Image description

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ এবং রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুতে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। মামলায় জব্দ করা আবু সাঈদের টি-শার্টে কোনো গুলির চিহ্ন না থাকা, জব্দকৃত ভিডিওতে আবু সাঈদকে লাঠিচার্জ করা ৬ জন পুলিশ সদস্যের মধ্যে শুধু একজনের নাম শনাক্ত করে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা বাকি পুলিশ সদস্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত না করা।

আবু সাঈদের মৃতদেহের এক্সরে, রেডিওস্কপি টেস্ট না করাসহ বিভিন্ন অভিযোগ এনেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। এদিকে মামলার আসামিপক্ষের এক আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু রংপুরে করা আবু সাঈদ হত্যা মামলায় আবু সাঈদের পক্ষের আইনজীবী ছিলেন কিনা এমন প্রশ্ন তুলেছেন প্রসিকিউশন। প্রসিকিউশনের দাবি যদি, এই আইনজীবী আবু সাঈদের পক্ষে রংপুর সিএমএম কোর্টে লড়ে থাকেন তবে এটি ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ একইসঙ্গে অনৈতিক হবে।

তবে এটি অস্বীকার করে প্রসিকিউশনের এই প্রশ্নের সপক্ষে কোনো দালিলিক প্রমাণ নাই বলে দাবি আইনজীবী দুলুর। আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে গত ১৭ই জুলাই তাজহাট থানায় মামলা করে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ বিভুতিভূষণ বাদী হয়ে এই মামলা করেন। মামলায় আসামি করা হয়েছিল আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের।

আবু সাঈদ নিহতের ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে ইচ্ছাকৃতভাবে এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আবু সাঈদের কালো রং এর গেঞ্জির পেছনের অংশ জব্দ করা হয়। এতে মৃত্যুর সময় পরিহিত আবু সাঈদের কালো রঙ-এর গেঞ্জির ৬/১২ ইঞ্চি পরিমাণ অংশ জব্দ করা হয়েছে। যেহেতু আবু সাঈদ সামনের দিকে গুলিবিদ্ধ হয়েছে, তাই গুলির চিহ্ন সামনের দিকে অংশে থাকায় জব্দকৃত অংশের মধ্যে কোনো ছিদ্র নাই। কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করা এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নতুন করে গেঞ্জির অংশ জব্দ না করে পূর্বের জব্দকৃত অংশটিই ট্রাইব্যুনালে দাখিল করে। যার সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।

সূত্র জানায়, আবু সাঈদের মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে দাখিলের পূর্বে তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউশনের মধ্যে একটি বৈঠক হয়। এ বৈঠকে জব্দকৃত আলামতের সঙ্গে মামলার অসঙ্গতির বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলামকে এসব তথ্য জানায় এক সিনিয়র প্রসিকিউটর। কিন্তু মিজানুল ইসলাম এসব আমলে না নিয়েই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের মাধ্যমে মামলাটির বিচার কাজ শুরুর আবেদন করেন। পরে, উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে গত ৫ই মার্চ মামলাটি রায় ঘোষণার জন্য আগামী ৯ই এপ্রিল দিন ধার্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।

আসামিপক্ষের দাবী: মামলাটির আসামি-এএসআই আমির হোসেন, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী আপেলের পক্ষে লড়ছেন আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। তিনি মানবজমিনকে বলেন, এই মামলায় জব্দ করা আবু সাঈদের টিশার্টে কোনো গুলির চিহ্ন নাই। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আবু সাঈদের মৃতদেহের এক্সরে, রেডিওস্কপি রিপোর্ট দাখিল করা হয়নি। ফলে তার শরীরে গুলির আঘাতে কার্তুজের যে গর্ত হয় কিংবা শরীরে লেগে থাকে তা না থাকায় সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। এতে গুলির কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে, সেটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। এছাড়া আরেকটি জব্দকৃত ভিডিওতে দেখা যায় আবু সাঈদকে ৬ জন পুলিশ সদস্য লাঠিচার্জ করছে।

