রাজধানীর উত্তরায় ১৬ জানুয়ারি ভোরে একটি আবাসিক ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনের ধোঁয়ায় ভবনে বসবাসকারী দুটি পরিবারের ৬ জন মারা যান। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। ২০২৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর আগুনে সচিবালয়ের একটি ভবনের চারটি ফ্লোর পুড়ে যায়।
ওই ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে আসে, রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে লাগা আগুনও বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে। শুধু এ দুটি ঘটনায় নয়, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের বাৎসরিক অগ্নিকাণ্ডের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশে ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ডের ৩৬ শতাংশই বৈদ্যুতিক গোলযোগ বা শর্টসার্কিট থেকে ঘটেছে। এসব অগ্নিকাণ্ডে অকালে ঝরে পড়ছে অসংখ্য প্রাণ। এছাড়া গত পাঁচ বছরে দেশে অগ্নিকাণ্ডে মোট ক্ষতি হয়েছে ২ হাজার ৩৬৯ কোটি ৫২ লাখ ৪০ হাজার টাকার। এ সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে বাসাবাড়িতে।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে ২০২৪ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত এক উচ্চপর্যায়ের কমিটির প্রতিবেদনেও অগ্নিকাণ্ডের মূল কারণ হিসাবে বৈদ্যুতিক গোলযোগকে উল্লেখ করা হয়েছে।
অগ্নিনিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, সচেতনতার অভাব ও নিুমানের ইলেকট্রনিক সামগ্রীর কারণে ঘটছে ভয়াবহ সব দুর্ঘটনা। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবু নাঈম মো. শাহিদউল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে অগ্নিকাণ্ডের মূল কারণ হচ্ছে রক্ষণাবেক্ষণে অনেক বেশি অগ্রাহ্য করা। সুইচ অন করলেই অনেক সময় কিরকির করে শব্দ হয়। এভাবে দীর্ঘ সময় চলতে থাকলে বেশি তাপের সৃষ্টি হবে এবং একপর্যায়ে সেখানে আগুনের সৃষ্টি হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা মালটিপ্লাগে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইলসহ সবকিছু একই সুইচে দিতে থাকি। ওটার ধারণ ক্ষমতা কত সে সম্পর্কে জানি না। মালটিপ্লাগেরও একটা ধারণক্ষমতা বা অ্যাম্পিয়ার আছে। ধারণক্ষমতার বেশি ব্যবহার হলেই ধীরে ধীরে গরম হয়, আগুনের সৃষ্টি করে। এছাড়া অনেকে রাতের বেলায় অনেক ডিভাইস বিদ্যুতের সঙ্গে কানেক্ট রেখেই ঘুমিয়ে পড়েন। ওখানে কোনো লিকেজ থাকলে তারটা গরম হতে থাকে। দীর্ঘ সময় এভাবে থাকলে একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রাতে পৌঁছালেই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
শর্টসার্কিটের অন্যতম কারণ হিসাবে আবু নাঈম মো. শাহিদউল্লাহ বলেন, দেশে ব্যবহৃত সুইচ ও তার খুবই নিুমানের। নিুমানের সরঞ্জাম ব্যবহার বন্ধ করতে না পারলে অগ্নিকাণ্ড কমানো সম্ভব নয়। এছাড়া শীতকাল চলে গেলে এসি চালুর আগে সার্ভিস না করিয়ে ব্যবহার করায়ও দুর্ঘটনায় অগ্নিকাণ্ড ঘটছে বলে তিনি জানান। মেইনটেন্যান্স না করেই এসি ব্যবহারের ফলে ভেতরে জমে থাকা ধুলায় তাপের সৃষ্টি হয়। এক সময় এসিটা বিকল হয়ে যায় এবং শর্টসার্কিট হয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের গত ৫ বছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে