং ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজি আরও বেড়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ৫ আগস্টের পরপরই তেজগাঁও থানা যুবদলের নেতা আবদুর রহমানের অনুসারীরা কাওরান বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালান। প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে বিভিন্ন আড়ত এবং ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলা শুরু হয়। একপর্যায়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রতিবাদের মুখে আবদুর রহমান ও তার অনুসারীদের অনেকে পিছু হটতে বাধ্য হন। পরে আবদুর রহমানকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর কাওরান বাজারে চাঁদাবাজির সময় হাতেনাতে আটক হন তেজগাঁও থানা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক জালাল আহমেদ।
মঙ্গলবার সকাল থেকে কাওরান বাজার এলাকায় অবস্থান করে দেখা যায়, স্থানীয় ফুটপাত থেকে শুরু করে আশপাশের রাস্তার একটি বড় অংশ দখল করে অবৈধ দোকানপাট তৈরি হয়েছে। যত্রতত্র তৈরি হয়েছে টং দোকান এবং গৃহস্থালি পণ্যের আড়ত। ফলে পুরো এলাকা ঘিঞ্জি আকার ধারণ করেছে। এছাড়া সিটি করপোরেশনের বিশাল জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে কাঁচাপণ্যের অবৈধ আড়ত।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় মৎস্য আড়ত এবং সবজিবাজার ঘিরে একাধিক চাঁদাবাজচক্র সক্রিয়। তাদের মধ্যে মাছবাজারে জনৈক জালাল মোল্লা, আজাদ ওরফে ন্যাটা আজাদ, গিয়াস উদ্দিন ওরফে গেসু, বেল্লাল ও সুরুজ চাঁদাবাজিতে জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কর্মকর্তারা জানান, রাজনৈতিক চাঁদাবাজ ছাড়াও কাওরান বাজার ঘিরে বিদেশে পলাতক একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসীর তৎরপতা দৃশ্যমান। বিশেষ করে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী দিলীপ ওরফে বিনাশ, জিসান ও ইমনের নামে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদাবাজির খবর পাওয়া যায়।
স্থানীয়রা জানান, আওয়ামী লীগ আমলে কাওরান বাজার ঘিরে একাধিক চাঁদাবাজচক্র সক্রিয় থাকলেও নেপথ্যে গডফাদার ছিলেন তেজগাঁও আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক মোশারফ হোসেন ওরফে মিনতি মোশাররফ। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের আশীর্বাদে তিনি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। স্থানীয় কয়েকটি কাঁচাবাজার এবং মৎস্য আড়ত ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন মোশাররফ।
কাওরান বাজার ঢাকা-১২ সংসদীয় এলাকার জামায়াতের এমপি সাইফুল আলম মিলন চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে থানা পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
কাওরান বাজারকেন্দ্রিক বিভিন্ন কাঁচাপণ্যের আড়তদারসহ স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর চিহ্নিত চাঁদাবাজদের অনেকে গা ঢাকা দিলেও তাদের কেউ কেউ ফের এলাকায় ফিরেছেন। এমনকি ভোল পালটে তাদের অনেকে নিজেদের বিএনপি এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মী বলে পরিচয় দিচ্ছেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কাওরান বাজার পাকা আড়ত ভবন বাজার সমিতির ব্যবসায়ী নেতা দেলোয়ার হোসেন কুসুম মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, এখানে যারা চাঁদাবাজি করে, তাদের অনেকেই পরিচিত মুখ। ফলে এসব নিয়ে নতুন করে কথা বলে কোনো লাভ নেই। তবে প্রশাসন ইচ্ছা করলেই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। যে কোনো মূল্যে ব্যবসায়ীরা এখানে চাঁদাবাজিমুক্ত পরিবেশ দেখতে চান। কেউ যদি দলের নাম ভাঙিয়ে অপকর্ম করে, তাহলে প্রশাসনের উচিত তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।