এদের মধ্যে শুধুমাত্র তৎকালীন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) মো. আরিফুজ্জামান আরিফ ওরফে জীবনের নাম শনাক্ত করে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, বাকি পুলিশ সদস্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত না করায় তদন্ত প্রতিবেদনটি ত্রুটিপূর্ণ হয়েছে। এছাড়া মামলার আসামি এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্রের নামে ইস্যুকৃত ১২ বোর শর্টগানের কার্তুজের উৎপাদান উৎস নিয়ে কোনো কাগজ দাখিল করেনি প্রসিকিউশন। অর্থাৎ বাংলাদেশ সরকার ক্রয় কমিটির মাধ্যমে যে দেশ থেকে এই গুলি আমদানি করেছে তার একটি টেকনিক্যাল মেটার আছে, তা মানুষের ত্বকের জন্য ক্ষতিকর কিনা, এতে মানুষের মৃত্যু হয় কিনা এসব চিহ্নিত করার ব্যাপার আছে। কিন্তু এই সংশ্লিষ্ট ডকুমেন্ট তলব করলেও তা ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়নি। এমনকি অস্ত্র দুটির ব্যারেলের সোয়াবে গানশর্ট রেসিডিউ-এর উপাদান ‘লেড ও নাইট্রাইট মূলক’ মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর কি না এই মর্মে কোনো কাগজপত্র দাখিল করেনি। এছাড়া কলেজ হাসপাতালে তৈরি করা আবু সাঈদের ময়নাতদন্তের রিপোর্টে সিভিল সার্জনের পরিবর্তে কলেজ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ প্রধানের স্বাক্ষর থাকার কথা থাকলেও তা ছিল না।
‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ প্রশ্নে তিনি বলেন, রংপুরে করা আবু সাঈদের মামলায় আমি কখনোই আবু সাঈদের পক্ষে ছিলাম না। প্রসিকিউশনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের কাছে এর সপক্ষে কোনো দালিলিক প্রমাণ নাই। তিনি বলেন, আবু সাঈদ বীরত্বপূর্ণ আন্দোলনকারী ছিলেন। তার মামলাটি পেনাল কোডের অধীনে বিচার না করে, আবু সাঈদকে নিরস্ত্র শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারী উল্লেখ করে এই স্পেশাল কোর্টে মামলা করায় তার বীরত্বগাথাকে অবনমন করা হয়েছে।

প্রসিকিউশনের বক্তব্য: এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও মামলাটির তদন্তের সঙ্গে যুক্ত প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার এস এম ময়নুল করিম মানবজমিনকে বলেন, তৎকালীন সরকারের চেষ্টা ছিল এই হত্যাকাণ্ডটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা। সেজন্য ঘটনার সময় আবু সাঈদের মৃতদেহের কোনো এক্সরে, রেডিওস্কপি রিপোর্ট তৈরি করা হয়নি। এছাড়া ৯০ দশকের পর থেকে মামলার আলামতের পোশাকের কিছু অংশ কেটে জব্দ দেখানো হয়, যেহেতু আবু সাঈদ সামনের দিকে গুলি খেয়েছেন এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনেও তা উল্লেখ করা আছে, সুতরাং মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা গেঞ্জির পেছনের অংশ জব্দ করায় এই গেঞ্জিতে কোনো ছিদ্র নাই। যেহেতু আবু সাঈদের উপর গুলির ঘটনার ভিডিও প্রমাণ রয়েছে, তাই ট্রাইব্যুনালে চলমান এই মামলার আইও রুহুল আমিন সাহেব নতুন করে আর কোনো গেঞ্জি জব্দ করেননি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, রংপুরে দাখিল হওয়া প্রথম মামলার আইও ইচ্ছাকৃতভাবে এটি উল্লেখ করেনি যে, গেঞ্জির এই অংশটি সামনের নাকি পিছনের অংশ। কিন্তু লাশটি তো হারিয়ে যায়নি। আবু সাঈদের হত্যার ভিডিও, সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে বলেছে যে আবু সাঈদের মুখে, বুকে গুলি লেগেছে। ডাক্তারের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এসব তো আসামিপক্ষ অস্বীকার করেনি। তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী যদি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ময়নাতদন্তকারী ডাক্তারের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য থাকে, তবে ডাক্তারের মতামতই প্রাধান্য পাবে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ, টিভির রিপোর্ট, সুরতহাল প্রতিবেদন এসব তো অকাট্য দলিল এই মামলা প্রমাণে। সুতরাং গেঞ্জিতে গুলির চিহ্ন নেই বলে আসামিপক্ষের দাবি মামলাটিকে দুর্বল করবে না।