মোট ২৭ হাজার ৫৯টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে। সারা দেশে এই অগ্নিকাণ্ডে আনুমানিক ৫৬৯ কোটি ৯৭ লাখ ৭ হাজার টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়। কারণভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২৭ হাজার ৫৯টি আগুনের মধ্যে বৈদ্যুতিক গোলযোগে ৯ হাজার ৩৯২টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। অর্থাৎ মোট অগ্নিকাণ্ডের ৩৫ শতাংশ বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে। অগ্নিকাণ্ডের কারণ হিসাবে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বিড়ি-সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরা থেকে লাগা আগুন যা মোট অগ্নিকাণ্ডের ১৬ শতাংশ।
২০২৫ সালে বাসাবাড়ি বা আবাসিক ভবনে সবচেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। সারা দেশে বাসাবাড়িতে মোট ৮ হাজার ৭০৫টি আগুন লাগে, যা মোট আগুনের ৩২.১৭ শতাংশ।
২০২৪ সালের প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা গেছে, ওই বছরে মোট ২৬ হাজার ৬৫৯টি অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতি হয় ৪৪৬ কোটি ২৮ লাখ ৩ হাজার টাকা। সর্বোচ্চ সংখ্যক অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে যার সংখ্যা ৯ হাজার ৬৯টি। অর্থাৎ শতকরা হিসাবে ৩৪ শতাংশ। বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে লাগা আগুনে ক্ষতি হয়েছে ২৭৯ কোটি ৬৪ লাখ ৬২ হাজার টাকার। বিড়ি-সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরা থেকে ৪১৩৯টি বা ১৬ শতাংশ। মোট অগ্নিকাণ্ডের ৭ হাজার ১৩১টিই বাসাবাড়িতে অর্থাৎ ২৬.৭৫ ভাগ অগ্নিকাণ্ড বাসাবাড়িতে সংঘটিত হয়েছে। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১০৮ কোটি ৬৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
২০২৩ সালে মোট ২৭ হাজার ৬২৪টি অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতি হয় ৭৯২ কোটি ৩৬ লাখ ৮২ হাজার টাকার। ওই বছরও সর্বোচ্চ সংখ্যক অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে। যার সংখ্যা ৯ হাজার ৮১৩টি অর্থাৎ শতকরা হিসাবে ৩৭ শতাংশ। ২০২২ সালে ২৪ হাজার ১০২টি অগ্নিকাণ্ডে সম্পদের ক্ষতি হয় ৩৪২ কোটি ৫৮ লাখ ৫১ হাজার টাকার। ওই বছরও সর্বোচ্চ সংখ্যক অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে। যার সংখ্যা ৯ হাজার ২৭৫টি অর্থাৎ শতকরা হিসাবে ৩৮ শতাংশ। আর ২০২১ সালে ২১ হাজার ৬০১টি অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতি হয় ২১৮ কোটি ৩১ লাখ ৯৭ হাজার টাকার। সর্বোচ্চ সংখ্যক অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে, যা শতকরা হিসাবে ৩৭ শতাংশ।
ফায়ার সার্ভিসের সাবেক পরিচালক (অপারেশনস) মেজর (অব.) একেএম শাকিল নেওয়াজ বলেন, বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে অগ্নিকাণ্ডের কারণ হলো-আমাদের দেশে আর্থিং সিস্টেম যথাযথ না থাকা, লাইটিং প্রটেকশন সিস্টেম নেই, ভোল্টেজ আপ-ডাউন প্রতিরোধ করার জন্য এএফসিআই (আর্ক-ফল্ট সার্কিট ইন্টারাপটার) বা চার্জ প্রটেক্টিভ ডিভাইস না থাকা। এছাড়া বাজারে নিুমানের সরঞ্জাম রয়েছে যার বিএসটিআই অনুমোদন নেই। চাইনিজ নিুমানের কেবল, সুইচসহ অন্যান্য জিনিস লোকজন কিনে ব্যবহার করছে। এসব জিনিসের কারণে অগ্নিকাণ্ড ঘটে থাকে।