কাওরান বাজার এলাকায় চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তেজগাঁও থানার ওসি ক্যশৈনু মার্মা মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছি। তবে মাঠের পরিস্থিতি বিষয়ে আপনারাই ভালো বলতে পারবেন।
শাহবাগের কোনো দোকানে এক লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি : রাজধানীর শাহবাগ থানা এলাকাজুড়ে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নীরব চাঁদাবাজির খবর পাওয়া গেছে। দোকানপ্রতি লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদাবাজির ঘটনাও ঘটছে। চাঁদার টাকা না দিলেই দোকানে তালা অথবা গুপ্ত হামলা করা হচ্ছে। এসব ঘটনায় থানায় অভিযোগ করতেও ভয় পাচ্ছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা। কেউ কেউ মারধরের অভিযোগে মামলা করছেন। তবে মামলা করায় ফের হামলার ঘটনাও ঘটছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বেশি যন্ত্রণায় আছেন শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেট, শাহবাগ মেডিসিন মার্কেট, বিপণিবিতান মেডিসিন মার্কেট, পরীবাগ চাঁদ মসজিদ মার্কেট, পরীবাগ সুপার মার্কেট এবং শাহবাগ ফুলের মার্কেটের দোকানিরা। একেক গ্রুপ একেক সময় চাঁদা নিতে আসে।
মঙ্গলবার শাহবাগ এলাকার বিভিন্ন দোকানির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিভিন্ন ওষুধের দোকান, ফুলের মার্কেট, ফুটপাতের ছিন্নমূল দোকানগুলোয় আলাদা আলাদা চাঁদাবাজ গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এ চাঁদাবাজরা নিজেদের একটি দলের সদস্য পরিচয় দিচ্ছে। তাদের অনেকে আবার ছিনতাইকারী ও টোকাইদের নেতা। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এককালীন, মাসিক এবং দিনের ভিত্তিতে বিভিন্ন পরিমাণে টাকা নিচ্ছে।
সূত্র বলছে, রাজধানীর শাহবাগের পরীবাগ সুপার মার্কেটের ‘নিউ শাহবাগ মেডিসিন কর্নার’-এর স্বত্বাধিকারী মহিউদ্দিন চাঁদাবাজদের যন্ত্রণায় ঠিকমতো ব্যবসা করতে পারছেন না। ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট সকালে একদল যুবক দোকানে তালা দিয়ে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। ওই যুবকদের নেতৃত্বে ছিলেন মো. মিথুন ও মো. বাইজিদ মোল্লা। তারা নিজেকে ছাত্রদলের লোক পরিচয় দেন। পরে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ৮ আগস্ট দোকান খুলতে পারেন মহিউদ্দিন।
কিন্তু চাঁদার টাকা না পেয়ে বিভিন্ন সময় দোকানে এসে হুমকি দিত চক্রটি। শাহবাগের ফার্মেসিগুলোয় একটি সাধারণ রেওয়াজ আছে, ফোন করে ওষুধের অর্ডার করা হলে দোকানিরা হাসপাতালে রোগীদের কাছে ওষুধ পৌঁছে দেন। ২৭ ফেব্রুয়ারি হাসপাতালে ভর্তি রোগীর স্বজন পরিচয়ে ওই ওষুধের দোকানে ফোনে কল করে কিছু ওষুধের অর্ডার করা হয়। এজন্য বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে বলেন তারা। বারবার কল করে অনুরোধ করায় রিয়াজ হোসেন নামের এক কর্মচারী রাত সাড়ে ৯টার দিকে ওই হাসপাতালের উদ্দেশে রওয়ানা দিলে