বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেত্রী থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক ও দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব হয়েছেন মনিরা শারমিন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই রাজনীতি শুরু এনসিপির এই নেত্রীর। মূলত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রাজনীতির মাধ্যমেই তার রাজনৈতিক হাতেখড়ি হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের হল শাখার পদেও ছিলেন তিনি। তবে ২০১৮ সালে ছাত্রলীগ থেকে তিনি বহিষ্কৃত হন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সুফিয়া কামাল হল কমিটি গঠন করা হয়। সভাপতি খালেদা হোসেন মুন ও সাধারণ সম্পাদক তিলোত্তমা শিকদারের নেতৃত্বে গঠিত ওই কমিটিতে উপশিক্ষা ও পাঠচক্র সম্পাদক ছিলেন মনিরা শারমিন। সুফিয়া কামাল হল ছাত্রলীগের প্যাডে থাকা তার নাম মুনিরা শারমিন। তবে হল কমিটির নেতৃত্ব নিশ্চিত করেছেন মনিরা শারমিনই মুনিরা শারমিন, যিনি হল ছাত্রলীগের পদে ছিলেন।
যদিও পরে ছাত্রলীগের এই নেত্রী ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিয়ে সুফিয়া কামাল হলের জিএস নির্বাচিত হন। ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে মনিরা শারমিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে সে সময় ছাত্রলীগের মাধ্যমে সবাই যেভাবে উঠেছে আমিও সেভাবেই উঠেছিলাম। আমাদের হলে ওঠার প্রসেস তো একটাই, রাজনৈতিক দলের হাত ধরে ওঠা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। পরে ২০১৮ সালে কোটা আন্দোলন করার কারণে ছাত্রলীগ থেকে আমাকে আজীবন বহিষ্কার করা হয়।
এদিকে এনসিপির এই নেত্রীর বিরুদ্ধে গুরুতর নৈতিক স্খলন এবং শৃঙ্খলা পরিপন্থি কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সরকারি চাকরি করেও এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক হয়েছিলেন মনিরা শারমিন, যা সরাসরি চাকরি প্রবিধান লঙ্ঘন ও শৃঙ্খলা পরিপন্থি অপরাধ এবং নৈতিক স্খলন। শুধু তাই নয়, রাজনৈতিক দলের পদধারী নেতা হয়েও তিনি টানা ১০ মাস বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে চাকরি করেছেন এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকে প্রায় দেড় বছর বিধি ভেঙে চাকরি চালিয়ে গেছেন।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। আত্মপ্রকাশের পর ওই বছরের পহেলা মার্চ গঠিত এনসিপির আহ্বায়ক কমিটিতে ২ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়কের পদ পান মনিরা শারমিন। অথচ তিনি সরকারি চাকরি ছেড়েছেন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে। অর্থাৎ রাজনৈতিক দলের পদধারী নেতা হয়েও অন্তত ১০ মাস তিনি সরকারি চাকরিতে বহাল ছিলেন।
অথচ সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা ১৯৭৯-এর ২৫ নম্বর বিধিতে বলা আছে, কোনো সরকারি কর্মচারী কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারবেন না এবং কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে বা সহায়তা করতে পারবেন না। এটি শৃঙ্খলা পরিপন্থি অপরাধ হিসেবে গণ্য। একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের নিজস্ব চাকরি প্রবিধানমালা ২০০৮-এ। প্রবিধানমালার ৩৭(২) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবেন না, নির্বাচনে অংশগ্রহণ বা প্রচারণায় যুক্ত হতে পারবেন না এবং ব্যাংক বা রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কোনো কার্যক্রমে জড়াতে পারবেন না।
এর পরেও সরকারি চাকরি এবং ব্যাংকের নিজস্ব চাকরি প্রবিধানমালা লঙ্ঘন করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন এনসিপির এই নেত্রী। আনুষ্ঠানিক পদ পাওয়ার আগ থেকেও এই নেত্রী রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। সেই হিসেবে প্রায় দেড় বছর তিনি সরকারি চাকরি প্রবিধানমালা লঙ্ঘন করে চাকরি করেছেন। রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়ার পাশাপাশি সরকারি বেতন-ভাতা নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের অফিসার পদে চাকরি করছেন। এই সময় তিনি গ্রেড অনুযায়ী নিয়মিত বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন।
যদিও এনসিপির ওই নেত্রী দাবি করেছেন তিনি বেশিরভাগ সময় বিনা বেতনে ছুটিতে ছিলেন। আর চাকরি করা অবস্থায় রাজনীতি করাকে তিনি অপরাধ হিসেবেও দেখেন না।
তবে এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধান বলছে, মনিরা শারমিন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক হওয়ার পরেও ১০ মাস সরকারি চাকরিতে বহাল ছিলেন। এই দশ মাসের মধ্যে তিনি মাত্র ৩ মাস ছুটিতে ছিলেন। বাকি ৭ মাস তিনি নিয়মিত বেতন-ভাতা নিয়েছেন, যা সরকারি চাকরি বিধিতে সরাসরি শৃঙ্খলা পরিপন্থি অপরাধ হিসেবে গণ্য।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারী রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে বা কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারেন না। তিনি বলেন, ২০১৮ সালের সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী যথাযথ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনো পেশা, ব্যবসা বা সরাসরি রাজনীতি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সেখানে কোনো রাজনৈতিক দলের পদে থাকা একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তার মতে, এ ধরনের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী অভিযুক্ত কর্মচারীকে সতর্ক করা, বেতন কমিয়ে দেওয়া বা চাকরি থেকে বরখাস্ত করার মতো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা চাকরি ছেড়ে দিলেও চাকরিকালীন তিনি সরকারের কাছ থেকে বেতন ও অন্যান্য সুবিধা নিয়েছেন। প্রয়োজনে সেসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা যেতে পারে। কর্তৃপক্ষ চাইলে বিষয়টি তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।