জুলকারনাইন সায়ের খান
রুবেল আহমেদের কথা আপনাদের মনে আছে নিশ্চই? ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গাড়িচালক রাজ্জাক মাতব্বরের ছেলে মো. রুবেল আহমেদ।
গত বছরের ১৫ জানুয়ারি বহুল আলোচিত কলকাতার পার্ক হোটেলের একটি সভায় এই রুবেল ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলো। পরবর্তীতে তাকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর আত্মগোপনে থেকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির তৎপরতায় সংশ্লিষ্টতার কারণে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের ডিসি ইবনে মিজানের সার্বিক নির্দেশনায় এডিসি ও এসি মোহাম্মাদপুর জোন এবং ওসি মোহাম্মাদপুর থানা পুলিশ এক অভিযানে গতবছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে বছিলা মেট্রো হাউজিং এলাকা থেকে রুবেলকে গ্রেপ্তার করে। এই গ্রেপ্তারের পর গত ৩০ এপ্রিল রুবেল আহমেদ সুপ্রিম কোর্ট থেকে জামিন পেয়ে বের হয়।
ঘটনা ইন্টারেস্টিং মোড় নেয় ২১ জানুয়ারি। এদিন মধ্যরাতে জামিনে থাকা রুবেল আহমেদকে রাজধানীর কেরানীগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। কারণ ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হাদিকে হত্যা মামলায় প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান রাহুল ওরফে শুটার ফয়সালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে এই রুবেল আহমেদকে চিহ্নিত করা হয় এবং ওসমান হাদি মামলায় তাকে আসামী করা হয়।
এর একদিন পর (২২ জানুয়ারি) আদালতে রুবেলকে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার আবদুল কাদির ভূঁঞা। তবে আদালত ছয়দিন রিমান্ডের আদেশ দেন। রিমান্ড শেষে ৩১ জানুয়ারি মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইসমাইলের খাস কামরায় রুবেল আহমেদ ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন।
জবানবন্দিতে রুবেল আহমেদ উল্লেখ করেন, ছাত্রনেতা ওসমান হাদি এবং ইউটিউবার নুরুজ্জামান কাফিকে হত্যার নির্দেশ দেয় ভারতে পলাতক জাহাঙ্গীর কবির নানকের ব্যক্তিগত সহকারী বিপ্লব। সে লক্ষ্যে গত ৩ নভেম্বর রুবেলের উপস্থিতিতে হত্যা মামলার অপর আসামী কামরুজ্জামান রুবেলকে ফোন করেন বিপ্লব।
রুবেল জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, শেখ হাসিনাকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ গালিগালাজ এবং বিভিন্ন বাজে মন্তব্যের কারণে এই দুই ব্যক্তিকে (হাদি ও কাফি) ২০/২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে সরিয়ে দিতে (হত্যা) নির্দেশ দেওয়া হয়।
জবানবন্দিতে রুবেল লিখেছেন— কামরুজ্জামান রুবেল ফয়সালের কাছে কিছু টাকা পান, কিন্তু সে টাকাটা ফেরত দিচ্ছে না। তাই ফয়সালকে কাজটা দিয়ে পূর্বের টাকাটা তুলতে হবে আর ফয়সালও কাজ খুঁজছে। বিপ্লব (নানকের পিএস) কাজটা কামরুজ্জামান রুবেলকে দিয়েছে, আর সে কাজটা ফয়সালকে দিয়েছে হাদি’কে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে। রুবেলের জবানবন্দিতে এসবের বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।
রুবেলের জবানবন্দিতে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, আওয়ামী লীগ নেতা নানকের সহকারী বিপ্লবের নির্দেশে হাদি হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে। আশা করছি, ফয়সাল ও আলমগীরের মতো বিপ্লবকে গ্রেপ্তার করে দেশে ফেরাতে সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
একই সাথে বিপ্লব, কাদের আদেশে এই হত্যার হুলিয়া দেয় এবং কারা অর্থের যোগানদাতা সেসবও তদন্তের মাধ্যমে বের করা গুরুত্বপূর্ণ। রুবেল আহমেদ যদি তার জবানবন্দিতে সকল সত্য তথ্য প্রদান করে থাকেন, তাহলে যা দাঁড়ায় তা হলো- তিনি ২০২৫ এর ৩রা নভেম্বর জানতে পারেন হাদি ও কাফিকে হত্যার পরিকল্পনা হচ্ছে। এবং কারা তা ঘটাতে পারে। সেসব জেনেও তিনি কোন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ বিষয়ে অবগত করেননি? উল্লেখ্য এসময় রুবেল আহমেদ জামিনে মুক্ত ছিলেন।
লেখক: প্রবাসী অনুসন্ধানী সাংবাদিক।