মেট্রোরেলের পিলারের পাশে অতর্কিত হামলা চালায় চাঁদাবাজ মিথুন গ্রুপ। লোহার রড দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে কর্মচারী রিয়াজকে আহত করে ৫২ হাজার টাকা এবং প্রায় ২৫ হাজার টাকা মূল্যের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় তারা। এ ঘটনায় গত ৩ মার্চ শাহবাগ থানায় একটি মারধর ও ছিনতাইয়ের মামলা করে রিয়াজ হোসেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সোমবার ফের ‘নিউ শাহবাগ মেডিসিন কর্নার’-এর দোকানে গিয়ে হামলা করে চাঁদাবাজ চক্র। পরে স্থানীয়রা তাদের আটক করে শাহবাগ থানায় খবর দিলে পুলিশ এসে বাইজিদ, মো. সোহান মোল্লা ও মমিনুল মুনশি নামের তিন চাঁদাবাজকে গ্রেফতার করে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. তৌফিক হাসান যুগান্তরকে জানান, মারধরের আগের একটি মামলায় তাদের গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এই চক্রকে গ্রেফতারের পর অনেক ব্যবসায়ী ফোন করে অভিযোগ করেছে, তারা চাঁদাবাজির শিকার। এসআই তৌফিক তাদের থানায় অভিযোগ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
মঙ্গলবার বিকালে ‘নিউ শাহবাগ মেডিসিন কর্নার’ নামের ওই দোকানে গিয়ে কথা হয় কর্মচারীদের সঙ্গে। প্রথমে আতঙ্কে কথা বলতে চাচ্ছিলেন না তারা। একপর্যায়ে এক কর্মচারী তার হাতের গভীর ক্ষত দেখিয়ে বলেন, চাঁদা না দেওয়ায় দোকানে এসে মারধর করেছে। তাদের সহকর্মী রিয়াজ এখনো সুস্থ হয়নি বলে তারা জানান। প্রতিমুহূর্তে আতঙ্কে আছেন তারা।
হামলার নেতৃত্ব যারা দিয়েছেন তাদের বিষয়ে কর্মচারীরা বলেন, মিথুন ওই এলাকার ছিনতাইকারীদের নেতা। ছিনতাই হওয়া মোবাইল কিনে বিক্রি করা তার মূল পেশা। আওয়ামী লীগ আমলে ছাত্রলীগের লোক পরিচয় দিতেন। তখন শুধু ছিনতাই করতেন। ২০২৪ সালের পর থেকে নিজেকে ছাত্রদলের লোক পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজি শুরু করে। প্রাণনাশের ভয় দেখিয়ে কোনো টাকা না দিয়েই আশপাশের বিভিন্ন দোকানের মালিকানার শেয়ারও নিয়েছে ওই চক্র।
নিউ শাহবাগ মেডিসিন কর্নারের স্বত্বাধিকারী মহিউদ্দিন ফোনে যুগান্তরকে জানান, চাঁদার টাকা না দেওয়ায় তিনি ঠিকমতো ব্যবসাও করতে পারছেন না। মামলা করে আতঙ্কের মধ্যে আছেন।
প্রসঙ্গত, শাহবাগে এ ধরনের গুপ্ত হামলার ঘটনা নতুন নয়। এর আগে ২০২৪ সালে ৪ অক্টোবর পরীবাগ চাঁদ মসজিদ মার্কেটের ব্রাদার্স মেডিসিন কর্নারের কর্মচারী ফজলে রাব্বীকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। রমনা পার্কে নিয়ে তার কাছে দুই লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে ৪০ হাজার টাকায় ‘দফারফা’ হয়। সেখানেও মিথুন ও বাইজিদ জড়িত ছিলেন বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার শাহবাগ থানার সামনের ফুলের মার্কেটের দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেখানেও বিভিন্ন কৌশলে চাঁদাবাজি চলছে। ব্যবসায়ীরা রয়েছেন আতঙ্কে। সকালে ফুলের পাইকারি দোকানে, আর সন্ধ্যায় খুচরা দোকানে চাঁদা তোলা হয়।
নাম প্রকাশ না করে এক দোকানি বলেন, দোকান বুঝে চাঁদা নেয়। কারও থেকে বেশি আবার কারও থেকে কম। একাধিক দোকানি তিন থেকে চারজনের নাম উল্লেখ করে যুগান্তরকে জানান, চাঁদাবাজরা সকাল-সন্ধ্যা দুই বেলায় চাঁদা তোলে। এদের হোতা চায়ের দোকানি সাঈদ।
মঙ্গলবার দুপুরে সাঈদের চায়ের দোকানে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। দোকানের কর্মচারী সজীব বলেন, ‘সাঈদ ভাই বাইরে গেছেন।’ পরে সন্ধ্যায় সাঈদের নম্বরে ফোন করা হলে রিসিভ করে এক ব্যক্তি বলেন, ‘সাঈদ ভাই ফোনের কাছে নেই। পরে ফোন করেন।’
থানার নাকের ডগায় এমন চাঁদা নেওয়া হলেও অবাক করা বিষয় হলো-এসব চাঁদাবাজির কোনো তথ্যই জানে না শাহবাগ থানা পুলিশ। মঙ্গলবার দুপুর দেড়টায় শাহবাগ থানায় গিয়ে ওসি মো. মনিরুজ্জামানকে পাওয়া যায়নি। পরে তাকে একাধিকবার ফোন করলেও রিসিভ করেননি।
ওসির পাশের রুমে বসেন ইনস্পেকটর তদন্ত মো. আসাদুজ্জামান। তার কাছে চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইল এক প্রকার আকাশ থেকেই পড়েন তিনি। বলেন, দেড় বছর ধরে শাহবাগ থানায় আছি। চাঁদাবাজির কোনো তথ্য নেই আমাদের কাছে। কখনো কেউ বলেনি সে চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছে।
পুলিশের নিজস্ব অনুসন্ধানেও চাঁদাবাজির কোনো তথ্য নেই বলে তিনি জানান। চাঁদাবাজি সংক্রান্ত বিষয়ে ওসির থেকে বক্তব্য নিতে বলেন তিনি।
গাবতলীতে রাজনৈতিক পরিচয়ে সক্রিয় চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট : রাজধানীর অন্যতম প্রবেশদ্বার গাবতলী বাস টার্মিনাল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল টার্মিনালকেন্দ্রিক পুরোনো ত্রাস ও চাঁদাবাজির সংস্কৃতির অবসান ঘটবে। কিছুদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও আবারও বীরদর্পে শুরু হয়েছে চাঁদাবাজি। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের চেনা মুখগুলো নেপথ্যে থেকে টার্মিনাল এলাকায় নতুন করে চাঁদা আদায়ের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পরিবহণ থেকে শুরু করে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ, ফুটপাত দখল করে বসানো দোকানসহ বিভিন্ন খাত থেকে মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সংঘবদ্ধ প্রভাবশালী চক্র। একটি রাজনৈতিক দলের পরিচয় ব্যবহারকারী এক ডজন স্থানীয় নেতাকর্মীকে নিয়ে গড়ে ওঠা এই চক্র গাবতলী এলাকায় কার্যত অঘোষিত রাজত্ব কায়েম করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাসের কাউন্টার থেকে শুরু করে ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কারও রেহাই নেই চাঁদাবাজদের হাত থেকে। প্রত্যেকের কাছ থেকেই নিয়মিত টাকা আদায় করা হচ্ছে। পরিবহণসংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই টার্মিনাল এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে স্থানীয় কিছু নেতা। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করলেও তাদের দাপট থামেনি।
কিছু চাঁদাবাজ ক্ষমতাসীন দল ও অঙ্গসংগঠনের নাম ব্যবহার করে ছোট-বড় একাধিক গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পুরো এলাকায় চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। সূত্রমতে, গাবতলী টার্মিনালে প্রধানত তিনটি খাত থেকে চাঁদা আদায় করা হয় বাস ও কাউন্টার, অবৈধ দোকানপাট এবং অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে। এসব খাত থেকে প্রতিদিন মোটা অঙ্কের টাকা আদায় হচ্ছে।
সূত্র জানায়, টাউন সার্ভিস থেকে শুরু করে দূরপাল্লার বাস-সবই এখন এই চক্রের নিয়ন্ত্রণে। এই চক্রের সদস্যরা কাউন্টার ভাগ করে করে চাঁদা আদায় করছেন। অথচ সংশ্লিষ্টরা ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন না।
সেলফি, বসুমতি ও ভিলেজ লাইনের মতো বাস থেকেও নিয়মিত চাঁদা নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে বড় বাসগুলো থেকে মৌসুমভেদে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। টার্মিনালকেন্দ্রিক এই চাঁদাবাজি শুধু পরিবহণেই সীমাবদ্ধ নয়। অভিযোগ রয়েছে, মসজিদের পানিও বিক্রি করে টাকা আদায় করা হচ্ছে। পাশাপাশি পানের আড়ত ও আন্ডারপাসসংলগ্ন এলাকাতেও অবৈধভাবে দোকান বসিয়ে বাণিজ্য চালানো হচ্ছে।
সূত্র জানায়, গাবতলী টার্মিনালে শিডিউলভুক্ত দোকানের সংখ্যা মাত্র ৫০টি। অথচ বর্তমানে এখানে তিন থেকে চারশ অবৈধ দোকান গড়ে উঠেছে। এসব দোকান থেকে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এছাড়া অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের প্রতিটি লাইটের জন্য আলাদাভাবে ১০০ থেকে ২০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
বিভিন্ন নামে চাঁদা চাওয়ার অভিযোগ ব্যবসায়ীদের : তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, চাঁদাবাজি আগেও ছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও হয়েছে, এখনো চলছে। যেহেতু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের কথা বলেছেন, তাই আমরা আস্থা রেখে সরকারকে সময় দিতে চাই। সরকার এই সামাজিক ব্যাধি রোধে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছি। কেননা চাঁদাবাজির সঙ্গে অর্থনৈতিক অগ্রগতি জড়িত।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী বলেন, এখন চাঁদার ধরন পালটেছে। কোথাও বকশিশ নামে, কোথাও ঈদ সালামি নামে আবার কোথাও আপস-সমঝোতায় আদায় করা হচ্ছে। যে নামেই এটা হোক না, এটি ব্যবসার খরচ বাড়াচ্ছে, সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করছে। কেননা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় এ নিয়ে কেউ মুখ খুলতে চায় না। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের আগে সরকার চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের প্রতিশ্রুতি দিলেও জনগণ তা অনুভব করতে পারছে না। তার ওপর একজন মন্ত্রীর অপেশাদার বক্তব্য পুরো বিষয়টি আরও জটিল করে তুলেছে। সরকার যতই ‘ডিনাইল মুডে’ বা বাস্তবতাকে অস্বীকার করুক না কেন, নানা নামে চাঁদাবাজি হচ্ছে। এ বিষয়ে এখনই সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে এবং বাস্তবিক অর্থে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে চাঁদাবাজদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, নানা নামে, নানা প্রক্রিয়ায় ব্যবসায়ীদের চাঁদা দিতে হয়। বাংলাদেশে এমন কোনো শিল্প অঞ্চল নেই, যেখানে স্থানীয়দের কাছে শিল্পমালিকদের কম দামে স্ক্র্যাপ, ঝুট বা ওয়েস্টেজ বিক্রি করতে বাধ্য না করা হয়। বাজারে যেই স্ক্র্যাপের টন ৫০ হাজার টাকা, সেটা স্থানীয়রা কেনে ৩০ হাজার টাকায়। কম দামে বিক্রি না করলে নানা ইস্যুতে কারখানায় ভাঙচুর ও পদে পদে ব্যবসায় বাধা দেওয়া হয়। এটাও তো এক ধরনের চাঁদাবাজি। আবার মালিক সমিতি, শ্রমিক ইউনিয়নের নামে সড়কে ট্রাক থামিয়ে টাকা আদায় করা হয়। এগুলো বন্ধ করতে সরকারকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, মার্কেট বা শপিংমলে চাঁদাবাজি বা ঈদ বকশিশ আদায়ের কোনো তথ্য দোকান মালিকরা এখনো জানায়নি। চাঁদাবাজির তথ্য পাওয়া গেলে তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো হবে।